সর্বশেষ আপডেট : ২৫ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গানের সম্রাট সুনামগঞ্জের কামাল পাশা 

22আল-হেলাল ::

“ দ্বীন দুনিয়ার মালিক তুমি এত কষ্ট সয়না
তোমার দ্বীলকী দয়া হয়না,তোমার দ্বীলকে দয়া হয়না।।
সব কথায় যার ব্যাথায় ভরা কোন কথা সে বলবে
সব পথে যার কাটায় ঘেরা কোন পথে সে চলবে
কাটার আঘাত সয় যার বুকে ফুলের আঘাত সয়না।।
বাতি ছাড়া এ রংমহল ঘর রুশনেআলা হয়না
আজকে বাদশাহ কালকে ফকির সমানে দিন যায়না
সব দিয়া যার সব কেড়ে নাও কেউতো কিছু কয়না।।
যুগ যুগান্তর যে তোমারে করে এতই পছন্দ
কোন ধর্মে কোন মর্মে তারে বলে মন্দ
কামাল শুনে হয় আনন্দ,তোমায় কিছু কয়না ”।।
ভারতের বাংলা সিনেমায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপরোক্ত গানটির সাথে বাংলাদেশের সকল সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের চেনাজানা থাকলেও আলোচ্য গানের রচয়িতা গীতিকারের নাম এ প্রজন্মের অনেকেই অবগত নন। এমনকি বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্রে ঐ গানটি পরিবেশন করেছেন এ প্রজন্মের শিল্পী এস আই টুটুল। তার সাথে কথা বলে জানা যায়,সংগৃহীত গান হিসেবেই ঐ গানটি চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতের পবন দাস গানটিতে কন্ঠ দিলেও তিনি আদৌও গানটির গীতিকার নন। কেউ কেউ বলছেন এটি ভারতের কোন এক ফকিরের গান। এটা সত্যি যে,এক সময় গোটা পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে বৃটিশ ও আসাম প্রাদেশিক সরকার শাসিত শাসনামলে বাংলাদেশী আউল বাউল ফকিরদের সংস্কৃতি চর্চা ছিল কলকাতা কেন্দ্রিক। তৎকালীন কলকাতা গ্রামোফোন কোম্পানী (কলের গান) ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে অন্যতম সরকারী প্রচার মাধ্যম। গ্রামোফোন কোম্পানীতে ধর্না দিলেও সুনামগঞ্জ মহকুমা তথা বৃহত্তর সিলেটের কম সংখ্যক গীতিকার বাউলরা সবাই সমান সুযোগ পেতেন না। কিন্তু নিজের যোগ্যতা দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যিনি কলকাতা গ্রামোফোন কোম্পানীতে গান রেকর্ড করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন গানের সম্রাট কামাল পাশা। যার গানের অনেক ভক্ত শিষ্য রয়েছে সেখানে। কলকাতার আকাশে বাতাসে আজো যার গান গীত হয়।

ভাটি বাংলার ভ্রাম্যমাণ প্রতিভাবান বাউল শিল্পী কামাল পাশাই উপরোক্ত সহজ সরল কথায় প্রানপ্রাচুর্যে ভরপুর আলোচ্য স্রষ্টাতত্ত্ব গানটির প্রকৃত রচয়িতা। প্রায় ৬ হাজার গান রচনা ছাড়াও সঙ্গীত জগতের সকল শাখা প্রশাখায় অবাধে বিচরন করে অসম্ভব পান্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখে দেশের মরমী সংস্কৃতির ইতিহাসে যিনি কিংবদন্তী হয়ে আছেন। বাউল কামাল পাশা ( কামাল উদ্দিন ) ১৯০১ ইং সনের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরন করেন ১৯৮৫ ইং সনের ৬ এপ্রিল মোতাবেক ১৩৯২ বাংলার ২০ বৈশাখ শুক্রবার। আজ ১৪২৩ বাংলার ২০ বৈশাখ মহান এ মরমী কবির ৩১ তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কর্মসূচি পালন করার কথা থাকলেও ফসলহানীর কারনে ভাটি অঞ্চলের কৃষকমনে আনন্দের পরিবর্তে ভয়াবহ শোকাবস্থা বিরাজ করায় বড় ধরনের কোন কর্মসুচির আয়োজন করেনি বাউল কামাল পাশা স্মৃতি সংসদ,সুনামগঞ্জ। তবে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে দিরাই উপজেলা প্রশাসন তাদের সুবিধামতো সময়ে স্মরণসভা করবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে।
বাউল কামাল পাশা হবিগঞ্জ জেলার সুলতানশ্রী গ্রামের সৈয়দ আবুল ফজল সাহেবকে মুর্শিদ মান্য করতেন। বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত ও মরমী কবি হাছন রাজার সমসাময়িক আরেক মরমী সাধক মোঃ আজিম উদ্দিন ওরফে টিয়ার বাপ (জন্ম ১/৩/১৯৬১ইং মৃত্যু ২৫/২/১৯৫৪ইং) তাঁর জন্মদাতা পিতা। মায়ের নাম আমেনা খাতুন (ঠান্ডার মা)। গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে তৃতীয় মান অধ্যয়ন শেষে একই গ্রামের স্থানীয় হাইস্কুলে ভর্ত্তি হতে চাইলে বাউল পিতার ও সাধারন দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তৎকালীন জমিদার পরিবারবর্গের দ্বারা পরিচালিত ঐ শিক্ষা প্রতিষ্টানটিতে তাকে ভর্তি হতে দেয়া হয়নি। পরে দূরবর্তি রাজানগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এমই,সুনামগঞ্জ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন তিনি।

একপর্যায়ে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় হাদিস শাস্ত্রের উপর লেখাপড়া করেন। সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি এমএ পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পারেননি। এ হতাশার কথাটি তিনি স্বরচিত একটি আঞ্চলিক গানে প্রকাশ করে গিয়েছেন,“বলো মোদের সিলেটবাসীর কিসের ভয়/যে জায়গাতে জালাল বাবা শুইয়ে আছেন সব সময়।। আদা হলদি পিয়াজ রসুন ঐ সিলেটে সব আছে/ স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ভাই জায়গায় জায়গায় বসেছে/এ কামাল কয় দুঃখের বিষয় এম.এ পড়ার সুযোগ নয়”। তিনি ১৯২৮ সালে সিলেটে মুসলিম ছাত্র সম্মিলনী উপলক্ষ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংবর্ধনা মঞ্চে গান পরিবেশন করেন। ১৯৩৫ সালে জমিদারদের আগ্রাসন এর প্রতিবাদে প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে গড়ে তুলেন নানকার আন্দোলন। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আসাম পার্লামেন্টে প্রজাস্বত্ত আইন পাস হয়।

সুনামগঞ্জ মহকুমা কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে ১৯৩৭ সালের আসাম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রজাবন্ধু করুনা সিন্ধু রায় এর পক্ষে গণসংযোগ করেন। পন্ডিত জওহর লাল নেহেরুর উপস্থিতিতে সুনামগঞ্জ স্টেডিয়ামে কংগ্রেস প্রার্থী বাবু যতীন্দ্র নাথ ভদ্রের নির্বাচনী সভায় গান পরিবেশন করেন। সংগীতের সাধনার পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন ৪৭-এর রেফারেন্ডাম ও ৫২-র ভাষা আন্দোলনে । ৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী দিরাই থানার রাজানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দিরাই, শাল¬¬া, জামালগঞ্জ আসনে মুসলীমলীগের বিরুদ্ধে নৌকার প্রার্থী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ আজাদ এর বিজয়কে সুনিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় তিনি পরিবেশন করেন-“নৌকা বাইয়া যাওরে বাংলার জনগন/যুক্তফ্রন্টের সোনার নাও ভাসাইলাম এখন/নৌকা বাইয়া যাওরে” শীর্ষক দেশাত্ববোধক গান। ৫৪ সালের নির্বাচনে তার স্বরচিত “দেশে আইলো নতুন পানি ঘুচে গেল পেরেশানী/মাছের বাড়লো আমদানী দুঃখ নাইরে আর”শীর্ষক ৫৪ লাইনের রোমান্টিক গান পাকিস্তানের সামরিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা স্বায়ত্বশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলে।৭০-এর সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাওরাঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে আগত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানিয়ে ৫টি নির্বাচনী জনসভায় স্বাধীনতা,গণতন্ত্র ও নৌকা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৫নং সেক্টরের অধীনস্থ টেকেরঘাট সাবসেক্টর মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে জাগরনী গান পরিবেশন এর মধ্যে দিয়ে ছাত্র যুবকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন মুক্তিযুদ্ধে যেতে। প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক হিসেবে গড়ে তুলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন “স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ”।

১৯৭৩ইং সনে সুনামগঞ্জ ষ্টেডিয়াম মাঠে জাতির জনকের সংবর্ধনা মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন। কলকাতা গ্রামোফোন কোম্পানীর একজন গ্রামোফোন গায়ক হিসেবে স্বদেশ ছাড়াও ভারত পাকিস্তানে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ছিল। ওস্তাদ কামাল পাশা বিরচিত “তোর কি রুপ দেখাইয়া,কি যাদু করিয়া/আমারে তোর দেওয়ানা করিলে/পাগল হইয়া বন্ধু পাগল বানাইলে” এবং “পান খাইয়া যাও ও মাঝি ভাই/ঐ ঘাটে ভিড়াইয়া তোমার নাও”শীর্ষক ভাটিয়ালী গান সর্বপ্রথম কলকাতা গ্রামোফোন রেকর্ডে পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ভাটিয়ালী গানের শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী। অনুরুপভাবে “প্রেমের মরা জলে ডুবেনাগো দরদী”,“পারঘাটাতে আমায় করো পার দীনবন্ধুরে”,“চোরায় করলো ডাকাতি/ঘরে আর থইয়া গেলোনা জিনিস এক রতি”, “নদীর স্রোতে নিঝুম রাতে কে যাও তরী বাইয়া/দয়া করি প্রাণের বন্ধু আমারে যাও কইয়ারে”, ভাটিয়াল পানে কে যাও বাইয়ারে ঘাটে ভিড়াও নাও/আমি অভাগিনী দিন দুঃখীনির খবর লইয়া যাওরে”,“আমি চাইনা দুনিয়ার জমিদারী কঠিন বন্ধুরে/চাইনা দুনিয়ার জমিদারী”সহ বেশ কয়েকটি কামালগীতি রেডিও টেলিভিশনে পরিবেশন করেন শিল্পী আব্দুল আলিম। একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল শিল্পী শাহ আব্দুল করিম ও জ্ঞানসাগর উপাধিতে ভূষিত মরমী কবি দূর্বীন শাহ এর অগ্রজ শিল্পী ছিলেন তিনি। অপ্রতিদ্বন্দ্বি গীতিকার ও সুরকার হিসেবে ১৯৬৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মহকুমা প্রশাসন ও আর্টস কাউন্সিল কর্তৃক শ্রেষ্ঠ বাউল শিল্পীর পদক লাভসহ গানের সম্রাট কামাল পাশা উপাধিতে ভূষিত হন। এলাকার নির্বাচিত সাংসদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ছাড়াও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসাসেবা দেন। এমনকি হাসপাতাল শয্যায় শায়িত গরীব কবিকে নিজে স্বয়ং দেখতে যান এবং তার চিকিৎসার খোজখবর পর্যন্ত নেন।

এ তথ্যটিকে নিশ্চিত করে সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকা দিরাই শাল্লার সাবেক এমপি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন,আমার সৌভাগ্য যে আমি জীবিত অবস্থায় কামাল কবিকে দেখতে,তার সাহায্যার্থে কিছু করতে পেরেছিলাম এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসুচিকে উৎসাহ যুগিয়ে তিনি অনেক গানও লিখেছিলেন। বিশেষ করে ৭৫এর পূর্ববর্তী বাকশালী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সঙ্গীত সাধনার দ্বারা ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলার একমাত্র সাহসী সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ভাটি অঞ্চলে তার কোন বিকল্প ছিলনা। তিনি ছিলেন একজন আস্তিকতাবাদী বাউল সাধক। সাবেক রাষ্ট্রপতি আলহাজ্ব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এর সাথেও এই কবি প্রতিভার পরিচয় ছিল। প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী এই বাউল সাধক ১৯৮৫ ইং সনের ৬ এপ্রিল মোতাবেক ১৩৯২ বাংলার ২০ বৈশাখ শুক্রবার রাত ১২ টায় নিজ বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন। কবিয়াল কামালের স্বরচিত শত শত গান ইতিমধ্যে বিভিন্ন বাউল কবিরা নিজেদের নামে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু গত ২৩ বছর ধরে গ্রামে গ্রামে ওরস উৎসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে গান শুনে ও গেয়ে কামালগীতি সংগ্রহে নিরলসভাবে কাজ করতে গিয়ে এ প্রতিবেদক ইতিমধ্যে সংগ্রহ করেছেন প্রায় ১ হাজার গান। বিলুপ্তির বেড়াজালকে ছিন্ন করে ২১/০২/২০০৮ইং ১০১টি বাউল গান নিয়ে সর্বপ্রথম সিলেট থেকে “গানের সম্রাট কামাল উদ্দিন”নামে ১টি গীতিগ্রন্থ প্রকাশ হয় সাংবাদিক বাউল আল-হেলাল এর প্রচেষ্ঠায়।

গত ২৮/১/২০১২ইং গানের সম্রাট কামাল পাশা নামে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রও তার সম্পাদনাতে প্রকাশিত হয়। ২০১১ ইং সিলেট বইমেলায় গবেষক মোস্তাক আহমদ দীন কর্তৃক প্রকাশিত হয় “কামাল গীতি”। একই বছরে ঢাকার বইমেলায় ফারুকুর রহমান চৌধুরী সম্পাদিত “কালনী তীরের লোকগীতি” নামের অপর একটি গ্রন্থে এই মহান লোকশিল্পীর জীবনী তুলে ধরা হয়। এছাড়াও এই লোকশিল্পীর সঙ্গীতকর্ম নিয়ে লেখালেখি করেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী খান,গবেষক সুবাস উদ্দিন,প্রপেসর মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ নাম নাজানা আরোও অনেকে। গত ২৮ জানুয়ারী শনিবার রাত ৯ ঘটিকায় সুনামগঞ্জ শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অকাল প্রয়াত এই লোক কবিকে মরমী সংস্কৃতির একটি উজ্জল নক্ষত্র বলে অভিহিত করেন দেশের বরেণ্য পার্লামেন্টেরিয়ান মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপি। ২৭/১১/২০০৩ইং সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার আফতাব নগর গ্রামে বাউল কল্যাণ পরিষদ সুনামগঞ্জ আয়োজিত সাংস্কৃতিক উৎসবে লোক সংস্কৃতিতে গৌরবোজ্বল অবদানের জন্য এই মহাসাধককে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মাননা সনদ প্রদান করেন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বর্তমান সচিব বিশিষ্ট কবি গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক। ০৬/১২/২০০৯ইং সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত বিজয় মেলায় নানকার আন্দোলন,ভাষা আন্দোলন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অবদানের জন্য বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ড কর্তৃক দেওয়া হয় মরনোত্তর সম্মাননা পদক ।

পদক প্রদান করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সুনামগঞ্জ ৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মতিউর রহমান। ১৬/৭/২০১১ইং সুনামগঞ্জের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে ভোরের কাগজ বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন ২০১১ ইং উপলক্ষ্যে দেশের মরমী সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য মরণোত্তর সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। সুনামগঞ্জ ৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মতিউর রহমান,মৌলভী বাজার ২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ মহসীন আলী,সিলেট বিভাগের মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার এন এম জিয়াউল আলম ও ভোরের কাগজ সম্পাদক বাবু শ্যামল দত্তসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গগণ এসময় উপস্থিত ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ইয়ামিন চৌধুরী ও দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সামছুল হক যৌথভাবে গত ২ বছর যাবৎ সরকার প্রধানের কাছে এই মরমী কবির সঙ্গীতকর্মসহ তাঁর জীবন বৃত্তান্ত প্রেরণ করেছেন। বাউল কামাল মরমী সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে পবিত্র ক্বোরআন এর বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করেছেন। আল ক্বোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে প্রথমে যেমন পড়তে হয় বিসমিল¬াহ (শুরু) এবং সর্বশেষে সুরা নাসের ওয়ান্নাস (মানুষ) এ দুটি শব্দের প্রথম অক্ষর “বা”এবং শেষ অক্ষর “ছা” মিলে যেমন বাছ শব্দ দ্বারা যথেষ্ট বা শেষ সম্পন্ন বুঝায় তেমনি জীবনের প্রথম গান স্রষ্টার শানে উৎসর্গ করে শেষ গান লিখেছেন মা মাটি মানুষ ও মানবতাকে সমুন্নত করে।

“বিসমিল্ল¬¬াহ বলিয়া মুখের জবান খুলিলাম/যে বিসমিল্ল¬াহর হয়না ওজন পৃথিবী দিলে তামাম”(স্রষ্টা তত্ত্ব ) “আপে আল্ল¬াহ রব জলিল পাটাইলেন জিব্রাইল/মেরাজে যাইতো রাসুলুল¬ল্লাহ ইয়া আল্ল¬¬াহ” ( মেরাজ তত্ত্ব ) “আকাশটায় কাঁদছিলো কেন, জমিটায় হাসছিলো কেন/চামুয়া নদী ভরিলো কেন, সেইদিন সেইদিন। বিশ্বনবী জন্ম নিলেন যেইদিন যেইদিন”। “যেই নামাজে আল্ল¬া রাজী হাছিল হয় নবীর মেরাজ/আমি পড়িতে পারিলাম না সেই নামাজ”। “নাম জপরে নাম জপরে জপরে পাক নাম ইয়া নবী রাসুলুল্ল¬¬াহ”। “হরদম ইয়াদ রাখহে বান্দা ইয়া মোহাম্মদ সাল্ল¬¬াল¬¬াহ/মোহাম্মদকে ফয়দা করতে অন্ধকারকে লাইট করিলা”( নবীর শানে ) “আজিজি মিনতী ছাড়া নাহি কোন ধন/কি দিয়া তুষিব মুর্শিদ আমি তোমার মন”(মুর্শিদী) “দেহ জমি পতিত রইল আবাদ করলিনা/খাস মহালের খাজনা বাকী তুই উসল কেন দিলিনা”( দেহতত্ত্ব ) “গুরু তোরে কি ধন দিল চিনলেনারে মন কানা/রাং দিল না পরশ দিল, পরখ করে দেখলেনা” ( সাধন তত্ত্ব ) “তুই যদি আমার হইতেরে/আমি হইতাম তোর/কোলেতে বসাইয়া তারে করিতাম আদররে” “মনে যারে চায় বন্ধুরে আমার দিলে যারে চায় (আমি)/তারে কি বাসতাম না ভালো পরেরই কথায় রে। প্রানে সহেনারে এত দুঃখ আর/পীরিতের আগুনে পুইড়া হইলাম চারখার”( রাধার বিচ্ছেদ ) “যৌবন কালের বন্ধুরে আমায় থইয়া /তুমি হইলায় দেশান্তরী”(রাধার বিরহ) “পিরীতি করা পরানে মরাগো যেজন করেছে সেজন জানে”( মরমী বিচ্ছেদী ) “শ্যামের বাঁশি কুলবিনাশী বাঁশি বাজাইলো কোন বিপীনে/কুলমান সব নিল বন্ধে কি যাদু জানে”। “সুবল আন গিয়া বিনোদিনী রাই/রাধা বিনে বৃন্দাবনে আমার কেহ নাই”বলগো বলগো সখী করি কি উপায় করি কি উপায়/এগো কোথায় গেলে পাবো আমার বন্ধু স্যামরায়” ( ধামাইল ) “হাছন রাজায় করে গেছেন ফকিরী ফকিরী/রামপাশাতে প্রেমের খনী আসন হয় যার লক্ষণশ্রী” (লোকগীতি) “প্রাণ কান্দে মন কান্দেরে আরো কান্দে হিয়া/দেশের বন্ধু বিদেশ গেল আমায় পাশরিয়া রে”(প্রেমতত্ত্ব বারোমাসি) “ধন্যবাদ কাগজের টাকা (২)/কঠিন রোগ থাকেনা গায়ে যে পায় তোমার শুভ দেখা”। “৬ রাগ ৩৬ রাগিনি ১৬ মাত্রা যোগ করে/বাজলোরে তোর জীবনবীনা সুখও দুঃখের দুই তারে”। “মুছ মুছিয়া বিড়ালে কয় কুনি ব্যাঙে দুধ খাইছে/টেম টুম লইয়া বাছা বাছি হিজল আর বরুন গাছে”। “শুনা মাইগো মাই বিয়া করাইয়া মোরে বানাইলা জামাই/রাত পোহালে বউয়ে বলে কর গিয়া কামাই” (আঞ্চলিক) সহ সকল তত্ত্বের উপর অজস্র গান লিখে আমাদের মরমী সংস্কৃতি ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তিনি। আমাদের বিশ্বাস সেদিন বেশী দূরে নয় যেদিন বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই বাউল কবির গান আমাদেরকে স্বমহিমায় সম্মান মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।
পরিশেষে অকাল প্রয়াত মহান গীতিকার বাউল কামাল পাশার স্বরচিত ও ভাটিয়ালী গানের শিল্পী মরহুম আব্দুল আলিম কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে পরিবেশিত এবং ওস্তাদ কামাল পাশার সর্বশেষ শিষ্য গীতিকার বাউল মজনু পাশার কাছ থেকে বিস্তারিত সংগৃহিত নিম্নোক্ত গানটি উপস্থাপন করে প্রতিবেদনের ইতি দিলাম।
“ প্রেমের মরা জলে ডুবেনা
তুমি সুজন দেইখ্যা কইরো পিরীত মরলে যেজন ছাড়েনা দরদী।।
ও প্রেম করতে দুইদিন ভাঙ্গতে একদিন
এমন প্রেম আর কইরোনা দরদী।।
প্রেম করিলেন আইয়্যূব নবী যার প্রেমে রাহিমা বিবিগো
যার প্রেমে দুনিয়া খুবী কোরআনেতে বর্ণনা দরদী।।
প্রেম কইরাছেন ইউসুফ নবী যার প্রেমে জুলেখা বিবিগো
এতো ছিল রুপের ছবি,এমন রুপ কেউর ছিলনা দরদী।।
প্রেম কইরাছেন মুসা নবী প্রেমিক নয় দুনিয়ার সবীগো
নূরতজলে¬ জ্বলে সবী তবু মুসা জ্বলেনা দরদী।।
প্রেম করিলেন লাইলী মজনু দুইজনার একই তনুগো
লাইলীরে দেখিলে মজনু বলতেন সাই রাব্বানা দরদী।।
শিরির প্রেমে মরলো ফরহাদ মিটিলনা মনের-ই স্বাদগো
প্রেমেতে ঘটিলে বিষাদ এমন হয় লাঞ্চনা দরদী।।
প্রেমিক ছিলেন ওয়াজকুরুনী প্রেমিকের হন শিরোমনিগো
জগতে রয়েছে ধ্বনী নবীর প্রেমের দেওয়ানা দরদী।।
কামাল বলে প্রেমিক ছাড়া বুঝেনা প্রেমেরী দ্বারাগো
প্রেম করছে যারা জানে তারা অপ্রেমিকে জানেনা দরদী ”।।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: