সর্বশেষ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সুনামগঞ্জে নৌকা প্রতীককে বর্জন করেছেন সংখ্যালঘুরা : আগামীতে বাঁশ বা ঘাস দেয়ার প্রতিশ্রুতি!

01.-daily-sylhet-UP-ect11আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ:
প্রায় ৪ দশক পূর্বের পরিবেশিত একটি বাউল গানের ৪টি শব্দকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছেন সুনামগঞ্জের সংখ্যালঘু ভোটাররা। যুগ থেকে যুগান্তরে স্থান কাল পাত্রভেদে অর্থবোধক কোন গান যেভাবেই পরিবেশন করা হউকনা কেন গানের কথাও যে একসময় ভোটারদের মনে দাগ কাটতে পারে বা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তার বাস্তব উদাহরন সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।

এ নির্বাচনে বরাবরের মতো সংখ্যালঘুদের ভোটও একটা মারাত্মক ফ্যাক্টর ছিলো। প্রতিবারই এ ভোটে নৌকা ও আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারন হলেও এবার হয়েছে সম্পূর্ন উল্টো বা ব্যাতিক্রম।

গানের সম্রাট বাউল কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) এর গানটির কথাগুলো হচ্ছে,
“সোনার নায় আজ বান্দর কাড়ালী/ওরে হাইলের বৈঠা ঠিক রাখিয়া জোর হাতে লাগায় তালী।। বেয়াক্বলে আহম্মকরে বুঝায়,কানারে ভাই অন্ধে চালায়রে/গরীবরে ফকিরে চালায় কাদে নিয়া ভিক্ষার ঝুলি।। ভাইরে কালা হইলেও রং উজালা,চোর অইলেও তার স্বভাব ভালারে/ওরে মুখ নাই বেটায় মাতে ভালা বাপ তুলিয়া দেয় গালি।। ওরে বাপরে বেটায় ডাকেরে ভাই,বউরে বেটায় ডাকে মাইরে/ ওরে বিড়ালরে কয় ৫ কন্দি গাই,মারে কয় শালীর শালী।। বাউল কামালে কয় শুনরে বেগরা,আগে শিখ মালজুড়ার ধারারে/ওরে চেতন গুরুর সঙ্গ ছাড়া,কে শিখায় ভরা খালি ”।

ক্ষেত্র বিশেষে নিগুড়তত্ত্ব বা রোমান্টিক আঞ্চলিক এই গানটির আলোচিত ৪টি শব্দ হচ্ছে “সোনার নায় আজ বান্দর কাড়ালী ”। বাউল কামাল পাশা স্বাধীনতা স্বায়ত্বশাসন ও গণতন্ত্রের প্রতীক নৌকা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থন জানিয়ে ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অনেক মূল্যবান দেশাত্ববোধক গান লিখেছেন,গেয়েছেন। তার গানের সুত্র ধরেই ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ আসনে নৌকা ও গণতন্ত্রী দলের প্রার্থী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের বিজয় তরান্বিত হয় বলে তিনি (সামাদ আজাদ) জীবদ্ধশায় স্বীকার করে গেছেন। কিন্তু আলোচ্য গানটিতে সাধক কামাল পাশা কিসের ইঙ্গিত দিয়েছেন একটু বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। আওয়ামীলীগ নেতা কর্মী সমর্থক ভোটার বা প্রার্থী অথবা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কোন ব্যাক্তি কিংবা সংখ্যালঘু মা ভাই বোনদের কাছে নৌকা শুধু শুধু একটি প্রতীকই নয় বরং এর মাঝে দেশের স্বাধীনতা,মুক্তিযুদ্ধ,স্বায়ত্বশাসন,গণতন্ত্র,মৌলিক অধিকার,সামাজিক ন্যায় বিচার,ত্যাগ ও আদর্শের অস্তিত্ব বিদ্যমান বলেই সকলে মনেপ্রানে বিশ্বাস করেন। ফলে বিশ্বাসের প্রতীক নৌকা কাগজের প্রতীক থেকে হয়ে উঠে সোনার নৌকা। যেকোন নির্বাচনে বিশ্বাসের পরীক্ষিত মানুষটিকেই তারা তাদের সোনার নৌকার মাঝি বা কান্ডারী হিসেবে দেখতে চান।

কিন্তু বিগত দিনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন সমর্থনকে কেন্দ্র করে ব্যাক্তি বিশেষের বাণিজ্য আস্ফালন ও ক্ষমতার দম্ভ দেখে হতাশ হয়েছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটাররা যখন দেখেছেন রাজাকারের ছেলে,আলবদরের সহযোগী,সুবিধাবাদী কালো টাকার মালিক,গরু চোর,ডাকাত,ভূমিদস্যু ও লুঠেরাদেরকে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে তখন তারা মারাত্মক হতাশ হয়েছেন। অনেকের হৃদয়ে ও মস্তিস্কে রক্ষক্ষরনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু নৌকার ভাড়াদাতারা তা দেখেও না দেখার,জেনেও না না জানার ভান করেছেন। মনে করেছেন আমি হাম্বি তাম্বি যাই করেছি তাই ঠিক হবে। সংখ্যালঘুরা কেন সবাই একবাক্যে নৌকাতেই ভোট দিবে। আর নৌকায় ভোট নাদিয়ে এইসব হতভাগা কপালপুড়াদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। কিন্তু কপালপুড়া কামাল উদ্দিনের গানের কথাগুলোকে সত্য বলে মেনে নিয়ে বান্দরদের মানে তথাকথিত নৌকার ভাড়া দাতা সিন্ডিকেট চক্রের সকল অহঙ্কারই চূর্ণ বিচুর্ণ করে দিয়েছেন সংখ্যালঘু ভোটাররা।

বিশেষ করে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাত্র একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলেও বাকী ৮টি ইউনিয়নের নির্বাচনে নৌকা প্রতীককে সম্পূর্ণরুপে বর্জন করেছেন নিরীহ সংখ্যালঘুরা। পরিসংখ্যানে দেখা যায় কেবলমাত্র জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে ইউপি আওয়ামীলীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকশেদ আলী নির্বাচিত হয়েছেন। বাকী ৮ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে বিএনপি,বিদ্রোহী বিএনপি,বিদ্রোহী আওয়ামীলীগ ও জমিয়তুল উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীদেরকে তারা ভোট দিয়ে বিজয়ের মালা পরিয়ে দিয়েছেন। সোনার নায় আজ বান্দর কাড়ালি কথাটির স্বার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে নৌকাকে আপাতত না বলে তারা দেখিয়ে দিয়েছেন ইতিবাচক পরিবর্তনে জাত বিচার বলে কিছু নেই। জমিয়ত,বিএনপি,বিদ্রোহী আওয়ামীলীগ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী যেই হউননা কেন ? নৌকার শাসনামলে তথাকথিত বান্দরমার্কা নৌকাওয়ালা সুবিধাবাদীদের চাইতে এই নির্বাচিতরা অনেক অনেক গুনে ভালো।
তাইতো সংখ্যালঘুরা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫টিতে বিএনপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদেরকে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে বিজয়ী করেছেন। সংখ্যালগুদের ভোটে ১টিতে নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের প্রার্থী। অপর ২টিতে জাতীয় পার্টি ও জমিয়তুল উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। রঙ্গারচর ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল হাই। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ। জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মকসুদ আলী নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল কাদের। সুরমা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী হলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সহযোগীতা নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগের নবাগত প্রার্থী আব্দুস সাত্তার ডিলার।

ভোটের পরিসংখ্যানে বিজয়ী হলেও সংখ্যালঘুদের ২% ভোটও তিনি পাননি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আমির হোসেন রেজাকে ননসিলেটি ভোটাররা উল্লেখযোগ্য ভোট না দিলেও সংখ্যালঘুদের শতকরা শতভাগ ভোট পেয়েছেন তিনি। কুরবান নগর ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল বরকত নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের প্রার্থী কোহিনূর আলম। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নুরুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের প্রার্থী আব্দুস ছোবহান। লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের সর্বাত্মক সমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল অদুদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের প্রার্থী হাজী ইয়াকুব বখত বহলুল। গৌরারং ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের ৯০% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান ফুল মিয়া। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব।

এই ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী সংখ্যালঘুদের ভোট তেমন পাননি। মোহনপুর ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের ৭৫% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগের প্রার্থী হাজী মাইন উল হক। কাঠইর ইউনিয়নে সংখ্যালঘুদের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জমিয়তুল উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি শামছুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফারুক আহমদ মেনর। মনোনয়ন বানিজ্যের আওতায় যেসব এলাকায় গণবিচ্ছিন্ন ধনকুবের প্রভাবশালীদেরকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের প্রার্থী করা হয়েছিলো তাদের সকলকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন সাধারন ভোটারদের পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোটাররা। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের স্থানীয় নেতা অরুন অধিকারী বলেন,নৌকা প্রতীক নিয়ে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তারা যে সবাই অযোগ্য কিংবা গণবিচ্ছিন্ন তা নয়।

এডভোকেট বুরহানসহ অনেক প্রার্থীই রয়েছেন যারা আসলেই প্রতিভাবান। আবার কেউ কেউ যোগ্য দক্ষ ও সততা থাকার পরও পরাজিত হয়েছেন। এর মূল কারনটিই হচ্ছে ব্যাক্তি বিশেষের বানিজ্যিক রাজনীতি। সংখ্যালঘু নেতা হরিলাল দাস বলেন,একজন টাকা নিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন আরেকজন টাকা খেয়ে নির্বাচনী সভায় বড় বড় বুলেটিন ছেড়েছেন। বুঝাতে চেয়েছেন কলির যুগে বাঁশ থাইক্যা ছিংলা বড়। তারা কে কোথায় কিভাবে কতটাকার বাণিজ্য করেছেন আমরা সবই জানি। তাই তাদেরকে ব্যালটের বদলে বাঁশ দিয়েছি। আগামী সংসদ নির্বাচনে এর থাইক্যা বড় বড় বাঁশ বা ঘাস তাদেরকে দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।

সংখ্যালঘুদের মাথা বিকিকিনির দিন শেষ। আমরা এখন নতুন চেতনায় বাংলাদেশকে তথা সুনামগঞ্জকে গড়তে একপায়ে খাড়া। পূর্বাঞ্চলের সংখ্যালঘু নেতা যজ্ঞেশ্বর রায় বলেন, জনপ্রিয় নেতা নূরুল হুদা মুকুট এর প্রতি অবিচার করার সমুচিত জবাব দেয়ার ধারাবাহিকতায় আমরা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীদেরকে বর্জন করেছি। নূরুল হুদা মুকুট ও আয়্যুব বখত জগলুলের মতো প্রতিভাবান নেতাদের বা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী সমর্থকদের মতামত নিয়ে যদি আওয়ামীলীগের মনোনয়ন দেয়া হতো তাহলে সবকটি ইউনিয়নেই নৌকার প্রার্থীরা জয়লাভ করতো।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: