সর্বশেষ আপডেট : ১৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন?

2016_04_24_19_33_33_CkgVYs2kdHz1sdMFSthq2mbrg6ufaF_originalনিউজ ডেস্ক ::
“এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার?”

মৃত্যুর স্তূপে দাঁড়িয়ে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ যে স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছিলেন কয়েক যুগ পর যেন তারই প্রতিচ্ছায়া এসে পড়েছিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায়। মৃত্যুর মিছিল দেখে কবি হৃদয় যখন প্রশ্নবানে জর্জরিত, তখনই তার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠে জিজ্ঞাসা। তিনি স্বদেশবাসীর কাছে জানতে চান- ‘কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন?’ হ্যাঁ, রানা প্লাজা ধসে অবলীলায় হাজারো প্রাণহানির যে দৃশ্য, তা কি এদেশবাসী এর আগে কোনোদিন দেখেছিল? স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পর হয়তো দেখেনি।

যেকোনো মৃত্যু বরাবরই ভয়ানক বিভীষিকার ন্যায় তমসাচ্ছন্ন। কিন্তু লাশের স্তূপ যখন দীর্ঘতর হয়, বাতাসে যখন লাশের গন্ধ ছড়ায় তখন সেই মৃত্যুদৃশ্য মানবহৃদয়কে রোমাঞ্জিতই করে বটে। বীভৎস আর করুণ রসে জারিত হয়ে মানুষের চোখ তখন অপলক তাকিয়ে থাকে লাশের বহরের দিকে।

৩ বছর আগে রানা প্লাজা ধসে ঠিক তেমনি এক মৃত্যুর মহড়া দেখেছে মাতৃভূমি। এমন মৃত্যুর মিছিল কি স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়িত করে অনেককে। হয়তোবা বেদনার এ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হবে স্বজনদের আরও বহু দিন। ভিন্ন মাত্রায় দিনটি স্মরণে থাকবে কারো কারো কাছে সারা জীবন। এদের সবাই নিহত শ্রমিকদের সন্তান।

বলছিলাম ঢাকার অদুরে সাভারে রানা প্লাজা ধ্বস এবং ওই দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের সন্তানদের কথা। ২০১৩ সালে বিশ্ব আলোড়িত বাংলাদেশের পোশাক কারখানা ধসে প্রাণ গেছে ১১শ’র বেশি শ্রমিকের। আহত হন আরও সহস্রাধিক। কারখানা ধসে এতো সংখ্যক শ্রমিকের একসঙ্গে মৃত্যু এদেশে আর কখনও ঘটেনি। এতো সংখ্যক শিশুর একসঙ্গে মা-বাবা হারানোর বিষয়ও বিরল।

দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের অনেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় আটকে আছে বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সহায়তার টাকা। প্রতিবছরের মতো এ বছরও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে বেদনাঘন এ দিনটি। বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভের পাশাপাশি আরও ক্ষতিপূরণের দাবি করছে বিভিন্ন সংগঠন। সংবাদমাধ্যমও এ নিয়ে বেশ সরব।

সংবাদমাধ্যম কিংবা আলোচনা থেকে যা আড়াল হয়ে যাচ্ছে- তা হচ্ছে নিহত শ্রমিকদের শিশু সন্তানদের বিষয়টি। স্মরণকালের ভয়াবহ এ কারখানা দুর্ঘটনার পর জানা যায়, বাবা-মা হারানো শিশুদের সংখ্যা কয়েকশ’। বেশ কিছু শিশু আবার হারিয়েছে মা-বাবা দুজনকেই। দিন, মাস, বছরের হিসেবে দুর্ঘটনার আজ (২৪ এপ্রিল) তিন বছর। কেমন আছে মা-বাবা হারা ওইসব শিশুরা।

রানা প্লাজা ধসে বড় ছেলেকে ও ছোট ছেলের বউকে হারিয়েছেন রাজবাড়ীর আলদীপুর গ্রামের বৃদ্ধা সালেহা বেগম। বড় ছেলে ও ছোট ছেলের বউকে হারানোর শোক শীতল হওয়ার আগেই উৎকন্ঠায় আছে তাদের রেখে যাওয়া শিশু সন্তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

নিহত বড় ছেলের বউ ৮ বছরের মেয়ে লাবণ্য আক্তার লিখনকে রেখে অনত্র বিয়ে করে চলে গেছে। ক্ষতিপূরণের সব টাকা নিয়ে গেছে সঙ্গে করে। এখন লাব্যণ্যের কোনো খবর রাখে না তার মা।
লাবণ্যের কাছে তার মায়ের কথা জানতে চাইলে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে সে। মাথা নিচু করে জানায়, ‘মা আমার কোন খবর নেয় না, মোবাইলেও কোন কথা বলে না, আমাকে দেখতেও আসে না।’
সালেহা বেগমের ছোট ছেলে তিটন শেখ ও তার স্ত্রী আসমা রানা প্লাজা ধসে চাপা পড়ে।তিটন শেখ বেঁচে গেলেও নিখোঁজ হয় তার স্ত্রী আসমা বেগম। আসমা বেগমকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেন তিটন শেখ। নিহত আসমা বেগম ও তিনট শেখের ৫ বছরের ছেলে আসিফ শেখের কোন দায়িত্ব নেয়নি। আসমা বেগমের ক্ষতিপূরণের টাকা ও আসিফের অনুদানের সব টাকা নিয়ে গেছেন তার নানা। চাইলেও নাতি আসিফের খরচের জন্য কোনো টাকা পয়সা দেয় না। এমতাবস্থায় দুই ছেলের অসহায় দুই শিশু লাবণ্য ও আসিফকে খেয়ে না খেয়ে আগলে রেখেছেন দাদি সালেহা বেগম।

রানাপ্লাজা ধসে মা-বাবা দু’জনকেই হারিয়েছে ধামরাইয়ের ৭ বছরের শিশু বিজয়। ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে এতিম এ শিশুর স্বজনরা। এতিম শিশু বিজয়ের জীবনের সহযাত্রী এখন তার বৃদ্ধা দাদি। অভাবের সংসারেই দাদি তার নাতিকে আগলে রাখছেন।

বিজয়ের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মা-বাবা সম্পর্কে জানতে চাইলে চোখ ছলছলে হয়ে উঠে শিশু বিজয়ের। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে জানায়, ওইদিনও অন্য দিনের মত স্কুলে গিয়েছিল সে। হঠাৎ লোকমুখে শুনতে পায়, রানা প্লাজা ধসে পড়ছে। শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি বিজয়। তারপরও অজানা তাগিদে ছুটে গেছে তাদের ভাড়া বাড়িতে। বাইরে থেকে তালা দেয়া ঘরে। আশেপাশে যারা রানা প্লাজায় চাকরি করতো তাদের ঘরে গিয়েও দেখতে পেয়েছে তালা দেয়া। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেছে রানা প্লাজার দিকে। প্রতিবেশির মোবাইল ফোন থেকে বাবার মোবাইলে কল দেয়। নম্বর ব্যস্ত। আবার ফোন দেয়, ফোন এবার বন্ধ। আর কথা বলা হয়নি মা-বাবার সঙ্গে শিশু বিজয়ের।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর থেকে দাদির সঙ্গে আছে বিজয়। বাবার মোবাইল বন্ধের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় বারবার মুখ লুকাচ্ছিল ছোট্ট শিশু বিজয়। কিছুক্ষণের জন্য যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল শিশু বিজয়ের পাথরচাপা পড়া হৃদয়। কিছুক্ষণ পর বলে, ‘এখন কেউ বকাঝকা করলে কিংবা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে বাবা-মাকে খুব মনে পড়ে, আর কান্না আসে।’

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মতে, রানা প্লাজার ঘটনায় এরকম অনেক শিশু আশ্রয়হীন হয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছে। মা কিংবা বাবা এখন নতুন সংসার পেতে তাদের আগের সন্তানদের খোঁজ-খবর রাখছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবা-মা হারা সন্তানদের অনুদানের টাকা তাদের স্বজনরা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। ফলে অনেক শিশুই এখন খেয়ে-না খেয়ে দিনাতিপার করছে। অযত্ন, অবহেলা আর অনাদরে লালিত-পালিত হচ্ছে।

তবে রানা প্লাজায় ভবন ধসে মা-বাবা হারানো শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন মিনা বাংলাদেশ বিভিন্ন বয়সি ৮০ শিশু-কিশোরদের নিয়ে শুক্রবার পড়ালেখাসহ নানা বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেখানে নাচ, গান, সেলাই প্রশিক্ষণ শেখানো হচ্ছে। যাতে করে ভবিষ্যতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।

অনাথ এ শিশুদের বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সহকারী প্রোগ্রাম কর্মকর্তা জানান, নিহত ও আহত শ্রমিকদের নিয়ে অনেক আন্দোলন, প্রতিবাদ ও দাবি-দাওয়া উঠে এসেছে। এসব বিষয় নিয়ে এখনো মানুষের মুখে আলোচনা হয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে রানা প্লাজায় ভবন ধসে নিহত শ্রমিকদের রেখে যাওয়া সন্তানদের কথা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। অন্যথায় এ-সংক্রান্ত সকল প্রয়াসই বৃথা যাবে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: