সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রানা প্লাজা ধসের অনুদান: মাও ঠকিয়েছেন সন্তানকে!

39নিউজ ডেস্ক :: রাজবাড়ীর আলদীপুর গ্রামের বৃদ্ধা সালেহা বেগম। রানা প্লাজা ধসে বড় ছেলে ও ছোট ছেলের বউকে হারিয়েছেন। ঘটনার তিন বছর কেটে গেলেও তার মনে ক্ষত এখনো দগদগে। তিন বছর পেরিয়ে কেমন আছে নিহতদের পরিবার জানতে গিয়ে কথা হল এই বৃদ্ধার সঙ্গে।

জানালেন আরেক করুণ কাহিনী। রানা প্লাজা শুধু তার প্রিয়জনের জীবনই কেড়ে নেয়নি। তছনছ করে দিয়েছে তার পরিবারও। নিহত বড় ছেলের বউ ৮ বছরের মেয়ে লাবণ্য আক্তার লিখনকে রেখে অনত্র বিয়ে করে চলে গেছে। ক্ষতিপূরণের সব টাকা নিয়ে গেছেন সঙ্গে করে। এখন লাব্যণ্যের কোনো খবর রাখেন না তার মা। লাবণ্যের কাছে তার মায়ের কথা জানতে চাইলে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে সে। মাথা নিচু করে বলে, ‘মা আমার কোনো খবর নেয় না, মোবাইলেও কোনো কথা বলে না, আমাকে দেখতেও আসে না।’

একই ব্যাপার সালেহা বেগমের ছোট ছেলে তিটন শেখেরও। তার স্ত্রী আসমা রানা প্লাজা ধসে চাপা পড়ে। তিটন শেখ বেঁচে গেলেও নিখোঁজ হয় তার স্ত্রী আসমা বেগম। আসমা বেগমকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেছেন তিটন শেখ। নিহত আসমা বেগম ও তিটন শেখের ৫ বছরের ছেলে আসিফ শেখের কোনো দায়িত্ব নেননি। আসমা বেগমের ক্ষতিপূরণের টাকা ও আসিফের অনুদানের সব টাকা নিয়েছেন তার নানা। চাইলেও নাতি আসিফের খরচের জন্য কোনো টাকা পয়সা দেয় না।

দুই ছেলের অসহায় দুই শিশু লাবণ্য ও আসিফকে খেয়ে না খেয়ে আগলে রেখেছেন দাদী সালেহা বেগম। বড় ছেলে ও ছোট ছেলের বউকে হারানোর শোক ভোলার আগেই উৎকন্ঠায় আছে তাদের রেখে যাওয়া শিশু সন্তাদের নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়েও।

২০১৩ সালে বিশ্ব আলোড়িত করা বাংলাদেশের পোশাক কারখানা ধ্বংসে প্রাণ গেছে ১১’শয়েরও বেশি শ্রমিকের। আহত হন আরও অনেকে। কারখানা ধ্বসে এতো সংখ্যক শ্রমিকের একসঙ্গে মৃত্যু এদেশে আর কখনও ঘটেনি।এতো সংখ্যক শিশুর একসঙ্গে মা-বাবা হারানোর বিষয়ও বিরল। লাবণ্য আর আসিফই যেন রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকদের সন্তানদের প্রতিনিধি।

স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়িত করে অনেককে। হয়তো বেদনার এ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হবে স্বজনদের আরও বহু দিন। ভিন্ন মাত্রায় দিনটি স্মরণে থাকবে কারো কারো কাছে সারাজীবন। এদের সবাই নিহত শ্রমিকদের সন্তান।

দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের অনেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় আটকে আছে বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সহায়তার টাকা।

প্রতিবছরের মতো এবারও নানাভাবে পালিত হচ্ছে দিনটি। বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভের পাশাপাশি আরও ক্ষতিপূরণের দাবি করছে বিভিন্ন সংগঠন। সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে পরিবেশিত হচ্ছে খবরও। তবে সংবাদমাধ্যম কিংবা আলোচনা থেকে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে নিহত শ্রমিকদের শিশু সন্তানদের বিষয়টি। স্মরণকালের ভয়াবহ এ কারখানা দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারানো শিশুদের সংখ্যা কয়েকশ। অনেক শিশু আবার হারিয়েছে মা-বাবা দুজনকেই।

রানাপ্লাজা ধ্বসে মা-বাবা দু’জনকেই হারিয়েছে ধামরাইয়ের ৭ বছরের শিশু ছেলে বিজয়। ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে এতিম এ শিশুর স্বজনরা। এতিম শিশু বিজয়ের জীবনের সহযাত্রী এখন তার বৃদ্ধা দাদী। অভাবের মধ্যেই দাদী তার নাতীকে আগলে রেখেছেন।

বিজয়ের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মা-বাবা সম্পর্কে জানতে চাইলে চোখ ছলছলে হয়ে উঠে শিশু বিজয়ের। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জানালো সেদিনের দুঃসহ স্মৃতিও।

ওইদিনও অন্য দিনের মত স্কুলে গিয়েছিল সে। হঠাৎ লোকমুখে শুনতে পায়, রানা প্লাজা ধসে পড়ছে। শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি বিজয়। তারপরও অজানা তাগিদে ছুটে গেছে তাদের ভাড়া বাড়িতে। বাইরে থেকে তালা দেয়া ঘরে। আশেপাশে যারা রানা প্লাজায় চাকরি করতো তাদের ঘরে গিয়েও দেখতে পেয়েছে তালা দেয়া। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেছে রানা প্লাজার দিকে। প্রতিবেশির মোবাইল ফোন থেকে বাবার মোবাইলে কল দেয়। নম্বর ব্যস্ত। আবার ফোন দেয় মোবাইল ফোন এবার বন্ধ। আর কথা বলা হয়নি মা-বাবার সঙ্গে শিশু বিজয়ের।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর থেকে দাদীর সঙ্গে আছে বিজয়। বাবার মোবাইল বন্ধের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় বার বার মুখ লুকাচ্ছিল ছোট্ট বিজয়। কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ। কিছুক্ষণ পর বলে, ‘এখন কেউ বকা দিলে কিংবা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলেও বাবা-মাকে খুব মনে পড়ে আর কান্না আসে।’

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মতে, এরকম অনেক শিশু কষ্টে জীবন-যাপন করছে। মা কিংবা বাবা এখন নতুন সংসার পেতে তাদের আগের সন্তানদের খোঁজ-খবর রাখছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবা-মা হারা সন্তানদের অনুদানের টাকা তাদের স্বজনরা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। ফলে অনেক শিশুই কষ্টে লালিত-পালিত হচ্ছে।

তবে রানা প্লাজায় ভবন ধসে মা বা হারানো শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন মিনা বাংলাদেশ বিভিন্ন বয়সী ৮০ শিশু-কিশোরদের নিয়ে শুক্রবারে পড়ালেখাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেখানে নাচ, গান, সেলাই প্রশিক্ষণ শেখানো হয়। যাতে করে ভবিষ্যতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।

অনাথ এ শিশুদের বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সহকারী প্রোগ্রাম কর্মকর্তা জানান, নিহত ও আহত শ্রমিকদের নিয়ে অনেক আন্দোলন, প্রতিবাদ ও দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এটা যেমন যুক্তিযুক্ত তেমনি তাদের রেখে যাওয়া সন্তানদের কথাও আমাদের গুরুত্বে সঙ্গে ভাবতে হবে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: