সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ৪ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘আল্লায় আমারে কেনে পানিয়ে ভাসাইয়া নেয় না’ বাঁধ ভেঙে ও শিলাবৃষ্টিতে ৩ উপজেলায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট

jagannathpur pic 19-04-2016স্টাফ রিপোর্টার::

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও তাহিরপুর উপজেলায় হাওররক্ষা বাঁধ ভেঙে ৪০ সর্বাধিক হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ওই দুটি উপজেলার কৃষকেরা আগামী দিনের কথা চিন্তা করে আহাজারি করছেন। অপরদিকে, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জগন্নাথপুর প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে উপজেলার নলুয়া ও মইয়ার হাওরসহ ছোট-বড় ১৫টি হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১০ হাজার হেক্টর ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে হাওরগুলো বাঁধ ভেঙে পাকা ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। নলুয়া ও মইয়ার হাওরের বাঁধরক্ষায় ইউএনও মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির কৃষকদের সাথে নিয়ে দীর্ঘ এক সপ্তাহব্যাপী প্রাণপণ চেষ্টা করেন। এতে আংশিক ফসল রক্ষা করতে সক্ষম হলেও শেষপর্যন্ত উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা সিদ্দিক আহমদ, ইউএনও মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ক্ষতিগ্রস্ত হাওরগুলো পরিদর্শন কালে কৃষকদের সান্তনা দিয়েছেন।
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানায়, এবার এ উপজেলায় ২০ হাজার ১৪০ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে নলুয়ার হাওরে ৪ হাজার হেক্টর, মইয়ার হাওরে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর, জামাই কাটা হাওরে ২ হাজার ২শ হেক্টর, হাফাতির হাওরে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর, পারুয়া হাওরে ২ হাজার হেক্টর, বানাইর হাওরে ১ হাজার হেক্টর, রাঙ্গার কিত্তা হাওরে ৩৫০ হেক্টর, ডলুয়ার হাওরে ৫৫০ হেক্টর, পিংলার হাওরে ১২০ হেক্টর জমি আবাদ করা হয়েছিল। ফসলের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন ধান। শিলাবৃষ্টিতে শুরুতেই ১৪০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
কৃষকরা অতি কষ্টে ফসলের একভাগ ফসল তুলতে সক্ষম হলেও তিনভাগ আধাপাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ জেলার কতিপয় কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে নলুয়া ও মইয়ার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তাহিরপুর প্রতিনিধি জানান, শনির হাওর ডুবে গেছে। গত সোমবার রাত ৯টায় এ উপজেলার রাজধরপুর গ্রামের সম্মুখে লালুর গোয়ালা বাঁধ ভেঙে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ডুবে গেছে। সেই সঙ্গে শনির হাওরের ৩টি উপজেলার ৫০টিরও গ্রামের মানুষের মধ্যে চলছে হাহাকার। এ হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ায় ২০০ কেটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাহিরপুরের ৩টি ইউনিয়ন, জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে শনির হাওরের অবস্থান। কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী শনির হাওরে তাহিরপুরের অংশে জমি রয়েছে ৬ হাজার ৩শ ৩৮ হেক্টর। অন্য দুটি উপজেলায় রয়েছে বাকি জমি। সোমবার সকালে হাওরপারের মানুষজন প্রথমে খবর পান, রাধানগর গ্রামের সম্মুখে জালখালী বাঁধে ফাটল ধরেছে এবং হাওরে পানি ঢুকছে। এ সংবাদ পেয়ে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন, থানা অফিসার ইনচার্জ মো. শহিদুল্লাহ ও শনির হাওর উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন, সদর ইউপি চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন, সমাজসেবক এমরান হোসেন ও এলাকার কয়েকশ কৃষক সেখানে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বাঁধের মুখে বালু ফেলে রাত ৮টায় বাঁধ ভাঙন ঠেকানো হয়। শনির হাওর উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন ও হাওরপারের কৃষক ভাটি তাহিরপুর গ্রামের আতিকুর রহমান জানান, জালখালি বাঁধটি রক্ষা করে তারা বাড়ি ফেরার পথে লালুর গোয়ালা বাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে আসার সময় বাঁধের অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু তারা বাড়ি ফেরার পর জানতে পারেন, লালুর গোয়ালার বাঁধটি ভেঙে গেছে। তারা আরো জানান, উক্ত বাঁধটি কখনো ভাঙতে পারে না, কোনো দুর্বৃত্ত উক্ত বাঁধটি কেটে দিয়েছে। ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক ইউনূছ আলী মঙ্গলবার কাঁদতে কাঁদতে ডুবে যাওয়া জমির কাঁচা ধান মুখে দিয়ে চিবুচ্ছিলেন। বিলাপ করে সে সময় তিনি বলছিলেন,‘আল্লায় আমারে কেনে পানিয়ে ভাসাইয়া নেয় না। বাইচ্ছা কাইচ্ছারে (ছেলে-মেয়েদের) কিতা খাওয়াইতাম।’
কান্না শুধু ইউনূছ আলীর নয়, শনির হাওরপারের বারুঙ্কা, লোহাচুরা, অনোয়ারপুর, চিকসা, পাতারী, তিওরজালাল, বীরনগর, উজান তাহিরপুর, ধুতমা, মধ্য তাহিরপুর, ভাটিতাহিরপুর, ঠাকুরহাটি, গোবিন্দশ্রী, শাহগঞ্জ, শ্রীপুর, নিশ্চিন্তপুর, সুলেমানপুর, রামজীবনপুর, গোপালপুর, রাধানগর, ইসলামপুর, মসলঘাট, শাহপুর, রাজিনপুর, সাতগাঁও সহ ৫০টিরও অধিক গ্রামের মানুষের।
মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কৃষক পরিবারগুলোর আহাজারিতে শনির হাওরপারের গ্রামসমুহের পরিবেশ ছিল বিষাদময়। অনেক কৃষককেই কিছু জিজ্ঞেস করলে কেবল কেঁদেছেন।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, বাঁধটি এক ফুট উচু এবং উভয় পাশে বাঁশ প্যালাসাইটিং করলে বাঁধটি ভাঙত না।
তাহিরপুর উপজেলঅ নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, বাঁধ ভেঙে শনির হাওর তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা করতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগই গ্রহণ করবে উপজেলা প্রশাসন।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, জেলার জুড়ী উপজেলার গত শনিবারের শিলাবৃষ্টিতে হাকালুকি হাওরে বোরো ফসলের ব্যাপক তি হয়েছে। ঝরে গেছে হাকালুকিসহ হাওর-বিলে ফলানো অনেক ফসল। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে ফলানো ফসল চোখের সামনে শিলাবৃষ্টিতে ঝরে যাওয়ায় বুক বেঁধে রাখতে পারছেন না কৃষকেরা তাই নীরবে ঝরছে তাদের চোখের জল।
মঙ্গলবার হাওরপারের বিভিন্ন গ্রাম সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা শিলাবৃষ্টিতে ফসল হারানোর কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের সাথে আলাপকালে অনেকে জানান, তাদের বেশিরভাগ ফসল শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক তি হয়েছে। এখন আমরা কিছু ফসল তুলছি মন বোঝানোর জন্য। শিলাবৃষ্টিতেও ফসলের ব্যাপক তি হয়েছে বলে চোখের জল মুছতে মুছতে জানান কয়েকজন কৃষক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবল সরকার জানান, হাকালুকি হাওর পারে জুড়ী উপজেলায় এ বছর ৫ হাজার ৪৫০ হেক্টর বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। গত শনিবারের শিলাবৃষ্টিতে হাকালুকি হাওরে পশ্চিম জুড়ী ও জায়ফর নগর ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হেক্টর জমির ধান ঝরে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে ।

fakhrul_islam

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: