সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

লন্ডনের দিনগুলি

Story21459959311ফেরদৌস জামান :
পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শহর লন্ডন। ইতিহাস থেকে জানা যায় ৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা ব্রিটেন দখল করে নেয়। অতঃপর পূর্ব ইংল্যান্ডের কোলচেস্টার নামক জায়গায় স্থাপন করে তাদের প্রশাসনিক রাজধানী। রাজধানীতে যাতায়াতের সুবিধার্থে টেমস নদীর ওপর একটি সেতুও নির্মাণ করে। সেতুর একপাড়ে কোলচেস্টার এবং অপরপাড়ে গোড়াপত্তন করে লিন্ডিনিয়াম নামক একটি শহরের।

কালের পরিক্রমায় সেই লিন্ডিনিয়ামই আজ লন্ডন নামে পরিচিতি। টেমস নদীর তীরে অবস্থিত শহরটি প্রায় চারশত বছর আগ থেকেই ইউরোপে তার প্রথম স্থান বজায় রেখে চলেছে। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতকে এটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। কারণ সে সময় বিশ্বের সব উল্লেখযোগ্য স্থানই কোনো না কোনোভাবে ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে ছিল। আর লন্ডন ছিল সেই রাজত্বের রাজকার্য ও অর্থনীতির মূলকেন্দ্র।

সুন্দর, সুশৃঙ্খল, পরিপাটি, সাজানো গোছানো যাই বলি না কেন লন্ডন শহরের জন্য এসব বিশেষণই প্রযোজ্য। দুইতলা একেকটি বাড়ি। প্রতিটি বাড়ির সম্মুখে ছোট্ট বাগান। পেছনে অনুচ্চ প্রাচীরঘেরা তুলনামূলক বড় ফাঁকা জায়গা। একটি অংশে থাকে সবজি বাগান এবং অপর অংশে কাপড়চোপড় শুকানো ও খোলা আকাশের নিচে বসার জায়গা।

রাস্তার দুইপাশ ধরে টালি বসানো লাল ছাদের টানা দালান। তারই মধ্যে একেকটি বাড়ি আলাদা করা। প্রতিটি বাড়ির অভ্যন্তরের কাঠামো কাঠ দিয়ে তৈরি। যেমন, সিঁড়ি, মেঝের পাটাতন, ছাদ, ছাদের নিচের পাড়ন ইত্যাদি। নতুন কোনো বাসায় ওঠা বা বদলানোর সময় আমাদের দেশের মত ফ্রিজ, চুলা, অভেন, ওয়াশিং মেশিনসহ অন্যান্য অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি টেনেটুনে বহন করতে হয় না। অর্থাৎ, বাড়ির সাথে এসবও মেলে।

সময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ছয়ঘন্টা এদিক সেদিক। সুতরাং, ঘুমের রুটিন পুরোপুরি ঠিকঠাক হতে দুই তিনদিন লেগে গেল। শীতের দেশের সকাল বেলা। জানালার কাঁচ গলে মোটা পর্দার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো মিষ্টি রোদ সরাসরি এসে পড়েছে চোখের ওপর। নরম বিছানায় কম্বল গায় দিয়ে এপাশ ওপাশ করছি। দরজায় কড়া নেড়ে ডাকলেন পাপ্পুদা- উঠুন, নাস্তা প্রস্তুত হয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের মানুষ পাপ্পুদা।

মাত্র একদিন আগে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে তড়িঘড়ি খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি আমার অপেক্ষায় বসে আছেন। খেতে খেতে বললেন, নতুন এসেছেন তাই আর কি। তবে প্রতিদিন এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আগে বুঝে উঠুন তারপর না হয় রান্নায় হাত লাগাবেন।

লেখকের বাসস্থান স্টাডলী রোড

লন্ডনে যাওয়ার পর অনুভূতি সম্পর্কে কাছের লোকেরা প্রথম যে কয়টি বিষয়ে জানতে চায় তারমধ্যে অন্যতম হল পানি। অর্থাৎ লন্ডনের পানি কেমন লাগছে? দুইচার বার খেয়ে থাকলে, এককথায় যে কেউ-ই বলে দেবে-বেশ সুস্বাদু! আমার মন্তব্য শোনার পর পাপ্পুদা বলেন, বেশ মিষ্টি না! বলতে বলতে তার মুখে এক ধরনের জলজভাব পরিলক্ষিত হলো। যেন জলপাই আচার প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে। সত্যিই সেখানকার পানি তৃপ্তিদায়ক, পেট ভরে পান করা যায়। না প্রয়োজন পড়ে ফুটানোর, না ছাকনি দিয়ে ছেকে নেওয়ার। ট্যাপ থেকে ঢেলে সরাসরি পান করা যায়। কি নিরাপদ ব্যবস্থা! তারিফ না করে উপায় নেই। অথচ, আমাদের দেশের কি অবস্থা -ট্যাপের মুখে ছাকনিওয়ালা ক্যাপ, একঘন্টা ধরে ফুটানো, তারপর আবারও ছেকে পান করা। এত্তসবের পরও রয়ে যায় দূর্গন্ধ।

দুইদিন পর রান্নাঘরে গিয়ে দেখি সবকিছু সাজানো গোছানো। চুলা জ্বালাতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বিপাকে পড়ি। চুলা আছে তবে তাতে কোনো ফুটা-টুটা নেই। মুখে কেবল গোলাকৃতির একটি করে পুরু লোহারপাত বসান। পরে আবিষ্কার করতে সক্ষম হই তা আসলে বৈদ্যুতিক চুলা। সেখানে গ্যাসের চুলার কোনো ব্যবস্থা নেই। লোহারপাতের গরমে রান্না হতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। বাসা বাড়ির ময়লা আবর্জনা অপসারণে রয়েছে অত্যান্ত চমৎকার ব্যবস্থা। প্রতিটি বাড়ির সামনে বাগানের কোনায় থাকে একটি করে ঢাকনিওয়ালা বড় আকারের বীন। দিনশেষে ময়লার পলিথিন তাতে রেখে দিলে পরের দিন সকাল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীরা তা নিয়ে যায়। সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি রাখবার জন্য গ্যারেজ বা আলাদা কোনো জায়গার প্রয়োজন পড়ে না। যার যার গাড়ি বাড়ির সামনে খোলা রাস্তায় ফেলে রাখে তবে তা অবশ্যই সুশৃঙ্খলভাবে।

বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথম কিনতে হলো মোবাইল ফোনের সিম। ভেকটন, লিবেরা কী কী সব নানান কোম্পানির সিমকার্ডে বাজার সয়লাব। একই কোম্পানি বা অপারেটরে কথা বলতে টাকা কাটা হয় প্রথম দশ মিনিটের পর থেকে। তার মানে প্রথম দশ মিনিট ফ্রি। সবসময় কোনো না কোনো অপারেটরের এমন সব অফার থাকেই। এই সমস্ত কোম্পানি উদ্যোক্তাদের বেশিভাগ নাকি ইন্ডিয়ান। ফুটপাথে সিম, চার্জার, ব্যাটারি ইত্যাদি জিনিসপ্রত্রের ছোট্ট দোকান নিয়ে বসেছে খুলনার ছেলে বালা কৃষ্ণ। অল্পক্ষণেই ভাব হয়ে যাওয়ায় তার কথামতো একটি সিম কিনি।

এরইমধ্যে হঠাৎ সামনে এসে এক মহিলা হাতের বাটিটা বাড়িয়ে ধরে। কালো বোরখায় আবৃত সারাটা শরীর এবং কোমরের ওপরের অংশ সম্পূর্ণ নিচদিকে ঝোকানো। লন্ডনে অনেক কিছুই থাকতে পারে অন্তঃত ভিক্ষুক নয় -যাওয়ার আগে এমনটাই জানতাম। আমি তো চমকে উঠি। অভয়দিয়ে বালাদা বলেন, বসনিয়ান ভিক্ষুক, ইচ্ছা করেই কোমর ঝুকিয়ে রাখে।

পরবর্তীতে লক্ষ করি সমস্ত ভিক্ষুকের ভিক্ষা করার তরিকা একই। ইস্ট লন্ডন এলাকাটা তুলনামূলকভাবে লন্ডনের অনুন্নত জায়গার মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যা পরবর্তীতে শহরের অন্যান্য এলাকায় যাওয়ার পর বুঝতে পারি। সেখানে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি এবং বাঙ্গালির সংখ্যা বেশি। বাঙ্গালি বলতে সিলেট বিভাগের মানুষ বেশি। তাছাড়া সারা ইংল্যান্ডে তো সিলেট বিভাগের লোকেরা সংখ্যাগরিষ্ট বাঙ্গালি। অনুন্নত হলেও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি নেই। রাস্তার ধুলাবালি যন্ত্রচালিত মেশিনের সাহায্যে সর্বক্ষণ পরিস্কার করা হয়। ঝকঝকে তকতকে পথঘাট, পাশ দিয়ে দ্রুত গতির গাড়ি চলে গেলেও ধুলার একটি কনাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে পথ চলতে সবচেয়ে বাজে যে জিনিসটি চোখে পড়ে তা হল পানের পিকের দাগ। ফারাজ করলে দেখা যায়, তা আসলে আমাদেরই শিল্প প্রতিভার নমুনা। রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে জেব্রাক্রসিং চিহ্ন ছাড়া উপায় নেই। কেউ যদি লঙ্ঘন করে, আর তা পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে তবে শাস্তি অবধারিত। ব্যাস্ততম সড়ক পারাপারে কঠোরতা আরও অধিক। জেব্রাক্রসিং এলাকায় রাস্তার উভয়পাশে সিগনাল লাইট বসানো, যার সুইচ থাকে খুঁটির গায়ে। পথচারী নিজ প্রয়োজন মত সুইচে চাপ দিলে লাইট জ্বলে উঠে। অমনি গাড়িঘোড়া সব দাঁড়িয়ে পড়ে।
ইস্টলন্ডন আবাসিক এলাকা

আশপাশের এলাকাটা ভালোভাবে দেখে নেয়ার জন্য প্রথমের দিকে দুইদশ মাইল এলাকা পায়ে হেঁটেই ঘোরাঘুরি করার সিদ্ধান্ত নেই। একদিন তো হেঁটেই স্টার্ডফোর্ড গিয়েছিলাম। সেঞ্চুরিসহ অন্যান্য সুদৃশ্য বৃক্ষের ছায়ায় ঢাকা চওড়া ফুটপাথ। ফুটপাথের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ মোটামুটি দূরত্বে চলাচলের ক্ষেত্রে স্থানীয়রা ফুটপাথকেই বেছে নেয়। এর পেছনে একটি কারণও রয়েছে। লন্ডন হল বিশ্বের অন্যতম ব্যায়বহুল একটি সিটি। গণপরিবহনের খরচ অনেক বেশি। ফুটপাথ পরিষ্কার রাখার কাজে নিয়োজিত থাকে কর্মীবাহিনী। যাদের বেশির ভাগই নারী। হাতের বিশেষ স্টিকের সাহায্যে টুকরো ও ক্ষুদ্র আবর্জনা চিমটি দিয়ে তুলে নেয়। মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাবে কিন্তু একটি বারের জন্যও হর্ণ এর শব্দ কানে পড়ে না। হর্ণ বাজানো তাদের দেশে গালি দেওয়ার সমতুল্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা এতটাই শৃঙ্খল যে, একজন বিশৃঙ্খল মানুষকেও তা সুশৃঙ্খল হয়ে উঠতে উৎসাহিত করে।

বাসে উঠার লাইনে, দোকানের লাইনে অথবা যে কোনো কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে কোনো জায়গাটাতে শৃঙ্খলা মানা হয় না? উন্নত সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য এই জিনিসটির প্রয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা যা কয়েকশ বছর পূর্বেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর তা যদি না-ই হত তাহলে এই পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে তাদের সাম্রাজ্য কায়েম করতে পারত না।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: