সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

পানামা পেপাস: কে ফাঁস করলো, স্বার্থ কার

_89063523_panama_index_draft2নিউজ ডেস্ক : কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ার গোমর ফাঁস করে বিশ্বনেতাদের ঘুম হারাম করেছে ‘পানামা পেপারস’। জার্মান দৈনিক জিটডয়েচ সাইতং ও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের বংশীবাদক ভূমিকায় এখন সারাবিশ্ব এটা ওয়াকিবহাল হলেও নেপথ্যের ফাঁসকারীকে কেউ চেনে না।
গোপন জায়গা থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কলকাঠি নেড়েছে সেই অজ্ঞাত সূত্র। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার মধ্যবর্তী দেশ পানামার একটি আইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার ফাঁস হওয়া ওই এক কোটি পনেরো লাখ নথি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে।

বিশ্বের বাঘা বাঘা নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির প্রমাণ রয়েছে এসব নথিতে। জার্মান দৈনিক জিটডয়েচ সাইতং জানিয়েছে, তাদের প্রতিবেদক বাস্তিয়ান ওবারমেয়ারের সঙ্গে ২০১৪ সালের শেষ দিকে অজানা সূত্রটির সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

সূত্রটি কোনো টাকা পয়সা, আর্থিক সুবিধা কোনো প্রতিদান দাবি করেননি। তিনি কেবল তার নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচয় জানাতে চাননি। চোরা পথে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অজানা সূত্রটি যোগাযোগ করত তার সঙ্গে।

চ্যাটের মাধ্যমেই বেশিরভাগ সময় যোগাযোগ হতো। শত চেষ্টা করেও ওবারওয়ে অজানা সূত্রের নাম-পরিচয় জানতে পারেননি। বাস্তিন ওবেরমায়ের জানিয়েছেন, অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির ইচ্ছা ছিল ‘এসব অপরাধ মানুষ জানুক’।

বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা, ধনী ব্যক্তি ও তাদের আত্মীয়স্বজন মিলে কীভাবে রাষ্ট্রের অর্থ লুট করছেন, তা বিশ্ববাসীকে জানাতে চেয়েছিলেন তিনি। তার ইচ্ছা শুনে বাস্তিন ওবেরমায়ের আগ্রহ দেখান। কিন্তু অজ্ঞাত ওই ব্যক্তি বাস্তিনকে সতর্ক করে বলেন, ‘গোপন নথি ফাঁস হলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।’

ফলে অজ্ঞাত ঠিকানা ব্যবহার করে তিনি তার কাছে থাকা বিপুল নথিভাণ্ডার দেবেন। কোনোমতে সরাসরি দেখা করবেন না। বাস্তিন তার কথায় রাজি হন। অজ্ঞাত ওই সূত্রটি বারবার সতর্ক করে তার জীবনশংকা রয়েছে। চ্যাট বার্তায় ওবারমেয়ার প্রথমে জানতে চান, ‘কত গোপন তথ্য আছে?’

অজানা সূত্র থেকে উত্তর আসে, ‘যা তিনি কখনো চোখে দেখেননি।’ ওবারমেয়ার বলেন, অজ্ঞাত সূত্রটি চোরা চ্যানেল দিয়ে তাকে এক কোটির বেশি নথি পাঠান। ভার্চুয়ালি যার পরিমাণ ২.৬ টেরাবাইট। এসব নথি দিয়ে ৬০০ ডিভিডি ভরে ফেলা সম্ভব।

অজানা সূত্রটি বেশ কিছু চোরা চ্যানেল দিয়ে ওবারমেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। যোগাযোগের মাধ্যম বারবার বদলে যেত। নতুন চ্যানেলে যোগাযোগের আগে পুরনো সব তথ্য মুছে ফেলা হতো। ওবারমেয়ার বলেন, ‘ওই অজানা সূত্রের নাম-পরিচয় কিছুই জানি না।

তবে তার সঙ্গে এত যোগাযোগ হয়েছে যে তিনি অনেকটাই চেনা হয়ে গেছেন। কারণ এই কয়েকটা বছরে আমার স্ত্রীর সঙ্গে এত কথা বলিনি।’ জার্মান পত্রিকাটিতে আরও জানানো হয়, এত তথ্যের বিনিময়ে অজানা সূত্র কিছু চাননি। কেবল নিজের নিরাপত্তা চেয়েছেন।

পত্রিকাটি এসব তথ্য পাওয়ার পর তা ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে) দেয়। আইসিআইজে-এর কাছ থেকে সেসব নথি পায় যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান, ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বাংলাদেশের নিউ এইজসহ ৭৮টি দেশের ১০৭টি সংবাদমাধ্যম।

করজাল ফাঁকি দিয়ে বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের টাকা লুটেপুটে বিদেশে পাঠানো কিংবা অবৈধ আয়ের টাকায় ‘বৈধ’ ক্ষমতার মালিক হওয়া- এসব এখন খুবই সহজ। বিশ্বের সাবেক-বর্তমান ৭২ জন রাষ্ট্রনায়ক ও ১৪০ জনের অধিক রাজনীতিবিদ এভাবেই গড়েছেন টাকার স্বর্গ।
কেবল রাজনীতিবিদ নয়, বিশ্বখ্যাত ফুটবলার, বলিউড তারকা ব্যবসায়ী, চোরাকারবারিসহ অনেকেরই গোমর ফাঁস হয়ে গেছে পানামার ল’ফার্ম মোসাক ফনসেকার এক কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি আলোয় আসার মধ্য দিয়ে।

মোসাক ফনসেকা:
পানামাভিত্তিক ল’ফার্ম ও কর্পোরেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এটি। বার্ষিক ফির ভিত্তিতে এরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা’ এবং এ বিষয়ে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে। সদর দফতর পানামায় হলেও মোসাক ফনসেকার কাজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ৪২টি দেশে ৬০০ কর্মী এর ওয়েবসাইট সচল রেখেছেন।
বিশ্বব্যাপী এর শাখা সংগঠনগুলো স্বতন্ত্র ল’ ফার্ম হিসেবেও স্বনামে খ্যাত। মোসাক ফনসেকা ‘অফশোর’ সেবায় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান, যারা তিন লাখেরও বেশি কোম্পানির হয়ে কাজ করে। অফশোরে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মধ্য দিয়ে মোসাক ফনসেকা গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকিতে সহায়তা করেছে।

অফশোর কোম্পানি খোলা বা এর মাধ্যমে ব্যবসা পুরোপুরি বৈধ হলেও মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানি এবং মুদ্রা পাচারের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের অর্থও ফনসেকার মাধ্যমে নিরাপত্তা পেয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজটি হয়েছে শেল কোম্পানির মাধ্যমে। এসব কোম্পানির অধিকাংশই ‘ট্যাক্স হেভেন’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দ্বীপরাষ্ট্র নিবন্ধিত।

শেল কোম্পানি:
শেল কোম্পানি হচ্ছে একটি বৈধ ব্যবসার খোলস। মূল অর্থের মালিকের নাম গোপন রাখার পাশাপাশি ওই অর্থের ব্যবস্থাপনা করাই এ ধরনের কোম্পানির কাজ। সাধারণত আসল মালিকের নাম এসব কোম্পানির কোনো কাগজে থাকে না। শেয়ার মালিকদের মধ্যে থাকেন আইনজীবী ও অ্যাকাউন্টরা।
কখনও কখনও মালিকের অফিসের অফিস সহকারীও এসব শেল কোম্পানির পরিচালক বনে যান। কাগজে-কলমে একটি ঠিকানা ছাড়া আর কিছুই থাকে না বলে অনেক সময় শেল কোম্পানিগুলো ‘লেটারবক্স’ কোম্পানি নামেও পরিচিত।

মোসাক ফনসেকার মতো অফশোর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের শেল কোম্পানি খুলতে এবং ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করে। কোনো একটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থাকে এর বেশির ভাগ শেয়ার মালিকের হাতে। শেল কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকে অন্য কোনো কোম্পানি।
ওই কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কোনো আইনজীবী হয়তো শেল কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে এসেছেন, যদিও তিনি নিজে মালিক নন। সেই নিয়ন্ত্রক কোম্পানিও হয়তো এই শেল কোম্পানির মালিক নয়। তারা হয়তো অন্য কোনো কোম্পানির সম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এই শেল কোম্পানিরও দেখভাল করছে।

ট্যাক্স হেভেন:
ধরা যাক আপনি একটি শেল কোম্পানি খুলেছেন। এখন এই কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করতে আপনাকে নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন করতে হবে। যেসব দেশে কর আইন কড়া, সেখানে আপনার শেল কোম্পানির জারিজুরি ফাঁস হতে সময় লাগবে না।

এজন্য আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে এমন একটি দেশ বা এলাকা, যেখানে কর দিতে হয় খুবই কম, সরকার আপনার টাকার উৎস জানতে চায় না, কোম্পানির আসল মালিক কে তা নিয়েও মাথা ঘামায় না, ব্যাংকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে উদারভাবে।

ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, ম্যাকাও, বাহামা ও পানামার মতো দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বর্গরাজ্য। এ কারণে এসব অঞ্চলকে ‘ট্যাক্স হেভেন’ বলা হয়। এ রকম কোনো একটি করস্বর্গে নিবন্ধিত হয়ে গেলেই আপনার শেল কোম্পানি ব্যবসার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

এরপর এই কোম্পানির কাগুজে ব্যবসায় অবৈধ উৎসের টাকা বৈধ হয়ে যাবে; তারপর চলে যাবে নিরাপদ কোনো অ্যাকাউন্টে। ওই টাকার মালিক আপনিই থাকবেন, এক্ষেত্রে আপনার সরকারের কাছে আপনাকে মোটা অংকের ট্যাক্স দিতে হবে না।

চাহিবামাত্র পাবে বাহক:
শেল কোম্পানি খুলে অফশোর লেনদেনে নাম লুকিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতবদল করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বাড়তি একটি বলয় হল ‘বেয়ারার শেয়ার’ বা ‘বেয়ারার বন্ড’। টাকার ওপরে যেমন লেখা থাকে- ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’, বেয়ারার শেয়ারও তেমনই। অর্থাৎ যার পকেটে থাকবে, তিনিই এর মালিক। নিজের মর্জিমাফিক তিনি তা ভাঙাতে বা খরচ করতে পারবেন, কোনো ব্যাংকের লকারে বা আইনজীবীর ব্রিফকেসে রেখে দিতে পারবেন।

মালিকের নাম কেউ জানবে না। পানামার কোনো ল’ ফার্মে যদি এই বন্ড রাখা হয়, তাহলে ওই বন্ড যে আদৌ আছে এবং তার মালিক যে আসলে আপনি- তা জানার সাধ্য কারও নেই।

কালো টাকা সাদা করা:
‘বেয়ারার শেয়ার ও বন্ড’র মাধ্যমেও এ প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ আদান-প্রদান করা যায়। যার মাধ্যমে সহজেই ‘কালো’ টাকাকে ‘সাদা’ করে ফেলা সম্ভব, যা দিয়ে পরে যে কোনো দেশে ‘বৈধ’ ব্যবসা করা যায়, কেনা যায় সম্পদ। অপরাধী ও করখেলাপিরা এই সুবিধা নিয়মিত ব্যবহার করে বলে যুক্তরাষ্ট্র সেই ১৯৮২ সালেই বেয়ারার বন্ড বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।

মুদ্রা পাচার:
আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ পথে অর্জিত কালোর ময়লা ধুয়ে ফর্সা করার একটি পর্যায় হল মানি লন্ডারিং, যার মাধ্যমে কোনো প্রশ্নের উদ্রেক না করেই ওই অর্থ ব্যবহার করা যায়। একজন চোরাকারবারি, একজন জালিয়াত বা একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের পকেটে মোটা অংকের কালো টাকা জমে যা তাকে ওই কায়দায় ফর্সা করে নিতে হয় আইনের হাত এড়িয়ে চলার জন্য।

তিনি ওই টাকা মোসাক ফনসেকার মতো কৌশলী ও ‘বৈধ’ কোনো ল’ ফার্মের মাধ্যমে কোনো একটি করস্বর্গে পাঠিয়ে দিতে পারেন। সেখানে ওই টাকায় একটি শেল কোম্পানি খুলে ওই অর্থ বেয়ারার শেয়ার বা বন্ডে রূপান্তর করে নেয়া যেতে পারে।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: