সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভূমিকম্প : ইসলাম, বিজ্ঞানের দৃষ্টি ও করণীয়

15. hadithশাহিদ আহমদ হাতিমী::
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মনুষ্যসমাজ যখন পাপাচারের নিকৃষ্ট শিখরে আরোহণ করে তখন আল্লাহ তাআলা নানান দুর্যোগ প্রদর্শন করেন। এমনি এক প্রদর্শিত দুর্যোগের নাম ভূমিকম্প বা ভূকম্পন। ভূ-অভ্যন্তরে শিলাপীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূপৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে। কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তি সৃষ্টি হয়, তা ভূকম্পন বা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই তরঙ্গ ভূগর্ভের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপন্ন হয় এবং উৎসস্থল থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভূকম্পন, জলকম্পন, শিলাবৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি দুর্যোগগুলো পাপের পথ থেকে ফিরে আসার জন্য সৃষ্টিকুলের প্রতি সৃষ্টা প্রদত্ব সতর্ক সংকেত বলে আমরা বিশ্বাস করি। নিম্নে ভুকম্পন তত্ত্ব, ইসলামের দৃষ্টিকোন তথা কুরআন হাদিসের নির্দেশনা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন এবং ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে নিবন্ধটিতে আলোকপাত করা হচ্ছে।

ভূমিকম্প সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিকোন:- কেন এত ভূমিকম্প সংঘঠিত হয়? এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, তাঁর ইচ্ছা এবং তিনি যা কিছু প্রেরণ করবেন সে সকল বিষয়ে তিনিই সবকিছু জানেন, তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সর্বাধিক অবহিত। তাঁর আইন-কানুন ও আদেশের রদবদল কেউই করতে পরেনা। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদেরকে সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের নিদর্শন সৃষ্টি করেন এবং বান্দাহর উপর প্রেরণ করেন যাতে করে তারা মহান আল্লাহ কর্তৃক তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও ভীত হয়। বান্দাহ কর্তৃক মহান আল্লাহর সাথে যখন শিরক করা হয় (অর্থাৎ, ইবাদত করার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে অংশিদারিত্ব করে) তখন আল্লাহ তাআলা ভূমিকম্পের ন্যায় নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করেন, যাতে করে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের বোধদয় হয়। নিম্নে ভূমিকম্প সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা তথা কুরআন হাদিসের দৃষ্টিকোন তুলেধরা হল।

মহান আল্লাহ বলেন “(আসলে) আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আযাবের) নিদর্শনসমূহ পাঠাই” (সূরা বনি ইসরাঈল ১৭:৫৯)। “অচিরেই আমি আমার (কুদরতের) নিদর্শনসমূহ দিগন্ত বলয়ে প্রদর্শন করবো এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও (তা আমি দেখিয়ে দিবো), যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে পরিস্কার না হয়, এটা (কুরআনই মূলত) সত্য; একথা কি যথেষ্ট নয় যে, তোমার মালিক সবকিছু সম্পর্কে অবহিত?” (সূরা হা-মীম আস সিজদা : ৫৩) “বল: আল্লাহ তাআলা তোমাদের নিকট, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ (জমিন) থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষম, অথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।” (সূরা আল আনআম : ৬৫)। আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন, “বল: আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে)” যার ব্যাখ্যা হলো, তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; “অথবা তোমাদের পায়ের নীচ (জমিন) থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষম”, যার ব্যাখ্যা হলো, ভুমিকম্প এবং ভূমি ধসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া। নিঃসন্দেহে বর্তমানে যে সকল ভূমিকম্পগুলো ঘটছে তা মহান আল্লাহর প্রেরিত সতর্ককারী নিদর্শনগুলোর একটি, যা দিয়ে তিনি তাঁর বান্দাহদের ভয় দেখিয়ে থাকেন। এই ভূমিকম্প এবং অন্যান্য সকল দূর্যোগগুলো সংঘঠিত হওয়ার ফলে অনেক ক্ষতি হচ্ছে, অনেকে মারা যাচ্ছে এবং আহত হচ্ছে; এই দূর্যোগগুলো আসার কারণ হচ্ছে, শিরকী কার্যকলাপ (ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে মহান আল্লাহর অংশীদার বানানো) এবং মানুষের পাপ (মহান আল্লাহ যে কাজগুলো করতে নিষেধ করেছেন সে কাজগুলো করার কারণে)। এক্ষেত্রে মহান আল্লাহ বলেন “(হে মানুষ) যে বিপদ আপদই তোমাদের উপর আসুক না কেন, তা হচ্ছে তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই, এবং (তা সত্ত্বেও) আল্লাহ তাআলা তোমাদের অনেক (অপরাধ এমনিই) ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আশ শূআরা : ৩০)। “যে কল্যাণই তুমি লাভ কর না কেন, (মনে রেখো) তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, আর যেটুকু অকল্যাণ তোমার উপর আসে তা আসে তোমার নিজের থেকে”। (সূরা আন নিসা : ৭৯)।

মহান আল্লাহ অতীত জাতির উপর প্রেরিত আযাব সম্পর্কে বলেন:- “অতঃপর এদের সবাইকে আমি (তাদের) নিজ নিজ গুণাহের কারণে পাকড়াও করেছি, এদের কারো উপর প্রচন্ড ঝড় পাঠিয়েছি (প্রচন্ড পাথরের বৃষ্টি) {যেভাবে লূত জাতির উপর প্রেরণ করা হয়েছিল}, কাউকে মহাগর্জন এসে আঘাত হেনেছে {যেভাবে শুআইব (আ.) এর জাতির উপর আঘাত হেনেছিল}, কাউকে আমি যমীনের নীচে গেড়ে দিয়েছি {যেভাবে ক্বারুন জাতিদের উপর এসেছিল}, আবার কাউকে আমি (পানিতে) ডুবিয়ে দিয়েছি {নূহ জাতি ও ফেরাউন ও তার লোকদেরকে যেভাবে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল}, (মূলত) আল্লাহ তাআলা এমন ছিলেন না যে তিনি এদের উপর যুলুম করেছেন, যুলুম তো বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর করেছে”। (সূরাতুল আনকাবুত: ৪০) এখন মুসলামানদের এবং অন্যান্যদের খুবই আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর নিকট তওবা করা উচিত, আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট একমাত্র দ্বীন ইসলামকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরা এবং আল্লাহ তাআলা যেসব শিরকী কার্যকলাপ ও পাপ কাজ করতে নিষেধ করেছেন (যেমন: নামায পরিত্যাগ না করা, যাকাত আদায় করা থেকে বিরত না হওয়া, সুদ-ঘুষ না খাওয়া, মদ না পানকরা, ব্যাভিচার না করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা না করা, গান ও বাদ্যযন্ত্র না শোনা, হারাম কাজ সমূহ ভঙ্গ না করা প্রভৃতি) তা থেকে বিরত থাকা। এসব নির্দেশ পালনকারীদের বিষয়ে আসা করা যায়, তারা এই দুনিয়া ও পরবর্তীতে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহ তাদের আযাব থেকে নিরাপদ রাখবেন এবং তাদের উপর রহমত বর্ষন করবেন। আল্লাহ আহলে কিতাবধারীদের সম্পর্কে বলেন: “যদি তারা তাওরাত ও ইনজিল (তথা তার বিধান) প্রতিষ্ঠা করতো, আর যা তাদের উপর তাদের মালিকের কাছ থেকে এখন নাযিল করা হচ্ছে (কুরআন) তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতো, তাহলে তারা অবশ্যই রিযিক পেতো তাদের মাথার উপরের (আসমান) থেকে এবং তাদের পায়ের নীচের (যমীন) থেকেও”। (সূরাতুল মায়িদা: ৬৬)।

ভূমিকম্প সম্পর্কে হাদিসের দৃষ্টিকোন:- নিম্নে ভূমিকম্প সম্পর্কে হাদিসের দৃষ্টিকোন তুলেধরা হলো। আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন “তোমদের উপর থেকে আযাব (আসমান থেকে)” নাযিল হলো তখন রাসূল (সা.) বললেন, “আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি”, অথবা “ যখন তোমাদের পায়ের নীচ (জমিন) থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষম” নাযিল হলো, তখন তিনি (সা.) বললেন, “আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি”। (সহীহ আল বুখারী, ৫/১৯৩)। হাদিসে আরো বর্নিত হয়েছে:- যখন কোথাও ভূমিকম্প সংঘঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল (স) সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন, “যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো।” (আল-বুখারী ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮)।

আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে- কিন্তু তার খিয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যার্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নেবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দেবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, জাতির সবচেয়ে দূর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসকরূপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, মানুষকে তার অনিষ্টতা থেকে রক্ষার জন্য সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পানকরা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দেবে, এমন সময়ও আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)। [তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং-১৪৪৭]

ভূমিকম্প সম্পর্কে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন:- ভূমিকম্প সম্পর্কে বিজ্ঞানিদের অনেক কথা রয়েছে। এখানে সংক্ষেপে ভূমিকম্প বিষয়ক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন তুলে ধরা হলো। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (খরঃযড়ংঢ়যবৎব) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার)সহ এর ভূ-পৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (চষধঃব) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি নড়াচড়ার দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানিরা আরও বলেছেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেখান থেকে ভূকম্প-তরঙ্গ উৎপন্ন হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে। এই কেন্দ্র থেকে কম্পন ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শিলার পীড়ন-ক্ষমতা সহ্যসীমার বাহিরে চলে গেলে শিলায় ফাটল ধরে ও শক্তির মুক্তি ঘটে। তাই প্রায়ই ভূমিকম্পের কেন্দ্র চ্যুতিরেখা অংশে অবস্থান করে। সাধারণত ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে এই কেন্দ্র অবস্থান করে। তবে ৭০০ কিমি. গভীরে থেকেও ভূকম্পন উত্থিত হতে পারে। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক-দুই মিনিট স্থায়ী হয়। মাঝে মাঝে কম্পন এত দুর্বল হয়, যা অনুভব করা যায় না। কিন্তু শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশিষ্ট বিজ্ঞান, আবিষ্কার ও হাদিস গবেষক আল্লামা ইবনে আল-কাইয়ূম (রহ.) বলেন:- “মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরনের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়; এটা মানুষগুলোকে ভীত করে, তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়”। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হতো তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলতেন:- “মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সতর্ক করছেন”। মদীনায় একবার ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) তার জনগণকে ভাষণে বললেন:- “যদি আরো একবার ভূমিকম্প সংগঠিত হয় তাহলে আমি এখানে তোমাদের সাথে থাকবো না।” সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকদের কাছে এরকম আরো অনেক ঘটনার বিবরণ রয়েছে। উল্লেখ করতে হয় যে, চলতি (২০১৫) সালের ২৫ এপ্রিল নেপালের কাঠমান্ডুসহ আশপাশে দেশ প্রদেশে আঘাত হানে এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে শুধু নেপালেই নিহত হন ৩ হাজারেরও অধিক মানুষ।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প:- লাল সবুজের প্রিয় এ দেশের ভেতরে ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিগত প্রায় ২০০ বছরের ভূমিকম্পের যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, ১৯০০ সালের পর থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে ১০০’রও বেশি ভূমিকম্প; তার মধ্যে ৬৫টিরও বেশি ঘটেছে ১৯৬০ সালের পরে। এ থেকে এই বিষয়টা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের মাত্রা বেড়েছে। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয় এবং ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে হয় ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্প। সদ্যগত ২৫, ২৬ ও ২৭ এপ্রিল ২০১৫ সালে পরপর তিন দিন ৫.০ মাত্রার মৃধ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এতে নিহতের সংখ্যা অল্প হলেও আহতের সংখ্যা অনেক। অনেক বিশেষজ্ঞর মতে, অনেক ভূতাত্ত্বিক ছোট ছোট ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়া বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। অতীতের এসব রেকর্ডকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, যে কোনো সময় বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। সুতরাং আমাদেরকে নিজ নিজ উদ্যোগসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেনতার পাশাপাশি যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ভূমিকম্প সম্পর্কে পরামর্শ ও করণীয়:-আমেরিকান রেডক্রসের পরামর্শ অনুযায়ীÑ ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি। অর্থাৎ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়–ন, তারপর কোনো শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে কাভার নিন, এমন ডেস্ক বেছে নিন বা এমনভাবে কাভার নিন যেন প্রয়োজনে আপনি কাভারসহ মুভ করতে পারেন। তাদের মতে, কোনো ভবন ভূমিকম্পরোধক হলে তা খুব কমই ধসে পড়ে; যেটা হয় তা হলো আশপাশের ফার্নিচার গায়ের ওপর পড়ে নেক-হেড-চেস্ট ইনজুরি বেশি হয়। তাই এগুলো থেকে কোনো শক্ত ডেস্ক বা এ রকম কিছুর নিচে ঢুকে কাভার নেওয়া। ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর/লিফট ব্যবহার পরিহার করুন। ভূমিকম্পের সময় যদি গাড়িতে থাকেন তবে গাড়ি বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকুন। গাড়ির বাইরে থাকলে আহত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। প্রথম ভূমিকম্পের পর ইউটিলিটি লাইনগুলো (গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) একনজর দেখে নিন। কোথাও লিক বা ড্যামেজ দেখলে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন। ভূমিকম্প হচ্ছে এ ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারলে তাড়াহুড়া করবেন না, এক কথায় অতিরিক্ত আতংকিত (চধহরপ) হবেন না।

ভূমিকম্পের আগে করণীয়:- (১) বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে নিরাপদ স্থানগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। যাতে ভূমিকম্পের সময় ভাবতে না হয় কোথায় আশ্রয় নেবেন। বাসায় যারা ছোট তাদেরকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। (২) গুরুত্বপুর্ণ জিনিস সব সময় বন্ধ শেলফে রাখা উচিত। (৩) ভারী মালপত্র উপরে রাখবেন না, শেলফের নিচের দিকে রাখুন। ঝাঁকুনিতে যেন এগুলো গায়ের ওপর না পড়ে। (৪) লিক হওয়া গ্যাস লাইন, বৈদ্যুতিক লাইন মেরামত করে নিন এবং নিয়মিত পরীক্ষা করুন। (৫) মাঝে মাঝে ভূমিকম্প ও জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার দিন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন যাতে সবাই নিজেকে রক্ষা করতে পারে। (৬) নিজের কর্মক্ষেত্রে, বাসায় ও প্রতিবেশীদের এ বিষয়ে সচেতন করুন, সাথে আপনার কমিউনিটিকেও। (৭) শুকনো খাবার ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার কিছু সরঞ্জাম হাতের কাছে রেডি রাখুন সব সময়। (৮) অন্ধকারে দেখার জন্য টর্চ রাখুন বাড়ির প্রতিটি কক্ষে অথবা হাতের কাছে। (৯) স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় ভূমিকম্প সম্পর্কে বাচ্চাদের শেখান। বাসাতেও আপনার সন্তানকে শিক্ষা দিন।

ভূমিকম্পের পরে করণীয়:- (১) ভূমিকম্প শেষ হলেও আরও কম্পনের জন্য প্রস্তুত থাকুন, প্রায়ই পরপর কয়েকবার কম্পন হয়, এই আফটার শকের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। (২) কম্পন থেমে গেলেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, তারপর বের হন। উপর থেকে ঝুলন্ত জিনিসপত্র কিছুক্ষণ পরেও পড়তে পারে। (৩) নিজে আহত কিনা পরীক্ষা করুন, অপরকে সাহায্য করুন। (৪) কোথাও বৈদ্যুতিক স্পার্ক চোখে পড়লে মেইন সুইচ বা ফিউজ বন্ধ করে দিন। (৫) বৈদ্যুতিক,গ্যাস চালিত সব ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বিরত থাকুন। (৬) যদি বহুতল ভবনের উপরের দিকে কোনো তলায় আটকা পড়েন, তাহলে আপনি এখানে আছেন সেটা উদ্ধারকারি দলের কাছে আওয়াজ পৌছানোর চেষ্টা করুন। (৭) ভূমিকম্পের কারণে যদি আপনি আহত হন তবে বেশী টানা-হেচড়া করবেন না। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে আপনার দ্রুত মৃত্যু হতে পারে। (৮) ভূমিকম্পের ফলে ধভঃবৎ ংযড়পশং, বভভবপঃ যেমন সুনামি হতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিন। (৯) রেডিও থাকলে দূর্যোগ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য পাবার জন্য সেটি চালু রাখুন। টেলিফোন, মোবাইল চালু থাকলে প্রয়োজনীয় সাহায্য চাওয়ার জন্য এবং ক্ষয়ক্ষতি রিপোর্ট করার জন্য সেটি ব্যবহার করুন। (১০) ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য আগেই সাথে রুমাল বা তোয়ালে বা চাদরের ব্যবস্থা করে রাখুন। (১১) ম্যাচ জ্বালাবেন না। দালান ধ্বসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে। (১২) ছোটখাট আঘাতে সম্ভব হলে নিজের পরিধেয় বস্ত্র ছিড়ে ক্ষতস্থান বেধে দিন। (১৩) পাইপে বা ওয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন। (১৪) একজায়গাতে, রাস্তাতে জড়ো না হয়ে বরং সড়ক পথকে ফাকাঁ রাখুন যাতে জরুরী সাহায্যের যানবাহন দ্রুত চলাচল করতে পারে। (১৫) আহত লোকদের যতটুকু সম্ভব সাহায্য করুন। কেউ আটকা পড়লে চেস্টা করুন উদ্ধারের। না পারলে তাকে বা তাদেরকে পানি ও খাবার দিন এবং অভয় দিন। (১৬) মনে রাখবেন, আপনার উত্তেজনা কিংবা ভয় আপনার জন্য সবচেয়ে বেশী ক্ষতির কারন হবে, তাই যত বিপদেই পড়ুন- কখনোই সাহস হারাবেন না। আসুন! আমরা সকলেই সচেতন হই।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: