সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সাংবাদিকতা ও অনলাইন গণমাধ্যম

Online Jernalijomশাহ সুহেল আহমদ :

সাংবাদিকতা বিষয়ক একটি কাসের অংশ বিশেষ দিয়ে শুরু করি। গেল বছরের মাঝামাঝিতে অনলাইন নিউজ পোর্টালের গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে। ওই প্রশিক্ষণে দেশের সিনিয়র সাংবাদিকরা কাস নেন। প্রশিক্ষণের একটি কাসে বর্তমান সময়ের প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিকের যুগ্ম সম্পাদক কাস নিতে গিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টালে যারা কাজ করছেন তাদেরকে সাংবাদিক বলা যাবে কি না সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করলেন।
সবশেষে তিনি বেশ কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বললেন, যারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন কিংবা তাৎক্ষণিক ঘটে যাওয়া ঘটনা তুলে ধরেন তাদের কি সাংবাদিক বলা যাবে? অথবা যারা বøগে-টুইটারে লিখেন তাদের কি সাংবাদিক বলা যাবে? অনলাইন গণমাধ্যমকর্মীরা সমস্বরে বললেন-‘না’। ‘না’ কেন জানতে চাইলে নানা বিষয় ওঠে আসলো।
তিনি আরও পরিষ্কার করে বললেন, ফেসবুক, টুইটার কিংবা বøগে লিখতে হলে কারও কোনো অনুমোদন নিতে হয় না। ঠিক একইভাবে অনলাইন গণমাধ্যমে লিখতে হলেও কারও কোনো অনুমোদন নিতে হয় না। একটি ফেসবুক একাউন্ট খুলতে একটি ইমেইল, কিছু পরিচিতি আর একটি পাসওয়ার্ড লাগে। ঠিক তেমনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলতে কারও কোনো অনুমোদন লাগে না। একটি ডোমেইন, একটি ইমেইল, কিছু পরিচিতি, একটি পাসওয়ার্ড আর ৪-৫ হাজার টাকা হলেই একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে যে যা ইচ্ছা লিখতে পারছে। খুব সহজেই সম্পাদক, সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, নির্বাহী সম্পাদকের মতো পদবীগুলো যে যার মতো করে নামের আগে বসিয়ে দিতে পারছে। কারও কাছে কোনো জবাবদিহীতা নেই।
অথচ, একটি সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেলের অনুমোদন আনতে মাস তো দূরের কথা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। কত ঘাম ঝরাতে হয়। কত অর্থ খরচ হয়। আবেদন করে এক যুগ পেরিয়ে গেছে কিন্তু অনুমোদন মেলেনি এমন নজিরও রয়েছে। তারপর হয়তো অনুমোদন পাওয়া গেল, তাতেই কী শেষ? এটি চালু করতে কত রকমের প্রস্তুতি। প্রকাশ-প্রচার হলেও এ মাধ্যমগুলোতে যেমন ইচ্ছা তেমন লেখা যাবে না। নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনেই তবে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। কোথাও ভুল হলে জবাবদিহী করতে হয়।
ওই প্রশিক্ষক বললেন, তাই ফেসবুক কিংবা বøগে লিখলে যেমন কাউকে আমরা সাংবাদিক বলতে পারি না, ঠিক তেমনিভাবে এই মুহূর্তে অনলাইন গণমাধ্যমে যারা লিখছেন তাদেরও সাংবাদিক বলা যাবে না।
এ তো গেলো একটি কাসের কথা। এখন আসি মূল কথায়। বাংলাদেশে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক অথবা রেডিও যে মাধ্যমের কথাই বলি না কেন তার প্রকাশ কিংবা প্রচার করতে নিদিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। প্রতিটি গণমাধ্যমের (তা কাগুজে বা ইলেকট্রনিক যাই হোক না কেন) নিজস্ব নীতিমালা থাকে এবং এ নীতিমালা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য। এর পাশাপাশি নীতিমালা সত্য, গণমুখী ও ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশে সহায়ক হওয়া উচিত। অথচ, বর্তমানে দেশে অনলাইন গণমাধ্যমের জয়জয়কার থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা চূড়ান্ত হয় নি। যা নিতান্তই দুঃখজনক। আর এ কারণেই হয়তো অনেকেই অনলাইন গণমাধ্যমকর্মীদের এখনও সাংবাদিক বলতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
বাস্তবতা হলো বর্তমান সময়ে অনলাইম গণমাধ্যম অনেক শক্তিশালী। সচেতন পাঠকমাত্রই এখন অনলাইনের দিকে ঝুঁক। এছাড়া এখন সাধারণ পাঠকরাও জেনে গেছেন অনলাইনের জয়জয়কার। ফলে নিজে অনলাইনে প্রবেশ করতে না পারলেও পাশে থাকা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘অমুক জায়গায় শুনলাম এই ঘটনা ঘটেছে, দেখেন না ভাই ইন্টারনেটে কিছু দিলো কি না।’
নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অনলাইন গণমাধ্যমে পজিটিভ দিকের চেয়ে নেগেটিভ দিকটা এখনও বেশি। চা’য়ের দোকানদার, সিএনজি চালক থেকে নিয়ে সমাজের ক্যাডার শ্রেণির লোকরাও এই সুবাধে সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের সামনে এখন ‘সাংবাদিক’ কিংবা ‘প্রেস’ লেখা স্টিকারের শেষ নেই। অলিতে-গলিতে সাংবাদিক পাওয়া যাচ্ছে। আর জিজ্ঞেস করলেই শুনতে হচ্ছে অমুক ডটকম-তমুক ডটকম। যা আমাদের জন্য মোটেই শুভনীয় নয়।
এতেও কোনো সমস্যা ছিল না যদি না তারা সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা মেনে চলতো। উল্টো তারা নানা অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। অনলাইন নিউজ পোর্টালের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নানা জায়গায় চাঁদাবাজির মতো ঘটনারও খবর বেরিয়ে আসছে। মাত্র ক’দিন আগে সিলেটে এমনই একটি ঘটনা ঘটে গেছে। যা বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।
গেল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় নির্বাচনী সংবাদ কাভার করতে সাংবাদিক পাস কার্ড নিতে গিয়ে অনলাইন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেক সিনিয়র সাংবাদিক। এ নিয়ে খোদ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল সচিত্র প্রতিবেদন করেছে। ওই প্রতিবেদনে তারা বলছে, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমকর্মীদের পাসের জন্য যে পরিমাণ আবেদন পড়েছিল তার তিনগুণ বেশি আবেদন পড়েছে অনলাইন গণমাধ্যমকর্মীদের। এছাড়া ব্যক্তি চরিত্র হননেরও একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

আবার পজিটিভ বিষয় হচ্ছে, অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রকাশনার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদনের বালাই না থাকায় এসব নিজউ পোর্টালের কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য সংবাদ প্রকাশে সাহসী ভূমিকা দেখিয়ে আসছে। এমন কয়েকটি নিউজ পোর্টাল রয়েছে যেগুলো বিদেশ থেকে তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে। বিটিআরসি এ ধরনের কয়েকটি নিউজ পোর্টালের প্রচারণা বন্ধ করে দিলেও পরক্ষণেই দেখা গেছে এগুলো ভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।
সংবাদপত্র একটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প। যদিও এর শুরু হয়েছিল মুখে মুখে। তারপর হাতে লেখা সংবাদপত্র এসেছে। মুদ্রণ মাধ্যম আবিষ্কৃত হবার পর বিপ্লব ঘটে যায়। মুদ্রণ যন্ত্রটিও নানা বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়েছে। বিকশিত করেছে প্রযুক্তিকে। লেটার প্রেস থেকে অফসেট প্রেস, হাতের কম্পোজ থেকে ফটো কম্পোজ, তারপর কম্পিউটার কম্পোজ হয়ে প্রযুক্তি এখন সংবাদপত্রকে নিয়ে গেছে অনলাইনে। শুধু অনলাইনে নিয়ে গেছে বললেই হবে না, অনেক পাঠক এখন অনলাইন নির্ভর হয়ে যাচ্ছেন। কারণ মুহূর্তের ঘটনা মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে। তাই এর প্রতি মানুষের ঝুঁকও বাড়ছে।
একটা বিষয় আমাদের মানতে হবে যে, অনলাইন থেকে পেছনে যাবার সুযোগ আর নেই। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সম্প্রতি সিলেটে বাস-মিনিবাস এবং সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকদের মধ্যে বেশ গণ্ডগোল হয়ে গেল। বাস-মিনিবাসের শ্রমিকদের দাবি, সিএনজি অটোরিকশা’র অবাধ চলাচলের কারণে আমাদের যাত্রী দিন দিন কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন বাসে উঠতে চায় না। সিলেটের অভ্যন্তরীণ অনেক রুটে বাসের যাত্রী না থাকায় আমাদের বাস চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
আসলে প্রকৃতপক্ষেও তাই। খুব সহজে সিএনজি অটোরিকশা প্রাপ্তি এবং দ্রুত সময়ে চলাচল করা যায় বিধায় সাধারণ মানুষ সিএনজির দিকেই ঝুঁকে গেছে। দূরগামী যাত্রীরাও এখন সিএনজি দিয়ে যাতায়াত করছেন। এজন্য টাকা বেশি দিতে হলেও তাতে বাধা নেই। কারণ সহজে যাতায়াত করা যাচ্ছে।
এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাস শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিলেন। তাদের দাবি- সিএনজি অটোরিকশা’র অবাধে চলাচল বন্ধ করতে হবে। বাস শ্রমিকদের ধর্মঘটের জবাব দিতে পাল্টা ধর্মঘটের ডাক দিলো সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকরা। এ ঘটনার সমাধানে সিলেটের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উভয়পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন। বিষয়টির স্থায়ী সমাধান না হলেও আপাতত থামানো গেল।
সিলেট প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আমার অন্য বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল। প্রসঙ্গক্রমে বিষয়টি চলে আসলো। তিনি বললেন, শ্রমিকদের এই অবস্থায় যখন আমরা বৈঠকে বসলাম, তখন বাস শ্রমিকদের আমরা বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, মানুষ এখন দ্রুত কাজ সারতে চায়। এতে ব্যয় বাড়লেও তাদের সমস্যা নেই। মানুষ যখন সিএনজিকে চাচ্ছে আপনারা সেটা বন্ধ করবেন কীভাবে?
যা হোক সে প্রসঙ্গে আমি যাচ্ছি না। আমি ঘটনাটি বললাম এ কারণেই যে, পাঠক এখন অনলাইনে খুব দ্রুত খবর জেনে নিতে চায়। এখানে অনলাইনকে জব্দ কিংবা বাদ দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। দিনদিন অনলাইনের পাঠক সংখ্যা বাড়বেই। তবে এজন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা নিতান্তই প্রয়োজন। যাতে করে ভুঁইফোড়-রা সাংবাদিকতার কার্ড গলায় ঝুলিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের মান বিনষ্ট করতে না পারে। সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের পাশাপাশি দেশের সিনিয়র সাংবাদিকদের দৃষ্টি দেয়া উচিত।

লেখক: জার্নালিস্ট ফেলো, বিজিএমইএ-ইউনিভার্সিটি।

dailysylhet---

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: