সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৮ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভোট বর্জন, বাঙালি স্বভাব এবং শান্তির প্রত্যাশা

City-Election-2015মীর আব্দুল আলীম ::

বর্তমান সরকারের অঙ্গিকার ছিলো, তাদের অধীনে প্রতিটি নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। কিন্তু তা কি আদৌ হয়েছে? দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং সর্বশেষ ৩ সিটি নির্বাচনেই এর সঠিক জবাব মিলবে। গণমাধ্যমের বদৌলতেই দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে।

৩ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা দুপুর না গড়াতেই নির্বাচন বর্জন করেছেন। বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচন বর্জনে সরকারদলীয়রা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ব্যাপক ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোটের মহোসৎসব শুরু হয়। এ নির্বাচনে জয়ী হয় তিন সরকার দলীয় প্রার্থী। এ নির্বাচন নিয়ে দেশে বিদেশে আলোচনার ঝড় ওঠে। পত্রিকাগুলো নানা শীরোনামে সংবাদ ছেপে সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। “শান্তিপূর্ণ ভোট ডাকাতি” হয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন। ভোট ডাকাতি সম্পন্ন হয়েছে, তাও আবার শান্তিপূর্ণভাবে! আজকাল আমাদের কথার সাথে কাজের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বলছি একটা, আর করছি অন্যটা। বলতেই হয় এ ক্ষেত্রে বাক্যপ্রয়োগে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বলতে হয় যথার্থ ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে। “নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি” সেখানে বলা হচ্ছে “শান্তিপূর্ণ ভোট ডাকাতি”। এ জাতীয় ডাকাতি প্রকাশ্যে প্রশাসন, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং আমজনতার চোখের সামনে এমনভাবে সম্পন্ন হচ্ছে যে, ডাকাতির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার আগে শান্তিপূর্ণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। জানি এ জাতীয় বাক্য প্রয়োগে বিজ্ঞজনদের মনোকষ্ট অনেক, তবুও ভোটের নামে ৩ সিটি কর্পোরেশরে নির্বাচনে যা ঘটেছে তাতে এমন বাক্য প্রয়োগ মন্দ কিছু নয়। ভোট ডাকাতি, কারচুবি, জালিয়াতি সেই যাই বলি না কেন এ ক্ষেত্রে বিএনপির ভোট বর্জনের বিষয়টিও সামনে আসে। হঠাৎ করে ভোট বর্জ ঠিক হয়নি এমন মন্তব্যও করছেন অনেকে। ভোট বর্জনের কারণে আওয়ামীলীগের প্রার্থীদের সমর্থকরা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

খালি মাঠ পেলে যা হয় তাই হয়েছে কোথাও কোথাও। বাঙালি স্বভাব বলে কথা। তবে, ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ২০ দলীয় জোটের সমর্থীত তিন প্রার্থীই বেশ ভোট পেয়েছেন। সর্বত্রই বলাবলি হচ্ছে, ভোট বর্জন না করলে তাঁদের কেউ কেউ জিতেও যেতে পারতেন। ভোট কারচুপির অভিযোগ তুললেও, ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট পেয়েছেন চট্টগ্রামের ২০ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী মেয়র মনজুর। তার চেয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২৪ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন। ঢাকা উত্তরে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল সোয়া ৩ লাখ ভোট পেয়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার ভোটে হেরেছেন। দক্ষিণে মির্জা আব্বাস প্রায় ৩ লাখ ভোট পেয়ে হেরেছেন প্রায় আড়াই লাখ ভোটে। বিরোধী জোট ভোটে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ করলেও বর্জনের আগ পর্যন্ত বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল পরিমাণ ভোট পাওয়ার দিকটি বেশ লক্ষনীয়। আমরা মনে করি বিএনপির প্রার্থীদের ওই সময়ে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করাটা মোটেও ঠিক হয়নি। যতদুর আলোচনায় বুঝা যায়, নির্বাচন বর্জন না করলে হয়তো এতরফা ভোটে আওয়ামীলীগের সব প্রার্থী জয়ী নাও হতে পারতো। ২টি কিংবা ১টির বিজয় বিএনপির কাছে যাওয়ার সম্ভবনাই ছিলো বেশি। এটাই বরং বিএনপির জন্য তো বটেই দেশবাসীর জন্যও মঙ্গল হতো। কিছুটা হলেও ঝুঁকিমুক্ত হতো দেশ। জ্বালাও-পোড়াও আর আতংকের হাত থেকে রক্ষা পেত দেশের আমজনতা। বিএনপির ভোট বর্জনের বিষয়টিকে অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন। বর্জন না করলে জেতার সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করেন কি না- জানতে চাইলে চট্রগ্রামের মেয়র প্রার্থী মনজুর সাংবাদিকদের বলেন, “ভোটে আমাদের পক্ষে জনগণ রায় দেবে, এ নিয়ে আশ্বস্ত ছিলাম। স্বাভাবিকভাবে যতক্ষণ ভোট হয়েছে, তার ৮০ শতাংশই আমি পেয়েছি। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। যা হয়েছে আপনারা দেখেছেন, পরিস্থিতির কারণে ভোট বর্জন করেছি। মনজুর আরও বলেন, ‘আমাকে যারা পছন্দ করেন, তাদের অনেকেই আফসোস করছে (অবশ্যই বিএনপি সমর্থিতরা)। হয়ত অনেক কিছুই হতে পারত (বিজয়)। জনগণের আফসোসের জন্য আমি দুঃখিত।” মনজুর বক্তব্য থেকেই কিন্তু বোঝা যায় ভোট বর্জন সঠিক হয়নি। নজরকাড়া ব্যাপার হলো ভোট চলার মাঝপথে দুপুরের পর বিএনপির মেয়রপ্রার্থীদের একযোগে নির্বাচন বর্জন। এমনটা আর কখনোই হয়নি। বিরোধী দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের একযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘটনাটি এদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অভিনব ও বিস্ময়কর। প্রশ্নবিদ্ধতো বটে!

যাই হোক, অবশেষে তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হলো। দেরিতে হলেও তিন সিটির লক্ষ লক্ষ বাসিন্দা তিনজন নির্বাচিত নগরপিতা পেলেন। বিতর্ক নির্বাচনের পিছু ছাড়লো না। এদেশের প্রায় সব নির্বাচনেই যেমনটি হয়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক উঠল যথারীতি অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ হলো। এ-যেন জন্মদাগের মতো নির্বাচনী ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছে আমাদের। সংঘর্ষ, কারচুপি, কেন্দ্র দখল, জালভোট, অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ির দুষ্টচক্র থেকে কবে যে এদেশের ‘গণতন্ত্র’ মুক্তি পাবে তা কেবল ভবিষ্যৎই জানে। অদূর না হলেও সুদূর ভবিষ্যতে হয়তো এসব থেকে মুক্ত হবে আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও হোঁচট-খাওয়া গণতন্ত্র।

এবারের তিন সিটি নির্বাচনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হচ্ছে, ভোটকেন্দ্র দখল, ভুয়া ভোট, সন্ত্রাস সৃষ্টি করে বিরোধীদলীয় এজেন্টদের বিতাড়িত করা, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি। এ অবস্থায় এ নির্বাচনে অনিয়মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এর আগে আশঙ্কা ছিল, বিএনপি ও তার মিত্ররা হয়তো ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় সিটি নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে। কিন্তু অনেকটা কৌশলগত কারণেই বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিলে এই নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয় তুমুল উত্তেজনা। দীর্ঘদিন বিএনপিও সমমনাদের আন্দোলন থেকে বের হয়ে আসায় জনমনে স্বস্তিও ফিরে আসে। জনগণ এ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে। বিএনপির এমন ঘোষণায় সাধারণ ভোটাররাও নড়েচড়ে বসে। জমে ওঠে তিন সিটির নির্বাচন। কিন্তু এ নির্বাচনেও যা হবার তাই হয়। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা নির্বাচনী ফলাফল নিজেদের দখলে নিতে স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে প্রমাণ করেছে ভোটের অধিকার কতটা বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পতিত। জনগণ নতুন করে দেখেছে, তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি ক্ষমতাসীনরা কতটা মর্যাদাহীন করতে পারে। তবে এর জন্য সরকারদলকেই একতরফা ভাবে দায়ি করবো না। বিএনপির প্রার্থীদের ভোট বর্জনও সরকারদলের সমর্থকদের বেপরোয়া করে তোলো। নির্বাচন শুরুর কিছু পরই বিএনপি প্রার্থীদের ভোট বর্জনের ঘোষণা সবাইকে হতাশ করে বৈকি! আমরা মনে করি ভোট বর্জনের ঘোষণা কেবলই সান্ত্বনা। ভোট বর্জন করলেই নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায় না। নির্বাচন তার স্বগতিতেই চলতে থাকে। বরং বিরোধীদের কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ায় সরকারদলীয়রা তাতে সুযোগ নেয়। বর্জন করে কোন নির্বাচনের ভোট কার্যক্রম বন্ধ থেকেছে, ফলাফল বন্ধ রয়েছে তার অন্তত নজির নেই। ভোট বর্জনে ভোটরারা হতাশই হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারদলের একতরফা মনোভাব আমাদের ব্যথিত করেছে। তাতে পাবলিক সেন্টিমেন্ট মোটেও সরকারের অনুকূলে যায়নি। বরং ভোটের অধিকার নিয়ে মানুষ নতুন করে মহাভাবনায় পড়েছে। জনগণ ভোট দিতে না পেরে অসহায়ত্ববোধ করছে।

বর্তমান সরকারের অঙ্গিকার ছিলো, তাদের অধীনে প্রতিটি নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। কিন্তু তা কি আদৌ হয়েছে? দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং সর্বশেষ ৩ সিটি নির্বাচনেই এর সঠিক জবাব মিলবে। গণমাধ্যমের বদৌলতেই দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। আমরা পত্রিকা আর টিভিতে দেখেছি, কিভাবে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল শক্তি প্রয়োগ করেছে। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা হুট করে নির্বাচন বর্জন না করলে, ক্ষমতাসীন দল শক্তি প্রয়োগ না করলে, ভোটকেন্দ্র দখল না করলে, ভোট কারচুপি না করলে, আওয়ামীলীগের তিন সিটির মেয়রই তাদের দখলে যেত কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ ছিলো। সরকার যত কথাই বলুক, জাতীয়, উপজেলা এবং সিটি নির্বাচনে সাধারণ জনগণ স্বাধীনভাবে মতের প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। আমরা সরকারের যেমন সমালোচানা করতে চাই, পাশাপাশি বিএনপিরও ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তকে আমরা কিছুতে বাহবা দিতে পারি না। বিএনপির ভোট বর্জনের বিষয়টি কৌশলগত, এবং ভুল সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি। ভোটের সর্বনাশ আর গণতন্ত্রের হার যুগে যুগে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। আমরা এই রাহু থেকে মুক্ত হতে পারছি না। কবে মুক্ত হব তা-ও জানি না। বিপক্ষের লোকজনকে হুমকি আমাদের দেশে পুরনো সংস্কৃতি। কেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া আগেও দেখেছি। কিন্তু বিপক্ষের লোকজন সবসময় সতর্ক থাকেন। তারা কেন্দ্র পাহারা দেন। নেতা-কর্মীরা কষ্ট করে মাঠ ধরে রাখেন। ঝুঁকি নেন। কিন্তু এবার সিটি নির্বাচনে তা দেখিনি। বিএনপির কর্মীরা ঝুঁকি নেননি। হুমকির কাছে মাথা নত করেছেন। কারণটা কী?

পরিশেষে বলবো, ভোট শান্তিপূর্ণ না হওয়ার দায় সরকারের, ভোট বর্জনের দায় বিরোধীদের। সরকার এবং বিরোধীদের দায়ভার যেন জনগণের উপর গিয়ে না বর্তায় এই প্রত্যাশা আমাদের।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: