সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শিশু বাচ্চার মাথা কেটে নিয়ে এ আবার কেমন উৎসব?

34.bachaআন্তর্জাতিক ডেস্ক::
লোকসংস্কৃতি। মূল কথা হল, জগৎ-সংসারকে ভোগকরতে হলে ত্যাগের মাধ্যমেই তার রসাস্বাদনকরতে হয়। তাই প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালিরাফাগুন দিনের ফাল্গুনী রচনা করে রাধাকৃষ্ণকেসাক্ষী রেখে চৈত্রমাসে শিবের সাধনা করে।স্থান কাল ভেদে কেউ বলত শিবের গাজন, কেউ বলতনীলের গাজন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের একটিগ্রামে শিবের গাজন পালনের লোমহর্ষক বর্ণনাদিয়েছেন সে দেশের লেখক শান্তনু গাঙ্গুলি। আরসেই লেখাটি প্রকাশ করা হলো এলএবাংলাটাইমস এরপাঠকদের জন্য।

খবরটা হঠাৎ কানে এসেছিল। সম্পূর্ণ বিশ্বাসকরতে পারিনি। আবার এটাও ভেবেছিলাম‚ অসম্ভবঘটনাই তো ঘটে চলে সব সময়। রাত থাকতেই সেইগ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলাম। বর্ধমান স্টেশন থেকেবাইকে চল্লিশ মিনিটের মতো রাস্তা। গ্রামেঢোকার আগে থেকেই একটা অদ্ভুত রকমের ঢাকেরআওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। কেমন যেন দ্রিমি-দ্রিমি একটা রহস্যজনক আওয়াজ।আগে থেকেই খবর নিয়ে রেখেছিলাম। বর্ণনাঅনুয়ারী মূল রাস্তা থেকে একটা অপরিসর গলিদিয়ে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা যাওয়ার পর একটাবিরাট গাছের তলায় এসে দাঁড়ালাম।

গাছটিকেঘিরে লোকজনের ইতস্তত জটলা দেখে বুঝলাম‚ এটাইসেই জায়গা‚ আকাশের রঙ তখন সবে বদলাতে শুরুকরেছে। হাল্কা আর সুগন্ধি ধুনোর ধোঁয়া:তারমধ্যেই দেখলাম একটা লোক গাছ থেকে একটানোংরা চটের বস্তা নামিয়ে আনছে। এগিয়েগেলাম। প্রচুর মানুষ সেখানে ভিড় করে আছে।কাছে যেতে একটা তীব্র দুর্গন্ধ নাকে এলো।বস্তা থেকে বেরোল কয়েক দিন আগে মারা যাওয়া‘মানুষ’-এর পচাগলা দেহ এবং দেহাংশ। বিশেষতকাটা মাথা। একটা শিশুর মৃতদেহও বার করা হল।সেখান থেকে মাংস গলে-গলে পড়ছে।এবার ওই দেহ এবং দেহাংশ দড়িতে বেঁধে গোটাগ্রামে উল্লাস করতে-করতে ঘুরবে কিছু মানুষ।পুণ্যলোভী মানুষ। যাদেরকে বলা হয় ‘সন্ন্যাসী’।এটি আসলে হিন্দু ধর্মীয় আচার। চৈত্র সংক্রান্তি‚ অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন পালিত হয় এইশিবের গাজন উৎসব। অনেক জায়গাতেই শিবেরগাজন হয়। কিন্তু বর্ধমান কুড়মুন গ্রামের গাজনএকটু অন্যরকম ভাবে পালিত হয়। একই ভাবে হয়পার্শ্ববর্তী পলাশী‚ নাসিগ্রাম‚ভাণ্ডারডিহি-সহআরো বেশ কয়েকটি গ্রামে। কিন্ত ভয়াবহতার দিকথেকে কুড়মুন এদের সবাইকে ছাপিয়ে যায়। আর সেইকারণেই কুড়মুনের গাজন সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত(বা কুখ্যাত)। সেই পৈশাচিক গাজন দেখাররোমহর্ষক অভিজ্ঞতা হয়েছিল একবার।

হিন্দু লোকাচারে গাজনের রীতি খুবই পুরোনো।প্রচলিত মতবাদ অনুয়ারী‚গাজনের সন্ন্যাসীরা(বেশিরভাগই অবশ্য শুধু চৈত্র মাসের জন্য‘সন্ন্যাস’ নেন) চৈত্র সংক্রান্তিতে ভূত অর্থাৎশিবের শিষ্য হয়ে যান। বিশ্বাস করা হয়‚ মৃতদেহবা দেহাংশের মধ্যে তখন যার দেহ‚ তার আত্মাফিরে আসে। তাই শিবের শিষ্য নন্দি-ভৃঙ্গিরঅনুকরণে চলে এই পিশাচ-তাণ্ডব।যদিও এই বিষয়েমতপার্থক্য আছে।ফিরে আসি কুড়মুন গ্রামের গাজনের কথায়। অতিদুর্গন্ধের মধ্যে মত্ত অবস্থায় গাজন-সন্ন্যাসীরাগ্রামের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে ঘুড়ে জড়ো হন মূলমন্দির প্রাঙ্গনে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে অগণিতমানুষ।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা গাজনদেখতে আসেন। আর্থিক ভাবে যথেষ্ট ‘উন্নত’ এবং‘শিক্ষিত’ এই গ্রামের মানুষের কাছে এই উৎসবগর্বের এবং ঐতিহ্যের। তাই গ্রামের যেসব মানুষকর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকেন তারাওএই সময় গ্রামে আসেন। যে রাস্তা দিয়েসন্ন্যাসীরা যান‚ তার দু ধারে প্রচুর মানুষদাঁড়িয়ে থাকে। সন্ন্যাসীরা মাঝে মাঝে তাদেরগায়ে সেই মৃতদেহ ছুঁইয়ে দেন। দর্শনার্থীদেরগায়ে তখন সেই পচা-গলা দেহাংশ লেগে যায়।আমার পাশে দাঁড়ানো একজনের তেমনই ঘটনাঘটেছিল। এমনকী আমি যখন একদিকের রাস্তা থেকেআসা শোভাযাত্রার ফটো তুলতে ব্যস্ত ছিলাম; ঠিকতখনই পাশ থেকে একজন এসে আমার গায়ে একটাকাটা মাথা ছুঁইয়ে দেয়।

আমার হাতে‚ ক্যামেরায়সেই পচা-গলা মাংস লেগে যায়। কিন্তু এই সবইখুব সাধারণ ঘটনা। গ্রামের লোকেরা এতে একটুওঅবাক হয় না। তাই তো কত বাবা-মা তাদের ছোট্টশিশুকে কোলে নিয়ে এই শোভাযাত্রা দেখতে আসে।কেউ কেউ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণও করে।অনুষ্ঠানে যাতে কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা নাঘটে তার জন্য প্রচুর পুলিশ মোতায়েন থাকে। যদিওএই অনুষ্ঠানটাই বেআইনি। কোনও সভ্য সমাজে তোএটা চলতে পারে না।বছর দুয়েক আগে বর্ধমান জেলার শক্তিগড়ে পুলিশআটজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ‚ গাজনের জন্যএই সন্ন্যাসীরা মৃতদেহ চুরি করে আনছিলেন।রাস্তায় লোকেদের দুর্গন্ধে সন্দেহ হয় এবং তারাপুলিশে খবর দেন। সে বছর গাজনের আনন্দ একটু কমহয়ে যায়। কিন্তু মৃতদেহ সেই বছরেও ছিল‚ এইবছরেও থাকবে।

মৃতদেহের যোগানের কারণে কখনোএই উৎসব বন্ধ হবে না।আগে আরো বেশি মৃতদেহ থাকত। কারণ এই সময়েইআগে বসন্ত রোগে প্রচুর মানুষ মারা যেতো। বেশকয়েক বছর আগের ঘটনা। শোনা যায়‚ একটি শিশুমারা যায়। তার বাড়ির লোক কোনোরকম আওয়াজ নাকরে রাতের অন্ধকারে শবদেহ দূরের একটি গ্রামেকবর দিয়ে আসে (হিন্দু ধর্মানুসারে বয়স পাঁচবছরের কম হলে তাকে দাহ করার বদলে কবরদেয়াই রীতি)।

পুজো উদ্যোক্তারা কোনোভাবেজানতে পেরে যান। এবং ওই শিশুটিকে কবর থেকেতুলে আনেন।ধর্মে বা ধর্মবিশ্বাসে তো কখনোই কোনো ব্যাঘাতবা আঘাত করা যাবে না! শুধু ভাবি‚ সেইসন্তানহারা মায়েরা যখন প্রতিবছর শুনতে পানশোভাযাত্রার উল্লাস আর ঢাকের দ্রিমি-দ্রিমিআওয়াজ‚ তখন তাদের মানসিক স্থিতি কতোটা বজায়থাকে?

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: