সর্বশেষ আপডেট : ১০ ঘন্টা আগে
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তিন ডাকাত ধরলেন যে বীরেরা

full_1672748654_1429696498নিউজ ডেস্ক :: ‘ওরা আমার এলাকার লোকজনকে মেরে চলে যাবে, আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? জীবন বাজি রাখছি কি না জানি না। তবে ওদের ছাড়িনি। খুনি ধরতে পারছি, এইটাই শান্তি, টাকার লোভ আমাদের নাই।’ কথাগুলো বলছিলেন রনি দেওয়ান (৩২)।

শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবে স্বস্তির ঝিলিক খেলে যাচ্ছিল তার চোখে-মুখে। সুঠামদেহী এই যুবক ও তার বন্ধুরা এখন আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকার বীরে পরিণত হয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতদলের আক্রমণের পর যে কয়েকজন এলাকাবাসী প্রতিরোধ গড়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম রনি। নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে মোটরসাইকেলে পালাতে থাকা ডাকাতদের ধাওয়া করেন তিনি ও তার দুই বন্ধু। ডাকাতরা তার গাড়িতে বোমা ছুড়ে মারে। গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে হাল ছাড়েননি রনিরা। সেই গাড়ি নিয়ে ডাকাতদের পেছনে ছুটতে থাকেন। একপর্যায়ে ডাকাতদের মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। মোটরসাইকেল উল্টে গেলে পড়ে যায় তিন ডাকাত। জনতার হাতে ধরা পড়ে তারা। ডাকাতদের ব্যাগে ছিল লুটের চার লাখ ২০ হাজার টাকা ও অস্ত্র। সেগুলো উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন রনি ও তার বন্ধুরা।

রনির সঙ্গে এই সাহসী অভিযানের সঙ্গী ছিলেন তার দুই বন্ধু নয়ন দেওয়ান (৩০) ও সোহেল মোল্লা (৩০), আর ছিলেন গাড়িচালক হাসান (২৭)। রনিরা ছাড়াও ডাকাতদের প্রতিহত করার আরেক নায়ক কাঠগড়া বাজার বায়তুল আমান জামে মসজিদের খাদেম তৈয়ব আলী (৪০)।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সামনেই এই মসজিদের অবস্থান। ব্যাংকের ভেতরে ডাকাতির ঘটনা টের পেয়ে তৈয়ব মাইকে অনবরত ঘোষণা করেছেন- ‘ব্যাংকে ডাকাত পড়ছে। আপনারা বাইর হন…।’ তার ঘোষণা শুনে প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ব্যাংকের ভবনের বাইরের সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। তবে ডাকাতদের গ্রেনেড, বোমা আর গুলির কাছে হার মানে সেই প্রতিরোধের চেষ্টা।

ভয়ংকর দস্যুদের রুখে দেওয়া এই পাঁচ সাহসী যুবকের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয়।

রনি দেওয়ান জানান, তিনি কাঠগড়ার পরিচিত দেওয়ান বাড়ির ইয়াকুব আলী দেওয়ানের ছেলে। কাঠগড়া বাজারে তাঁদের কয়েকটি ঘর আছে। পাশাপাশি গার্মেন্টসের কাটা কাপড়ের ব্যবসা করেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “দুপুরে খাওয়ার পর বাসার সামনে বসে ছিলাম। হঠাৎ মাইকের আওয়াজ শুনি- ‘ডাকাত ডাকাত’। দ্রুত আমার প্রাইভেট কারটি নিয়ে রাস্তায় বের হই। সঙ্গে নয়ন ও সোহেলও আসে। আমরা তিন রাস্তার মোড়ে উঠতেই লোকজন বলে, ‘ওই যে ডাকাত চলে যাচ্ছে।’ দেখি একটা লাল রঙের ডিসকভারি মোটরসাইকেল বিশ মাইলের দিকে যাচ্ছে। আমরা সেটিকে ধাওয়া করি। কিছুদূর যেতেই ওরা আমার গাড়িতে বোমা মারে।”

কাঠগড়ার আমতলা এলাকার আজমত গার্মেন্টে রাখা ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি দেখিয়ে রনি বলেন, ‘তবু থামিনি, হাসানকে (চালক) বলি, জোরে চালা। পেছন থেকে বাড়ি দে। ৫০০ মিটারের মতো যাওয়ার পর আমরা মোটরসাইকলটিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই। তখন লোকজনকে নিয়ে ডাকাতদের একটাকে ধরে ফেলি। বাকি দুজন দৌড়ে গেলেও পরে ধরা পড়ে।’

রনির বন্ধু নয়ন ও সোহেল জানান, মোটরসাইকেলে থাকা তিনজনের মধ্যে দুজনের পরনে ছির জিন্সের প্যান্ট, গায়ে ছিল শার্ট। একজনের পরনে ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবি। সেই ছিল মোটরসাইকেলের চালক। ভারাসাম্য হারিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে যাওয়ার পর ডাকাতদের কাঁধে থাকা দুটি ব্যাগও সেখানে পড়ে যায়। একটি ব্যাগ থেকে টাকা বের হয়ে আসে। তিনজন মিলে (রনি, নয়ন ও সোহেল) সেই টাকা গুনে পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখানে ছিল চার লাখ ২০ হাজার টাকা। ডাকাতদের একটি ব্যাগে তিনটি বোমাও ছিল বলে জানান রনিরা।

ডাকাতদের তাণ্ডবে গতকাল কাঠগড়ার পুরো এলাকায় এতটাই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল যে কারা ডাকাতদের ধরল, এর খোঁজ নেওয়ার ফুরসত মেলেনি কারো। তবে এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই রনি ও তার বন্ধুদের।

রনি দেওয়ান বলেন, ‘আমি পরে আহত একজনরে রক্তও দিছি। আল্লাহপাক আমাদের অনেক টাকা-পয়সা আর সম্মান দিছে। আমাদের একটু ঝুঁকি হইলেও খুনি আর পাবলিকের টাকা লুটকারীদের ধরছি, এর চেয়ে শান্তি আর কী হইতে পারে।’

টের পাইয়া আর দেরি করি নাই ঘটনার আকস্মিকতায় এখন অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তৈয়ব আলী। গতকাল সন্ধ্যায় আলাপকালে তিনি বলেন, ‘টের পাইয়া আর দেরি করি নাই। মাইকে বলে দিছি। তবে আমার ভাইগোরে বাঁচাইতে পারলাম না। সবগুলা ডাকাতও ধরা পড়ল না। নিজের চোখে দেখলাম। ক্যামনে মারতাছে।’

তৈয়ব আলী ও মসজিদের ইমাম মো. জহিরুল ইসলাম জানান, মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর স্থানীয় ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী মনির প্রথমে ছুটে আসেন। সিঁড়ির কাছে ডাকাতরা গুলি করে, বোমা মেরে মনিরকে হত্যা করে। মসজিদ থেকে ঘোষণা আসার কারণে মসজিদ লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে ডাকাতরা।

স্থানীয় রাজমিস্ত্রি ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. মোখলেস বলেন, ‘আমি হোটেলে খাইতেছিলাম। মসজিদের মাইকে আওয়াজ শুইনা বাইরে বের হই। এর পরই শুনি গুলির শব্দ। একটা ডাকাত আগে সিঁড়ি দিয়া নিচে নামে আর গুলি করে। এরপর দুইটা বোমা মারে। সে মসজিদের পাশের গলি দিয়ে যায়। দুইজন মেইন রোডের দিকে সোজা রাস্তা দিয়া যায়। পরে তারা গাড়িতে ওডে।’

কাঠগড়া বাজার বায়তুল আমান জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি রজ্জব আলী দেওয়ান বলেন, ‘এমন ঘটনা আমরা জীবনে আর দেখি নাই, শুনিও নাই। এইখানে সবাই গ্রামের মতো মিলেমিশে থাকি। অনেকগুলা মানুষ মরলেও আজ খাদেম তৈয়ব আলী আর রনি দেওয়ানের জন্য তিন ডাকাত ধরা পরল। তারা বাপের বেটার মতোই কাজ করছে।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: