সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

খুলনার নার্গিস কি ভারতের ট্রেনে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন?

19.04.15নিউজ ডেস্ক: খুলনার এক অসহায় বাংলাদেশি নারী গত মাসে ভারতের আজমির শরিফে তীর্থ করতে গিয়ে আর ফেরেননি – গতকাল সোমবার সীমান্ত পেরিয়ে তার লাশ ফিরেছে পরিবারের হাতে। কিন্তু কলকাতা থেকে দিল্লিগামী ট্রেনযাত্রায় তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল কি না, এ নিয়ে তার পরিবার ও ভারতীয় পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য!

পরিবারের কথা

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ – উত্তর ভারতের ভোরবেলায় তখনও বেশ কনকনে ঠান্ডা। কলকাতা থেকে দিল্লিগামী ট্রেনটি যখন কানপুর স্টেশনে ভোররাত সাড়ে তিনটা নাগাদ থামল, তখনও আলো ফোটেনি ভালো করে। নার্গিস বেগম তার জন্মান্ধ মা আর নয় বছরের মেয়েকে নিয়ে ওই ট্রেনে চেপে দিল্লি হয়ে আজমিরের দিকে যাচ্ছিলেন – তখন ট্রেনের এক দল যাত্রী নাকি তাদের বলেছিলেন ‘এখানেই নেমে পড়, দিল্লি এসে গেছে!’

ব্যাস, অমনি হুড়মুড় করে নামার চেষ্টা শুরু করে তিনজনের অসহায় পরিবারটি। দৃষ্টিহীন মা আর বাচ্চা মেয়েটিকে আগে প্ল্যাটফর্মে নামতে সাহায্য করে ট্রেনের ভেতর থেকে মালপত্র আনতে আবার ঢুকেছিলেন নার্গিস। কিন্তু তার মুখ চেপে ধরে ট্রেনের ভেতর কয়েকজন তাকে আটকে রাখে– প্ল্যাটফর্ম থেকে তার গোঙানির শব্দও শুনতে পান মা-মেয়ে। কিন্তু তারা কিছু বুঝে ওঠার আগে ট্রেন ছেড়ে দেয়। নার্গিসের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায় তার পরিবার! আরও সাংঘাতিক, তিনজনের বাংলাদেশি পাসপোর্টই রয়ে যায় নার্গিসের কাছে।

এরপর বৃদ্ধা এক জন্মান্ধ মহিলা আর তার নয় বছরের নাতনি কীভাবে দালালকে ধরে ফের বাংলাদেশে ঢুকলেন, সেটা অন্য গল্প। কিন্তু দেশে ফেরার দিন দশেকের মধ্যে তারা সেই মারাত্মক খবরটা পেলেন– নার্গিস আক্তারের দেহ নাকি পড়ে আছে উত্তরপ্রদেশের কোন মর্গে। তারপর থানা-পুলিশ, সরকারের নানা মহলে দেনদরবারের পর অবশেষে যখন গতকাল সেই দেহ তারা ফিরে পেলেন, নার্গিসের পরিবারের বিশ্বাস তাদের আশঙ্কা সত্যি ছিল– কারণ দেহটি দেখে তাদের মনে হয়েছে মৃত্যুর আগে তাকে পাশবিক অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছে।

ভারতীয় পুলিশের বক্তব্য

উত্তরপ্রদেশে আগ্রার অদূরে মাঝারি মাপের জেলা শহর ফিরোজাবাদ। কলকাতা-দিল্লি মেইন লাইন গেছে এই জেলার বুক চিরে, আর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই ট্রেন লাইনের ধার থেকে মিলেছিল নার্গিস বেগমের মরদেহ। রেল পুলিশ সেই দেহ উদ্ধার করে রাজ্য পুলিশের হাতে তুলে দেয়, আর তার সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় তার বাংলাদেশি পরিচয়।

ফিরোজাবাদ জেলা পুলিশ একদিকে ওই মহিলার মরদেহের তদন্তের ব্যবস্থা করে – অন্য দিকে যোগাযোগ করা হয় দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে, যাতে তারা তাদের নাগরিকের দেহ ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

সেই ময়নাতদন্তের ভিত্তিতে পুলিশের ধারণা, কোনও দুর্ঘটনাবশত হয়তো তিনি ট্রেন থেকে পড়ে যান এবং তাতে তার মৃত্যু হয়। তার দেহে পরিষ্কার ট্রেনে কাটা পড়ার চিহ্নও ছিল। পুলিশ তার সব রকম মেডিক্যাল টেস্টেরও ব্যবস্থা করে। তারপর তারা দায়িত্ব নিয়ে বলছেন, ওই নারীকে আদৌ ধর্ষণ করা হয়নি।

ফিরোজাবাদ জেলার পুলিশ সুপার পীযূষ শ্রীবাস্তবের ক্ষোভটা অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ দূতাবাসকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও তারা ওই দেহ ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। ফিরোজাবাদ ছোট জেলা শহর, সেখানে মৃতদেহ সংরক্ষণের খুব ভালো ব্যবস্থাও নেই– তাই দেহটি পচে যাচ্ছিল দ্রুত। তখন পুলিশ কাছের বড় শহর আগ্রার মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে নার্গিস বেগমের মরদেহ তাদের মর্গে রাখার ব্যবস্থা করে।

কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় গড়িয়ে যাওয়ার পর মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপালও তাগাদা দিতে থাকেন – দেহটা আর রাখা যাবে না, কিছু একটা করতে হবে। তখন পুলিশ-প্রধান মি শ্রীবাস্তব কিছুটা রূঢ় ভাষায় গত সপ্তাহে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানান, দেহটা এখনও না-নিলে তারাই এর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করবেন। পুলিশের দাবি তখনই নড়েচড়ে বসে দিল্লির হাইকমিশন, তাদের প্রতিনিধি এসে আগ্রায় বুঝে নিয়ে যান নার্গিস বেগমের দেহ – যেটি সোমবার বিএসএফের উপস্থিতিতে বেনাপোল সীমান্তে তার পরিবারের কাছ হস্তান্তর করা হয়।

দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাস অবশ্য গোটা ঘটনা নিয়ে অদ্ভুতভাবেই নীরব। দূতাবাসের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তাদের কিছুই জানা নেই। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর মতো দিল্লিতে তাদের কোনও শ্রম বিভাগ (লেবার উইং) নেই, তাই ভারতে নিহত বাংলাদেশী নাগরিকদের দেহ স্বদেশে পাঠানোর জন্য তাদের কোনও আলাদা তহবিলের ব্যবস্থা নেই। এরকম ক্ষেত্রে সাধারণত দুদেশের বিভিন্ন এনজিও নিহতদের দেহ তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে থাকে।

তবে এক্ষেত্রে যে বা যারা দেহটি বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করুক – বছর তিরিশের অসহায় নার্গিস বেগমকে ভারতের একটি চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণ আর হত্যা করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।

নার্গিসের পরিবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি করেছে, তার হত্যা ও ধর্ষণের জন্য যেন ভারতের কাছে বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ পুলিশ যেভাবে ধর্ষণের অভিযোগ বেমালুম উড়িয়ে দিয়েছে এবং এটিকে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে দাবি করছে – তাতে গোটা ঘটনার উপযুক্ত তদন্তের সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: