সর্বশেষ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ..

rohomot007_1334307139_1-3441874195_ef4540c2f1মীর আবদুল আলীম ::
বছর ঘুরে বৈশাখ আসে, আর আমরা ক্ষণিকের বাঙালি হয়ে যাই! বাঙালি হতে দিগ্বিদিক ছুটি। পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরে তো হাঁটার জায়গাও থাকে না। বাঙালি হতে অনেকেই ঘর থেকে ছোটেন পহেলা বৈশাখের এই দিনে। আমি একদিনের বাঙালি হতে চাই না। বৈশাখের ওই বিশেষ দিনটাতে সকালে পান্তা, শুঁটকি ভর্তা, ইলিশ খাই না। শহরে থাকলেও শরীর থেকে গাঁয়ের (গ্রামের) গন্ধ মুছে যায়নি এখনও; মন থেকে মুছে ফেলিনি বাঙালিয়ানা। ঘণ্টা, মাস, বছর ধরেই নিজেকে বাঙালি ভাবি।

পূর্বপুরুষ তো যথার্থই বাঙালি ছিল। চিন্তা, উত্তর প্রজন্ম নিয়ে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব আর বিদেশি মিডিয়ার সর্বগ্রাসী দৌরাত্ম্যে দিন যত গড়াচ্ছে, ভাবি ছেলেগুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশি দাপটে ওদের বাঙালি রাখাই তো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে কখনো মুড়িমুড়কি, কড়িমুড়ালি, নিমকি কিংবা জিলাপি এনেছিতো আমার ছোট ছেলেটা ভেংচি কাটে। ওদের এগুলো মোটেও পছন্দ নয়। বড় ছেলেটাতো বলেই ফেলে, বাবা এগুলো ব্যাকডেটেড খাবার। রাগ করি না। ভাবি ওদের কি দোষ? আমরাই তো ওদের সাহেব বানিয়ে ফেলেছি। ওরা বলে পান্তায় নাকি লাখ লাখ ব্যাক্টেরিয়া জন্মে। আমার দাদাতো এগুলো খেয়েই ১শ ২২ বছর পার করেছেন। মৃত্যুর আগে কোন রোগবালাই দেখিনি। হাসপাতালে যাননি কখনও। জীবনের শেষ দিনের সকালেও বিনে চশমায় পত্রিকা পড়েছেন। তিনি পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। অর্থকড়ির কমতি ছিল না। তবুও তার খাবার তালিকায় ছিল কেবলই বাঙালি খাবার। বিচিকলা, বাঙ্গী, খিরাই, মিষ্টি আলু, ডাল, ভাত ছিলো প্রিয় খাবার। আমার গিন্নী মাঝে-মধ্যে মোরগ পোলাও কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানী পাকালে বলতেন, ুওসব ছাইপাশ দিওনা, ভাত দাও।চ্ ভাতের মতই সোজাসাপটা কথা দাদার। বাবার মাঝেও ভাব দেখিনি কখনও। বাঙালি মেজাজেই চলেন এখনও।

খাবার-দাবারেও এখনও তিনি ষোল আনা বাঙালি। দিন যত গড়াচ্ছে ভাবি, ছেলেগুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশি দাপটে ওদের বাঙালি রাখাইতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও বাঙালিআনা নেই। পাশ্চাত্য ঢং সবখানে। পোশাকে, খাবারে, চলাফেরা সবখানেই ভিনদেশি ভাব। কি সাহিত্যে, কি চলচ্চিত্রে সব জায়গায়ই বাঙালি হটাও মনোভাব। শতাধিক টিভি চ্যানেলে নাচ-গান আর নাটক সিনেমায় আমাদের বাঙালি থাকাই দায়। লাভ ইন সিংগাপুর মার্কা চলচ্চিত্র, আমাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান সবকিছুতেই কেমন যেন সাহেবী মেজাজ। এগুলো দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম বাঙালি থাকে কি করে?
আমরা কি বৈশাখের বাঙ্গালি? বৈশাখ এলেই একতারা হাতে ছুটে চলতে চাই কাঙালিনী সুফিয়ার মতো। ঢোল, তবলা, সারিন্দা নিয়ে গেয়ে উঠতে চাই হাছন আর লালনগীতি। গাইতে চাই আবদুল করিমের ্তুগাড়ি চলে না চলে না চলে না র্থে। কিন্তু বৈশাখ চলে গেলে আমরা সেই জ্যৈষ্ঠের খর রোদ্দুরে মলিন হয়ে যাই। হতাশ হয়ে যাই কালবৈশাখীর মতো জীবনের কিছু ঝড়ের কবলে পড়ে। সব যেন শেষ হয়ে যায়। ধুয়ে-মুছে যায় বাঙালিয়ানা। বাসায় মায়েরা সন্তানদের নিয়ে ভিনদেশি চ্যানেলে দেখছে কুটনামি ভরা হিন্দি সিরিয়াল কিংবা ্তুআউ আউ আউ্থ মার্কা গান। এত গেল বাসার খবর। আমাদের নীতিনির্ধারকরাও এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তারা ভিনদেশি অপসংস্কৃতিকে ভাড়ায় আনছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আনা হয় ভারতীয় শিল্পীদের। আর আনবেই না কেন? বাঙালি তো আর বসে নেই। লাখো দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাঠে। সরাসরি টিভি চ্যানেলেও ওই অনুষ্ঠান সমপ্রচার করা হয়। অথচ আমাদের সরকার শত চেষ্টায়ও পার্শ্ববর্তী ভারতে আমাদের টিভি চ্যানেল সমপ্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। ওরা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির শেয়ার নেবে না আর ওদেরটা আমাদের দিয়ে দেবে, তা কী করে হয়। ওদের নাটক-সিনেমার প্রভাব কিন্তু আমাদের সমাজে পড়তে শুরু করেছে। সংসারে অশান্তি, কুটিলতা, হত্যা বেড়ে গেছে। কী দেখছি আমরা এসব অনুষ্ঠানে?
ডিসেম্বরের থার্টিফার্স্ট নাইট নিয়ে কিছু না বললে লেখা অপরিপূর্ণ থেকে যায়। সেদিন কে দেশি? কে বিদেশি? বোঝা বড় দায়! একদিন বাঙালি ছিলাম র্থে তাই মনে পড়ে যায়। এই হচ্ছে থার্টিফার্স্ট নাইট সমাচার। খুবই ঘৃণার সঙ্গে বলতে হয়, আজ আমাদের সংস্কৃতিতে চলছে বিদেশি খবরদারি। হালজামানার যুবকরা হাছন রাজাকে গাইছে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। কলুষিত করছে লালন সাঁইর সাধকীয় ভাবশৈলীকে। সবকিছুতেই বিদেশি ঢঙ। বিদেশি রঙ। যে রঙের ধাঁধায় পড়ে আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রঙের মাঝে মরিচা ধরেছে। একশ্রেণীর কিশোর-কিশোরী যখন গিটার আর ড্রাম ছাড়া বাংলা গান কী, এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে না, সেও যখন হাতে একতারা বা গলায় ঢোল বেঁধে নেয়, তখন বুঝতে হবে আকাশে ঝড়, মেঘ জমেছে। বৈশাখ মানেই বাঙালির আটপৌরে জীবনে লালের দাপট, ঝড়ের সঙ্কেত আর নতুনের আবাহনে স্টাইলিশ লাইফ। যেটা শুধুই ক্ষণিকের। যখন লিখেছি, যখন আপনারা লেখাটি পড়ছেন তখন হয়তো আমাদের কন্যা-জায়া-জননীরা টিভিতে দেখছেন তুসাস ভি কাভি বহু থি্থ অথবা ওই টাইপের কিছু। আমরা মাইন্ড করিনি, কষ্ট পাই না। কষ্ট পেলেই কষ্ট হবে মনে। যা রোধ করার নয়, কষ্ট পেয়ে লাভ কী তাতে?
আমাদের দেশে হিন্দি সিরিয়ালের ক্রেজকে একটা মহামারীর সঙ্গে তুলনা করাটা বোধহয় ভুল হবে না। আমি অনেক পরিবারে বাবা-মার সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের গভীর মনোযোগের সঙ্গে হিন্দি সিরিয়াল উপভোগ করতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে তারা অকপটে পারিবারিকভাবে গিলে যাচ্ছেন একের পর এক অসামাজিক কাহিনী। যেমন মাল্টি-ডাইমেনশনাল পরকীয়া, বউ-শাশুড়ির ষড়যন্ত্র, মামার সঙ্গে ভাগি্নর সম্পর্ক, ডিভোর্সের প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মতো জঘন্য কিছু বিষয়। এর অবশ্য একটা ভালো (?) দিক আছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বলে যাচ্ছে অনর্গল। তাদের অভিভাবকরাও নিজের সন্তানের মুখ দিয়ে হিন্দি বুলি বের করে বেশ গর্ববোধ করেন। বাংলাদেশে আজকের সামাজিক অবক্ষয় আর পারিবারিক ও সামাজিক সুস্থ নিয়মনীতি ভেঙে পড়ার পেছনে হিন্দি সিরিয়ালের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়! আর এ প্রশংসার দাবিদার তারা, যারা আমাদের এ জাতীয় অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এজন্য তারা ধন্যবাদ পায় বৈকি!
আমাদের সাবধান হতে হবে। বাঙালি মনকে আরও শাণিত করতে হবে, মনের ভেতরকার জং মুছে ফেলতে হবে; আরও গভীর থেকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, বাংলাভাষাকে ভালোবাসতে হবে। আমি বাঙালি, এটা ভেতরে লালন করতে হবে। নিজেদের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি জোগাতে হবে। গুরুসদয় দত্ত তার গানে বলেছিলেন, ্তুবিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ।্থ অর্থাৎ সাহস জোগাতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের ভেতরে। কেবল বৈশাখে নয়, বাঙালি হয়ে যেতে হবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। যেন স্মৃতি হাতড়ে না বলতে হয়, একদিন বাঙালি ছিলাম রে…। একদিন বাঙালি ছিলাম রে…।

 

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: