সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ছবিটি কি ছুঁয়েছে মন?

sssবিনোদন ডেস্ক :: পরিচালক শিহাব শাহীন বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। উদগ্রীব হয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন দর্শক কোন ছবির টিকিট কিনছে! পাশের হলে তখন চলছিল কিছু ইংরেজি ছবি। এর মধ্যে ছিল হলিউড নির্মিত সাড়া জ‌‌‌াগানো ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’-এর সপ্তম পর্ব।

বাংলাদেশে সিনেমার বাজার এখন অনেক প্রতিযোগিতার। হলিউড ঢুকে গেছে বহু আগেই, নতুন করে যোগ হয়েছে বলিউড অার টলিউড ছবি। এত প্রতিযোগিতার মধ্যে পরিচালক শিহাব শাহীন হাজির হয়েছেন ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ নিয়ে। মূল অালোচনায় যাবার অাগে অনেক পুরনো একটি চ্যাপ্টার ‘ভালো প্রেক্ষাগৃহ সংকট’ নিয়ে পুনরায় কিছু কথা লিখতে হচ্ছে।

কঠিন এই সময়েও ঝলমলে চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে সিনেমার বাজারকে। কিন্তু সমস্যা হলো ভালো প্রেক্ষাগৃহ নেই। হাতেগোনা যে কটা আছে, এর মধ্যে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্স অন্যতম। সেদিন মনে হয় শিহাব শাহীন এজন্যই বিচলিত ছিলেন। বিদেশি সিনেমার তোড়ে তার মিষ্টি প্রেমের গল্প দর্শক ‘খাবে’ তো?

সিনেমা ‘খাওয়া’ এবং ‘না খাওয়া’ নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো উপমহাদেশে রয়েছে বিতর্ক। সত্যি শেষ পর্যন্ত কোন সিনেমা জনপ্রিয়তা পাবে- তা বলা মুশকিল। আবার ওই দিকে তো দর্শকের শ্রেণিবিন্যাসও আছে। যদিও চলচ্চিত্র সমালোচকরা এসব শ্রেণির তোয়াক্কা করেন না। উঁচু, নিচু, মধ্যবিত্ত বলে কোনও দর্শক সিনেমা হলে নেই, সবাই সমান। এখন এই দর্শককূল ‘খাবে’ কিনা তা অনেকটা অনিশ্চয়তার ব্যাপার।

তবে এসবের মধ্যে থেকেও আমাদের নির্মাতারা সিনেমা নির্মাণ করেন। তাদের অনিশ্চয়তাকে দূর করতে এখনও সুযোগ পেলে অনেক নির্মাতা আশ্রয় নেন সহিংসতানির্ভর এবং যৌনতা কিংবা সুড়সুড়িনির্ভর সিনেমায়। নব্বয়ের দশকে যা অধিক আকারে ছিল। এখন অবশ্য তরুণ নির্মাতারা বিপ্লব ঘটিয়ে সেসব জায়গা থেকে বের হয়ে নতুন গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছেন। অার এই বিপ্লবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ‘সহিংসতা ও যৌনতা’ বর্জন করে শিহাব শাহীন প্রেমের গল্প ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ নিয়ে হাজির হলেন। অার ছোট পর্দার এই নির্মাতা এখন বড় পর্দারও একজন। তার সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ এবং জাকিয়া বারী মম। নির্মাতার প্রথম নির্মাণ হলেও শুভ এবং মম কিন্তু নতুন নয়। অভিজ্ঞ এই দুজনই সিনেমায় পা রেখেছেন অনেক আগেই।

ছবিতে শুভর চরিত্রের নাম আবির এবং মম হয়েছিলেন নীলা। হৃদয়পুরে আবির অার নীলার কিশোর-প্রেমের কাহিনী দিয়েই শুরু হয় সিনেমা। গল্পের মাঝেই সংঘাত আসে, আসে দূরত্ব, ছিল প্রতিশোধও।

চলচ্চিত্র সমালোচনা করতে গেলে গল্প বলে দেওয়ার রেওয়াজ আছে আমাদের। এই নতুন সিনেমার গল্প বলে দিলে শিহাব শাহীনের বারোটা বেজে যাবে। সেদিকে উঁকি না দিয়ে আমরা নির্মাণের অনুসঙ্গ নিয়ে শুরু করতে পারি।

প্রথমত, বলতেই হবে এটি বাণিজ্যিকনির্ভর একটি ছবি। বাণিজ্যের সব খোরাকই এর মধ্যে আছে। স্মার্ট নায়ক, আবেদনময়ী নায়িকা, সুন্দর সুন্দর গান, কমেডি, অসাধারণ লোকেশন- সবই আছে। দর্শক চোখে দেখে যা বিনোদন পাবে তার সব উপাদানই রয়েছে সিনেমায়।

এছাড়া সিনেমাই একমাত্র মাধ্যম, যা দর্শক গভীর মগ্ন হয়ে উপভোগ করার সুযোগ পায়। এখানে অবশ্যই প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখার কথা বলছি। ঘরে টিভি সেটের সামনে বসে সিনেমা দেখলে এই বাস্তব জীবনের জটিলতা কোনওভাবেই মগ্ন হতে দেয় না। কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক যখন উপস্থিত হয়, তখন চোখের সামনে বিশাল পর্দা, চারপাশ অন্ধকার, সিনেমার শব্দ এক ভিন্ন জগতের সৃষ্টি করে। যে জগতে দর্শক হারিয়ে যায়। ওই হারিয়ে যাওয়ার জন্য হৃদয়পুরে আবির-নীলার গল্প সবাইকে এক অন্যরকম প্রেমের অনুভূতি দেবে নিশ্চিত।

যাহোক, ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ ছবির কাহিনী কয়েকটা ধাপে ভাগ করা। প্রথম গল্প হৃদয়পুর, যেখানে আবির-নীলার কিশোরবেলার প্রেম; দ্বিতীয় ধাপ ঢাকায়, যেখানে আবিরের তরুণ জীবন-যাপন। অার তৃতীয় ধাপ আবার হৃদয়পুর, যেখানে নীলা বেড়ে উঠছে গ্রামের একসময়ের প্রতাপশালী ব্যক্তি খান সাহেবের মেয়ে হিসেবে। খান সাহেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আলী রাজ।

এখানে উল্লেখযোগ্য নারীবাদী সমালোচকরা এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছেন। কারণ গল্পের মাঝের জায়গায় নীলা অনুপস্থিত ছিল। আবার তৃতীয় ধাপে নীলা যখন ফিরে আসে, তখন দেখানো হয় নীলা ডাক্তারি পড়ছে। অথচ কখনও কোনও জায়গায় নীলাকে মেডিকেল কলেজে যেতে দেখা যায়নি! এমনকি নীলা কোন কলেজে পড়ছে, তাও দর্শকের অজানাই থেকে যায়। নীলা গ্রামের মানুষের জন্য মাঝেমাঝে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতে আসেন। কিন্তু কোনও রোগী দেখার চিত্র সিনেমায় নেই। একমাত্র নায়ক আবিরের চিকিৎসার জন্যই হাসপাতালে হাজির হতে হয় নীলার। প্রতাপশালী পরিবারের মেয়ে নীলা, সে ডাক্তারি পড়ছে। অথচ পুরো সিনেমায় নীলাকে অধিক সাজ-সজ্জায় দেখা যায়। কখনও কখনও চরিত্রের স্বাভাবিকতায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। যেমন, নীলাকে এক পর্যায়ে আমরা দেখি গ্রামের ছেলে-মেয়েদের নাচ শেখাচ্ছে। ওই সময়ে নীলার এত মেকাপ দেখে অনেকে অবাকও হয়েছেন!

অন্যদিকে পুরুষবাদীদের খুশি হয়েও লাভ নেই। আবির তার দুলাভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বোঝা গেল। দুলাভাই চরিত্রে অাছেন মিশা সওদাগর। তিনি পজিটিভ চরিত্রে এখানে অভিনয় করেছেন। এবং বলা যায় মিশা সফল। তার অভিনয়, চরিত্রকে অসাধারণভাবে তুলে ধরা, অার সংলাপ বলাতে তার পারদর্শিতা মুগ্ধ করার মতো।যাহোক, ছিলাম আবিরের প্রশ্নে। আবির দুলাভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে গিয়ে নিজের দক্ষতায় আমেরিকায় চাকরির অফার পায়। কিন্তু আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না আবির কোথায়, কিসের কাজ করে!

চলচ্চিত্রের এসব অনুসঙ্গ নিয়ে বহু আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। চলচ্চিত্র সম্পর্কে সমালোচকরা বলেছেন, এত বিস্তর বর্ণনা দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। যেটা উপন্যাসে সম্ভব, সেটা চলচ্চিত্রে সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়টির জন্যই ‘সিনেমায় সাহিত্য’ বিষয়টি যুক্ত হয়েছে বোধহয়। অর্থাৎ একটু সহজ করে বলা যেতে পারে। পরিচালক প্রথমে নিশ্চয়ই চিত্রনাট্য লেখেন না, তিনি গল্প লেখেন। অর্থাৎ প্রথমে সাহিত্য রচনা হয়। এখন সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি হয় চিত্রনাট্যের মাধ্যমে। ওই সময় চলচ্চিত্রে রূপান্তরের সময় সাহিত্যের ভাব ও ভাষাগত ইমেজ চলচ্চিত্রের দৃশ্য ও শব্দগত ইমেজের রূপ পায়। সাহিত্যে ওই ইমেজের অবজেকটিভ বিচার, অার চলচ্চিত্রে ইমেজের সাবজেকটিভ বিচার। এখন সত্যিকার অর্থে অধিকাংশ সময় চলচ্চিত্রে এই অবজেকটিভ বিচার তুলে ধরা মুশকিল। তবে সাবজিকটিভ ঠিক থাকলে চলচ্চিত্রের ছন্দে খুব একটা পতন হয় না। শিহাব শাহীনের সফলতা এখানে। তার ছবিতে ছন্দপতন হয়নি। গল্পের সব চরিত্রের ধারাবর্ণনা না থাকলেও দর্শক ওইসব নিয়ে খুব একটা ভাববে না, কারণ ছবির অবজেকটিভ পরিচালক নির্ধারণ করে দর্শককে আটকে রেখেছেন। তার অবজেকটিভ হলো ‘আবির-নীলার প্রেমের পরিণতি’।

এখন এই প্রেম পরিণতিতে বাধা হয় অনেক কিছু। যেমন ড্যানি নামক এক এলাকার গুণ্ডার সঙ্গে নীলার বিয়ে ঠিক হয়। ড্যানি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইরেশ যাকের। ভিলেন চরিত্রে অভিনয়, তার গেটাপ বিশেষ করে হেয়ার স্টাইলেও চরিত্র ফুটে উঠেছে। দুনিয়ার সব মাস্তান তার প্রেমের সামনে বিব্রতবোধ করবে। ড্যানি বেশ কয়েকবার নীলার সামনে এসে বিব্রতবোধ করে। ওই ভঙ্গী ছিল দুর্দান্ত।

এখন এই গুণ্ডা ড্যানির সঙ্গে ডাক্তারি পড়ুয়া মেয়ের বিয়ে বাবা খান সাহেব কেন দিতে চান? বাংলাদেশের সব বাবাই খান সাহেবের মতো দাম্ভিক, রাগী, একরোখা। চিরচেনা বাবাদের মতোই অভিনয় করেছেন আলী রাজ। কিন্তু বোধগম্য হলো না এলাকার গুণ্ডার সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে তিনি কোন স্বার্থে দিতে চান? এই উত্তর আমাদের সবার অজানা।

পার্শ্ব চরিত্রগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা করার নেই। তবে একটি চরিত্র নিয়ে কথা বলতেই হয়। আবিরের বন্ধু পাভেল। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনন্দ খালেদ। বাংলা সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রগুলোতে পারদর্শিতা দেখানোর সুযোগ খুব কম থাকে। যেমন, নীলার একজন বান্ধবীও ছবিতে ছিল কিন্তু তার সুযোগ নেই বললেই চলে। পাভেলের সেই সুযোগ ছিল নিজের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার। আর আনন্দ খালেদ তা বৃথা যেতে দেননি। নিজের অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়ে বাংলা সিনেমায় নির্ঘাত ভালো জায়গা করে ফেলবেন। তার চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিচালকও মাথা খাটিয়েছেন। তাই ছবিতে পাভেলকে রেখেছেন। কমেডি তৈরি করেছেন এই চরিত্রের মাধ্যমেই। আর শেষের দিকে তো পাভেলই হয়ে উঠেছে কেন্দ্রবিন্দু। তার মাংকি স্টাইল টাইগার পাঞ্চে উদ্বুদ্ধ হয়ে নায়ক যখন ড্যানিকে সলিড পাঞ্চ মারেন, তখন সিনেমা হল তালি এবং চিৎকারে ফেটে পড়ে।

মূল দুটি চরিত্র নিয়েই আলোচনা হলো না। শুভ এবং মম’র কথা শুরুতেই বলেছি- দুজনই অভিজ্ঞ। সিনেমার অনেক অসঙ্গতি অভিনয়ের পরদর্শিতা দিয়ে হটিয়ে দেওয়া যায়। শুভ এবং মম তাদের দক্ষতা দেখিয়েছেন। দুজনই রোমান্টিক দৃশ্যগুলোকে আরও রোমান্টিক করে তুলে ধরতে পেরেছেন।

তবে ছবির গানগুলোতে কিছুটা বলিউডের ছায়া দেখা যায়। তবুও দুজনকে এত সুন্দর লেগেছে গানগুলোতে যে মনে হয় বাংলা সিনেমায় এমন প্রেম অনেকদিন দেখা হয়নি। তাদের একটি দৃশ্য দর্শক মনে রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। যখন আবির প্রতিশোধ নেয়। এই প্রতিশোধের গল্প দর্শক হলে গিয়েই দেখুক।

শুরুতেই বলেছিলাম, শিহাব শাহীনের সিনেপ্লেক্সে দাঁড়িয়ে থাকার কথা। প্রতিদিন তিনি হলে যান কিনা- জানি না। তার পরিচালিত ছবিটি হিট নাকি ফ্লপ এমন চিন্তা থেকেই হয়তো তিনি হলে যাচ্ছেন, দর্শকদের বোঝার চেষ্টা করছেন।

তবে নিশ্চিত বলে দেওয়া যায়- দর্শকভরা সিনেমা হল, কিছুক্ষণ পরপর হাতে তালি, কমেডি দৃশ্যে দর্শকদের উচ্চস্বরে হাসি প্রমাণ করে ছবি তো হিট। অার বাকি মূল্যায়নটা নিয়ে সময়ই কথা বলবে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: