সর্বশেষ আপডেট : ৫৩ মিনিট ৬ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বৈশাখ আসে, আমরা কেন ক্ষণিকের বাঙালি হই!

88_61946মীর আব্দুল আলীম

আমি বাঙালি, এটা ভেতরে লালন করতে হবে। নিজেদের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি জোগাতে হবে। গুরুসদয় দত্ত তার গানে বলেছিলেন ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ।’ অর্থাৎ সাহস জোগাতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের ভেতরে। কেবল বৈশাখে নয়, বাঙালি হয়ে যেতে হবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা কি বৈশাখের বাঙালি? বৈশাখ এলেই একতারা হাতে ছুটে চলতে চাই কাঙালিনী সুফিয়ার মতো। ঢোল, তবলা, সারিন্দা নিয়ে গেয়ে উঠতে চাই হাছন আর লালনগীতি। গাইতে চাই আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে’। কিন্তু বৈশাখ চলে গেলে আমরা সেই জৈষ্ঠ্যের খর রোদ্দুরে মলিন হয়ে যাই। হতাশ হয়ে যাই কালবৈশাখীর মতো জীবনের কিছু ঝড়ের কবলে পড়ে। সব যেন শেষ হয়ে যায়। ধুয়ে-মুছে যায় বাঙালিয়ানা। বাসায় মায়েরা সন্তানদের নিয়ে ভিনদেশি চ্যানেলে দেখছে বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী হিন্দি সিরিয়াল কিংবা ‘আউ আউ আউ’ মার্কা গান। এত গেল বাসার খবর। আমাদের নীতিনির্ধারকরাও এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তারা ভিনদেশি অপসংস্কৃতিকে ভাড়ায় আনছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আনা হয় ভারতীয় শিল্পীদের। আর আনবেই না কেন? বাঙালি তো আর বসে নেই। লাখো দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাঠে। সরাসরি টিভি চ্যানেলেও ওই অনুষ্ঠান সমপ্রচার করা হয়। অথচ আমাদের সরকার শত চেষ্টায়ও পার্শ্ববর্তী ভারতে আমাদের টিভি চ্যানেল সমপ্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। ওরা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির শেয়ার নেবে না আর ওদেরটা আমাদের দিয়ে দেবে, তা কী করে হয়। ওদের নাটক-সিনেমার প্রভাব কিন্তু আমাদের সমাজে পড়তে শুরু করেছে। সংসারে অশান্তি, কুটিলতা, হত্যা বেড়ে গেছে। কী দেখছি আমরা এসব অনুষ্ঠানে?

বছর ঘুরে বৈশাখ আসে, আর আমরা ক্ষণিকের বাঙালি হয়ে যাই! বাঙালি হতে দিগি্বদিক ছুটি। পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরে তো হাঁটার জায়গাও থাকে না। বাঙালি হতে অনেকেই ঘর থেকে ছোটেন পহেলা বৈশাখের এই দিনে। আমি একদিনের বাঙালি হতে চাই না। বৈশাখের ওই বিশেষ দিনটাতে সকালে পান্তা, শুঁটকি ভর্তা, ইলিশ খাই না। শহরে থাকলেও শরীর থেকে গাঁয়ের (গ্রামের) গন্ধ মুছে যায়নি এখনও; মন থেকে মুছে ফেলিনি বাঙালিয়ানা। ঘণ্টা, মাস, বছর ধরেই নিজেকে বাঙালি ভাবি। পূর্বপুরুষ তো যথার্থই বাঙালি ছিল। চিন্তা উত্তর প্রজন্ম নিয়ে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব আর বিদেশি মিডিয়ার সর্বগ্রাসী দৌরাত্ম্যে দিন যত গড়াচ্ছে, ভাবি ছেলেগুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশি দাপটে ওদের বাঙালি রাখাই তো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও বাঙালিয়ানা নেই। পাশ্চাত্য ঢঙ সবখানে। পোশাকে, খাবারে, চলাফেরা সবখানেই ভিনদেশি ভাব। কী সাহিত্যে, কী চলচ্চিত্রে সব জায়গায়ই বাঙালি হটাও মনোভাব। শতাধিক টিভি চ্যানেলে নাচ-গান আর পরকীয়া মার্কা নাটক-সিনেমায় আমাদের বাঙালি থাকাই দায়। লাভইন সিঙ্গাপুর মার্কা চলচ্চিত্র, আমাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান সবকিছুতেই কেমন যেন সাহেবি মেজাজ। এগুলো দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম বাঙালি থাকে কী করে?

ডিসেম্বরের থার্টিফার্স্ট নাইট নিয়ে কিছু না বললে লেখা অপরিপূর্ণ থেকে যায়। সেদিন কে দেশি? কে বিদেশি? বোঝা বড় দায়! ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে’ তাই মনে পড়ে যায়। এই হচ্ছে থার্টিফার্স্ট নাইট সমাচার। খুবই ঘৃণার সঙ্গে বলতে হয়, আজ আমাদের সংস্কৃতিতে চলছে বিদেশি খবরদারি। হাল জমানার যুবকরা হাছন রাজাকে গাইছে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। কলুষিত করছে লালন সাঁইর সাধকীয় ভাবশৈলীকে। সবকিছুতেই বিদেশি ঢঙ। বিদেশি রঙ। যে রঙের ধাঁধায় পড়ে আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রঙের মাঝে মরিচা ধরেছে। একশ্রেণীর কিশোর-কিশোরী যখন গিটার আর ড্রাম ছাড়া বাংলা গান কী, এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে না, সেও যখন হাতে একতারা বা গলায় ঢোল বেঁধে নেয়, তখন বুঝতে হবে আকাশে ঝড়, মেঘ জমেছে। বৈশাখ মানেই বাঙালির আটপৌরে জীবনে লালের দাপট, ঝড়ের সঙ্কেত আর নতুনের আবাহনে স্টাইলিশ লাইফ। যেটা শুধুই ক্ষণিকের। যখন লিখেছি, যখন আপনারা লেখাটি পড়ছেন তখন হয়তো আমাদের কন্যা-জায়া-জননীরা টিভিতে দেখছেন ‘সাস ভি কাভি বহু থি’ অথবা ওই টাইপের কিছু। আমরা মাইন্ড করিনি, কষ্ট পাই না। কষ্ট পেলেই কষ্ট হবে মনে। যা রোধ করার নয়, কষ্ট পেয়ে লাভ কী তাতে?

আমাদের দেশে হিন্দি সিরিয়ালের ক্রেজকে একটা মহামারীর সঙ্গে তুলনা করাটা বোধহয় ভুল হবে না। আমি অনেক পরিবারে বাবা-মার সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের গভীর মনোযোগের সঙ্গে হিন্দি সিরিয়াল উপভোগ করতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে তারা অকপটে পারিবারিকভাবে গিলে খাচ্ছেন একের পর এক অসামাজিক কাহিনী। যেমন মাল্টি-ডাইমেনশনাল পরকীয়া, বউ-শাশুড়ির ষড়যন্ত্র, মামার সঙ্গে ভাগি্নর সম্পর্ক, ডিভোর্সের প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মতো জঘন্য কিছু বিষয়। এর অবশ্য একটা ভালো (?) দিক আছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বলে যাচ্ছে অনর্গল। তাদের অভিভাবকরাও নিজের সন্তানের মুখ দিয়ে হিন্দি বুলি বের করে বেশ গর্ববোধ করেন। বাংলাদেশে আজকের সামাজিক অবক্ষয় আর পারিবারিক ও সামাজিক সুস্থ নিয়মনীতি ভেঙে পড়ার পেছনে হিন্দি সিরিয়ালের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়! আর এ প্রশংসার দাবিদার তারা, যারা আমাদের এ জাতীয় অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এজন্য তারা ধন্যবাদ পায় বৈকি!
বাঙ্গালির ভাষা প্রয়োগেও কোথায় যেন এক ধরনের অবহেলা; কোথায় যেন এক ধরনের হীনমন্যতা। কেন এমন হয়? এ সব প্রশ্নের যেন কোনো জবাব নেই। গুলশানের একটি রেস্তোরায় স্বপরিবারে দুপুরের খাবারে জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অমনি গান বেজে উঠল, ‘জানেমন, জানেমন’। চমকে উঠলাম। দেশে কি বাংলা অভিধান ছাপা বন্ধ হয়ে গেছে? নাকি সময় এল অভিধানে নতুন নতুন কথার মানে লেখার? এবার কি ইংরেজির মত বাংলাও মেলবে মুক্তির ডানা? শক্ত বানান, যুক্তাক্ষর ভুলে সব হবে সোজা, সরল, সাদা? নবাবি আমলে বাংলা ভাষার অনেক ভাঙা গড়া হয়েছিল। ঢুকে পড়েছিল ‘কুর্শি’, ‘দরজা’, ‘পেয়ালা’, ‘শরবত’ ইত্যাদি অনেক আরবি, ফার্সি শব্দ। এবার কি বেনো জলের মত ঢুকে পড়বে হিন্দি, ইংরেজির, ‘জানেমন’, ‘চিপকলি’, ‘মজাক’, ‘নউটাঙ্কি’, ‘ড্রামাবাজি’র মত শব্দ? স্বদেশে, পরদেশে, প্রবাসে বাঙালিদের মুহূর্তে বদলে যাওয়া মতিগতির সঙ্গে, পলে-পলে পালটে ফেলা টিভি চ্যানেলের এর মত ‘মেড ইজি’ করতে কি বাংলা ভাষা এবার দোর খুলে দেবে অভিধানের? হবে নাকি, নতুন ভাষার নতুন কথার, নতুন নতুন মানে? ভবে ভোলা বাঙালি কি বাংলা ভাষাকে নব কলবরে ফিরিয়ে আনবে জগৎ সভায়? কোনও দিন কি আমার মত ‘তালিবান মনস্ক’ যারা, তারা খুঁজে পাব সেই ‘সব পেয়েছির’ দেশ, যেখানে বাঙালি ইংরেজি হরফে রবীন্দ্রকাব্য না পাঠ করে জন্ম দেবে আরেক নতুন রবির! সংস্কৃতের অপভ্রংশ মাগধী-প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয় ১০০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দে।

জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই এই বাংলাভাষা এতটাই উন্নত এবং সমৃদ্ধ যে সাংষ্কৃতিক বৈষম্যের উর্ধে গিয়ে একটি বিস্তির্ণ অঞ্চলের অগণিত মানুষকে এক সূত্রে বাঁধতে পেরেছিল। গড়ে তুলেছিল বাংলা সংষ্কৃতি ও জাতি। কিন্তু’ মাতৃদুগ্ধসম এমনই এক ভাষাকে যখন বর্জন করার আদেশ এলো তখন সন্তানদের বুকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বেজে উঠেছিল বিদ্রোহের দামামা যার আগুন জ্বলেছিলো ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে। কিন্তু মায়ের সে ভাষাও এখন কালো মেঘে ছায়াচ্ছন্ন। ২১শে ফেব্রুয়ারি কিংবা পহেলা বৈশাখেও আমরা যে বাঙালি তা ভুলে গিয়ে ভিনদেশী ভাষা কথা বলতে চাই; গাইতে চাই মুম্বাইছ আইয়া মেরা দোস্ত, দোস্তরে সালাম কর..।’ নিজ পরিবারের কথায় আসি, মুড়িমুড়কি, কড়িমুড়ালি, নিমকি কিংবা গুঁড়ের জিলাপি আমার খুব প্রিয় খাবার। ঘরে কখনো এসব খাবার এনেছিতো আমার ছোট ছেলেটা ভেংচি কাঁটে। ওদের এগুলো মোটেও পছন্দ নয়। বড় ছেলেটাতো বলেই ফেলে বাবা এগুলো ব্যাকডেটেড খাবার। রাগ করিনা। ভাবি ওদের কি দোষ? আমরাইতো ওদের সাহেব বানিয়ে ফেলেছি। ওরা বলে পান্তায় নাকি লাখ লাখ ব্যাক্টেরিয়া জন্মে। আমার দাদাতো এগুলো খেয়েই ১ শত ২২ বছর পার করেছেন। মৃত্যুর আগে কোন রোগবালাই দেখিনি। হাসপাতালে যাননি কখনও। জীবনের শেষ দিনের সকালেও বিনে চশমায় পত্রিকা পড়েছেন। তিনি পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। অর্থকড়ি কমতি ছিলনা। তবুও তার খাবার তালিকায় ছিল কেবলই বাঙালি খাবার। বিচিকলা, বাঙি, খিরাই, মিষ্টি আলু, ডাল ভাত ছিলো প্রিয় খাবার। আমার গিন্নী মাঝে মধ্যে মোড়গ পালাও কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানী পাকালে বলতেন “ওসব ছাইপাশ দিওনা ভাত দাও।” ভাতের মতই সোজাসাপটা কথা দাদার। বাবার মাঝেও ভাব দেখিনি কখনও। বাঙালি মেজাজেই চলেন এখনও। খাবারদাবারেও এখনও তিনি ষোল আনা বাঙালি। দিন যত গড়াচ্ছে, ভাবি ছেলে গুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশী দাপটে ওদের বাঙালি রাখাইতো কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে বাহিরে কোথাও বাঙালিআনা নেই। প্রাশ্চত্ব ঢং সবখানে। পোশাকে, খাবারে, চলা ফেরা সব খানেই ভিনদেশী ভাব। কি সাহিত্যে, কি চলচিত্রে সব জায়গায়ই বাঙালি হটাও মনভাব। শতাধিক টিভি চ্যানেলে নাচ গান আর পরকিয়া মার্কা নাটক সিনেমায় আমাদের বাঙালি থাকাই দায়। লাভইন সিংগাপুর মার্কা চলচ্চিত্র আমাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান সব কিছুতেই কেমন জেন সাহেবী মেজাজ। এগুলো দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম বাঙালি থাকে কি করে?
আমাদের সাবধান হতে হবে। বাঙালি মনকে আরও শাণিত করতে হবে, মনের ভেতরকার জং মুছে ফেলতে হবে; আরও গভীর থেকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে। আমি বাঙালি, এটা ভেতরে লালন করতে হবে। নিজেদের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি জোগাতে হবে। গুরুসদয় দত্ত তার গানে বলেছিলেন ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ।’ অর্থাৎ সাহস জোগাতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের ভেতরে। কেবল বৈশাখে নয়, বাঙালি হয়ে যেতে হবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। যেন স্মৃতি হাতড়ে না বলতে হয়, ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে…। একদিন বাঙালি ছিলাম রে…।’

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: