সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব

eryheসিরাজ উদ্দিন আহমদ সোহাগ::
“এসো হে বৈশাখ এসো এসো” বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে আহবান করেছেন মানুষের দুঃখ-শোক, হতাশ-নিরাশা, জরা-মৃত্যু, ক্ষুধা-তৃষ্ণার তাড়া নিয়া শক্তিরূপে, জীবনের সবটুকু গ্লানি মুছে দিতে। পাশাপাশি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রলয়োল্লাস কবিতায় বৈশাখকে আবাহন করেছেন, নিজেকে সমর্পিত করতে চেয়েছেন “তোরা সব জয়ধ্বনি কর ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখের ঝড়।” লোক গবেষকদের মতে – স¤্রাট আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজি উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সন প্রবর্তনের পর হয়তো কৃষি ও ঋতুর সঙ্গে যুক্ত অনেক অনুষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। রাজস্ব আদায়ে ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসা বানিজ্যে বাংলা সাল বেশি ব্যবহার করা হতো এবং এভাবে আবর্তিত হয়ে পহেলা বৈশাখ রূপান্তরিত হয়েছে নববর্ষে প্রথম দিনে।
বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঐতিহ্য ও সর্বজনীন উৎসব বলতে বাংলা নবর্ষকেই বুঝায়। বৈশাখের শিকড় বাঙালির মূলধারায় প্রোথিত এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য বাংলা নববর্ষের উৎসব আজ জাতীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে। বৈশাখী উৎসবের স্ফূরণ তৃণমূল থেকে শহর এবং হালে ভৌগলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন। পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব ও বৈশাখী মেলা – যে নামে ডাকি বা দেখি না কেন বাঙালির এই উৎসব সার্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক, ঐতিহ্যময় এবং বিশ্বজনীন।

আবহমান বাঙ্গালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে চারু কারু কুটির নঁকশি ও তাঁত শিল্প প্রদর্শন, নবান্নের পিঠা, খই, পুঁথি, জারি-সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, পালাগান, আউল-বাউলের একতারা-দু’তারায় বাঙালির প্রাণের উচ্ছাসে বর্ষবরণ উৎসব বা বৈশাখী মেলা হয় জম জমাট। সংগঠক, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বাঙালী জনগোষ্ঠির সবাই নিজস্ব স্বকীয়তায় উৎসবের আড্ডায় বৈশাখী মেলার শুদ্ধতায় ভালবাসার ভাল কাজে এক হবার প্রেরণা পায়।
পহেলা বৈশাখ আমাদের বলে সংলগ্ন হতে, ঐক্যবদ্ধ হতে এবং প্রোথিত থাকতে সংস্কৃতির ভূমিতে। পহেলা বৈশাখে মেলা হয় কিন্তু তাতে বানিজ্য প্রধান হয়ে উঠে না। প্রাধান্য থাকে মিলনের ও আনন্দের” বাঙ্গালীর হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঐতিহ্য আমাদের প্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করছে সময়ে সময়ে। ভোগবাদী, পূঁজিবাদী বা সা¤্রাজ্যবাদের জ্বরে আমরাও আক্রান্ত। কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে যখন ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক এসেছে বা দাবি সামনে উঠে এসেছে – আমরা এক হয়েছি। বাংলার লোকায়ত সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও উৎসব আমাদের প্রেরণার উৎস ছিল। অনেক ক্ষেত্রে আমরা হেরেছি কিন্তু এই হারাটাই শেষ হয়নি। হারতে হারতে আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি।

লোক শিল্পের চমৎকার সমাবেশ ঘটিয়ে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে বর্ষবরণ উৎসব বা বৈশাখী মেলা আসে বলেই হয়তো প্রতিটি বাঙ্গালীর কাছে এর আবেদন সীমাহীন। পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণের দিন হিসেবে দেশে-বিদেশে বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিনত হয়। আজকের দিনে বৈশাখী মেলা বাংলার গ্রামীণ জনপদ ও বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন মেলায় রূপ নিয়েছে। নিউইয়র্ক, বার্লিন, ব্রাসেলস, প্যারিস সহ আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলা গুলো তারই প্রমাণ রাখছে। আশার দিক হচ্ছে, পৃথিবীর দেশে দেশে বাঙ্গালী অভিবাসীদের উদ্যোগে বর্ষবরণ উৎসব বা বৈশাখী মেলার ব্যাপ্তি ঘটছে খুবই দ্রুত। বাংলা নববর্ষের উৎসব এখন আর শুধু ঢাকা, কলকাতা, আগরতলা ও গৌহাটির বাঙ্গালীর উৎসব নয়, বাংলা বর্ষবরণ উৎসব আজ সমগ্র বিশ্ব বাঙ্গালীর উৎসবে পরিনত হয়েছে। “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন একাকী। কিন্তু উৎসবের দিন মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, যেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ।” বিশ্ব কবির এই উক্তিটি বর্ষবরণ উৎসবে গেলে বা বৈশাখী মেলা দেখলে খুব সহজেই অনুভব করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব হয় এবং বৈশাখের প্রতি শনি-রবিবারে মেলা হয়। এ যেন বাংলাদেশের অবিভাজিত শিকড় ভূমি। বাঙ্গালীর বাহারী পোশাকে রঙে ডঙে বাঙ্গালীপনায় মেতে উঠে অভিবাসী বাঙ্গালীরা এবং দল বেঁধে আসেন পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসবে। ‘জগতের আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’-রবীন্দ্রনাথ উৎসবে নিজেকে এভাবে প্রকাশ করেছেন। বহু সংস্কৃতির মানুষের উপস্থিতি কবি গুরুর কথার প্রাণবন্ত প্রতিধ্বনি বাজে। অবাঙ্গালী অনেককে বাঙ্গালী সাজে সাজতে দেখা যায়, তাদের অনেকেই বাঙ্গালী খাবারে তৃপ্তি খুঁজে পায়। অবাঙ্গালী অনেকেই কারুশিল্প, কুটির শিল্প ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালী নিত্য ব্যবহার্য পণ্য দেখে বিমুগ্ধ হন, কিনেন এবং সংগ্রহে রাখেন পরমানন্দে। বাঙ্গালীর এই বিশ্বজনীন দূর্লভরূপ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে খটকা লাগে। বহু সংস্কৃতির এই দেশে বাঙ্গালীরা তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আসন পাকাপোক্ত করতে পেরেছে আপন যোগ্যতায়। বর্ষবরণ উৎসবে বা বৈশাখী মেলায় অবাঙ্গালীদের বিমুগ্ধতা, সপ্রতিভ উচ্ছাস মূলতঃ আমাদের আরও উঁচুতে তোলে।
বর্ষবরণ উৎসব ও বৈশাখী মেলা শুদ্ধতায় ভালবাসায়, ভালকাজে সাহস যোগায়। নববর্ষের কল্যাণময় শক্তিকে জানাই সুস্বাগতম এবং সকলের প্রতি থাকলো নববর্ষের শুভেচ্ছা, শুভ নববর্ষ।
লেখক – সিরাজ উদ্দিন আহমদ সোহাগ, প্রাক্তন সহ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্ক ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, কুলাউড়া বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব ইউএসএ ইন্ক।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: