সর্বশেষ আপডেট : ৭ মিনিট ৬ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বৈশাখের পরশে সব কালিমা দূর হোক, সম্প্রীতি দৃঢ় হোক

syedafsar_1271196459_1-26818_1435830058522_1316092002_1203306_3042821_nড. সরদার এম. আনিছুর রহমান::
শুভ নববর্ষ। বাংলা ১৪২২ সনকে সানন্দে বরণ করতে অধীর অপেক্ষায় বাংলা ভাষাভাষী তথা সমগ্র বাঙালি জাতি। এক্ষেত্রে যার যে সামর্থ আছে, তা নিয়েই চলছে এই পহেলা বৈশাখ জাতীয় উৎসব পালনের প্রস্তুতি। যেমনটি দেশের অভ্যন্তরে তেমনি প্রবাসেও চলছে বর্ষবরণের ব্যাপক প্রস্তুতি। কেননা, এটা আমাদের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবকে সম্মিলিতভাবে পালন করি আমরা। এ উৎসব আমাদের জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে আসছে হাজার বছর ধরে ।ফলে নানা দিক থেকেই এই উৎসব গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।
বরাবরের ন্যায় এবারও পহেলা বৈশাখে গ্রাম-বাংলায় বসবে বৈশাখী মেলা। এতে শিশু কিশোর যুবক-যুবতী, আবাল বৃদ্ধ-বনিতার সার্বজনীন সমাবেশ ঘটবে। মেলাকে কেন্দ্র করে ঘটবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মহাবন্ধন। ফলে এই মেলা বা উৎসবে আমরা খুঁজে পাই সত্যিকারের জাতীর লুকায়িত আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবোধ।যা কোনোভাবেই ছোট করে দেখার উপায় নেই।

প্রসঙ্গত জাতি হিসেবে আমরা খুবই সৌভাগ্যবান জাতি। কেননা, হাতে গোনা কয়েকটি জাতি ছাড়া পৃথিবীতে বেশীর ভাগ জাতি বা গোষ্ঠীরই আব্দ বা বৎসর গননার জন্য নিজস্ব সন নেই।কিন্তু আমাদের তা আছে।
যতদূর জানা যায় তাতে, আমাদের মতো ঘটা করে না হলেও আরো বেশ কিছু জাতি রয়েছে যারা বর্ষবরণ উৎসব পালন করে থাকেন। যেমন- বর্তমান গণনায় শুভমন্তু শকাব্দ- ১৯৩৬, বঙ্গাব্দ- ১৪২২, খ্রীষ্টাব্দ- ২০১৫, সংবৎ- ২০৭২, হিজরী- ১৪৩৬, আমলী- ১৪২২, মগী- ১৩৭৭, বগড়ী- ১৪২২, ত্রীপুরাব্দ- ১৪২৪, শ্রীচৈতন্যাব্দ- ৫৩০, শ্রীশংকরাব্দ- ৫৬৬, বুদ্ধাব্দ- ২৫৫৮, নানকাব্দ- ৫৪৬ ও ভারতীয় শকাব্দ- ১৯৩৭। এসকল জাতি বর্ষবরণ উৎসব পালন করে থাকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এবং তাদের জাতীয় সংস্কৃতি তুলে ধরে এ উৎসবের মধ্য দিয়েই।

অবশ্য প্রত্যেকটি সন গননা শুরুর পেছনে রয়েছে কিছু না কিছু তাৎপর্য। কিন্তু বঙ্গাব্দ সন প্রবর্তনের পেছনে রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। এই বাংলা সনের প্রবক্তা সম্রাট আকবর ইতিহাসবিদদের মতান্তরে নবাব মুর্শীদ কুলী খাঁ। আর তিনি যেই হোন না কেন, নতুন করে বাংলা সন প্রবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল কৃষকের খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে।
কারণ এর আগে হিজরী সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। এই সন চন্দ্র বছর হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক বর্ষের সঙ্গে হয় ঘূর্ণায়মান, ফলে কৃষকের খাজনা দিতে খুব ঝামেলা হতো। সেজন্য প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে বাংলা সনের প্রবর্তন করার সাথে সাথে সনকে আবার ছয় ঋতুতেও ভাগ করা হয়।ঋতুগুলো আবার ফুলে-ফলে নানা বৈচিত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।এছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে ঋতুর মিল থাকার ফলে অনেকে বাংলা সনকে প্রাকৃতিক বর্ষ বলেও অবহিত করে থাকেন। শুধু তাই নয়, বাংলা মাসের নামকরণ হয়েছে বারটি নক্ষত্রের নামানুসারে।

ফলে জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। কেননা, আমাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিশাল সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।সেই সাথে রয়েছে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড, ঊর্বর সোনার মাটি, যেখানে ফসল বুনলেই সোনা ফলে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো- আমাদের এতো কিছু থাকার পরও আমরা সামনে এগুতে পারছি না। সর্বদা হানাহানি-বিভেদ ও রক্তপাত লেগেই আছে আমাদের মাঝে। আমরা পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা বর্ষবরণের এই চেতনাকে বুকে ধারণ করে ভেদাভেদ ভুলতে পারছি না। কয়েক বছর থেকে আমরা কী দেখছি- সর্বত্রই বিভেদের আগুন। সেই আগুনে পুড়ছে গোটা জাতি। ক্ষমতার স্বাদে চলছে শক্তি প্রয়োগের অসৎ প্রতিযোগিতা। এতে আজ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপন্ন।

এছাড়াও বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করেও এই চেতনায় আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না। সংকীর্ণ মানসিকতায় আবদ্ধ হয়ে আমরা মন্তব্য করছি- বাংলা বর্ষবরণ উৎসব আমাদের (মুসলমানদের) উৎসব না, এ উৎসব বিধর্মী তথা হিন্দুদের উৎসব, এ উৎসবে মুসলমানদের একাত্ম হওয়া ঠিক নয় ইত্যাদি।

সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, যারা এ ধরনের মন্তব্য করছেন, তারা কোন তথ্যের ভিত্তিতে এধরনের ফতোয়া দিচ্ছেন, কোন যুক্তিতে এমনটি বলছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। কেননা, এই বাংলা সন প্রবর্তিত হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে কৃষকদের খাজনা আদায় সহজ করার প্রয়োজনে, ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সময়ে হিসাব-নিকাশ এবং দেনা-পাওনা পরিশোধের প্রয়োজনে। যার ধারাবাহিকতায় আজও পহেলা বৈশাখে পুরানো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন হালখাতা করেন গ্রাম বাংলার মানুষ। ফলে কী করে এটা শুধু হিন্দুদের উৎসব হতে পারে, সন চালুর প্রাথমিক পর্যায় থেকেও তো সবাই এই উৎসব করে আসছেন। এছাড়া বাংলা সনের প্রবর্তক তো সম্রাট আকবর বা নবাব মুরশীদ কুলী খাঁ। আমার জানা মতে তারা দুজনই মুসলমান ও মুসলিম শাসক ছিলেন, তাহলে কেন এ উৎসব নিয়ে অযথা বিতর্ক!
আমার মতে, আজ যারা এ ধরনের ভিত্তিহীন ফতোয়া তুলে ধরছেন তাদের ভাববার সময় এসেছে। কেননা, অপব্যাখ্যা দিয়ে এধরনের জাতীয় উৎসবে বিভেদ তৈরির কোনো মানে হয় না।

তবে আমি বলবো, বর্ষবরণের নামে কোনো ধরনের অশ্লীলতা কোনোভাবেই কারো কাম্য নয়।এদিক বিবেচনায় যদি কেউ সমালোচনা করেন, তবে সেটা যুক্তিযুক্ত বলেই মেনে নিব। কেননা, এই বর্ষবরণের নামে এক শ্রেণীর মানুষ অশ্লীলতায় নিজেদের গা ভাসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলাম তো নয়, বরং আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিও বরদাশত করে না। এটা অপরাধের মধ্যেই পড়ে। সমাজে অন্যায়-অশ্লীলতা হলে তার সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। তাই বলে বাংলা বর্ষবরণ আমাদের সংস্কৃতি নয়, এ ধরনের ফতোয়া কাম্য নয়।

আমি মনে করি, একটু মুক্ত মনে কুসংস্কারের গণ্ডি ভেদ করে সুস্থ্য মানসিকতায় চিন্তা করলে সহজেই আবদ্ধ গন্ডি থেকে সবার মুক্তি লাভ করা সম্ভব।এতে জাতীয় চেতনাবোধ আরো দৃঢ় হবে।

সবশেষে বলবো- বাংলা ১৪২২ নববর্ষের শুভ আগমনে আমাদের সমাজ থেকে সমস্ত বিদ্বেষ-কালিমা গ্লানী মলিনতামুক্ত হয়ে প্রেমময় সম্প্রীতির জোয়ারে উদ্ভাসিত হোক গোটা জাতি। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে উঠুক। দেশ হোক শান্তিময়। আমরা কী পারি না, মনের সব কালিমা মুছে ফেলে দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে কাজ করতে। সবাই একটু আন্তরিক হলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাই আসুন, আমাদের জাতীয় উৎসব বাংলা শুভ নববর্ষকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সব হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও কালিমা ভুলে গিয়ে সকলে নতুন দীপ্ত শপথে দেশ গড়ি। সবাইকে জানাই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। বাংলা নববর্ষ সবার জন্য সুখের হোক। হোক শান্তিময়। নতুন দিন নতুন বছর সবার জন্য বয়ে আনুক অনাবিল সুখ আর আনন্দ। শুভ নববর্ষ-১৪২২।

লেখকঃ শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক। ই-মেইল:sarderanis@gmail.com

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: