সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বর্ষবরণের ঐতিহ্যে সিলেট

daily sylhetআহমেদ নূর::

সিলেটে বর্ষবরণের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। প্রতিবছরই প্রাণের উচ্ছাসে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক আয়োজন করে থাকে। বর্ষবরণের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রায় তিনদশক ধরে সাংগঠনিকভাবে সিলেটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখি মেলা। গত কয়েক বছর থেকে সর্বজনীন এই উৎসবের ব্যাপকতা দিনদিন বাড়ছে। তবে বৈশাখি মেলা না হলেও সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সিলেটে নববর্ষ উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে নানা আয়োজন চলে আসছিল। আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতা, ঘরে ঘরে নববর্ষ পালনের রীতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায়।

শুরুর কথা : সিলেটে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ পালন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে যতটুকু জানা যায়, পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন সিলেটে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে। সে সময় বর্ষবরণের সাথে সংশি¬ষ্টদের তথ্যমতে, নববর্ষের রঙিণ ব্যাজ তৈরি করে সেগুলো বিক্রি, আলোচনা সভা ও গানের মধ্যেই আয়োজন সীমাবদ্ধ থাকত। নগরের মীরাবাজার এলাকায় অধ্যক্ষ গিরিন্দ্র দত্তের বাসার সামনের মাঠে নববর্ষ পালনের এই আয়োজন করা হতো। খোলা মাঠে শতরঞ্জি বিছিয়ে চলত আলোচনা সভা ও গানের আসর। সাথে থাকত মিষ্টি ও পিঠা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে উদীচী নববর্ষের প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু করে। শহরের বিভিন্ন স্থানে এই অনুষ্ঠান হতো। পচাত্তরে উদীচীর অফিস সরকার বন্ধ করে দিলে দু বছর কোন অনুষ্ঠান হয়নি। পরে ১৯৭৭ সাল থেকে নয়াসড়ক এলাকায় উদীচীর অফিস চালু হলে অফিস প্রাঙ্গণে আবার নববর্ষ পালন শুরু হয়। আয়োজকরা নিজেদের বাড়ি থেকে মিষ্টি, পিঠা নিয়ে আসতেন এবং গানবাজনাসহ নানা আয়োজনে বছরের প্রথমদিন পালন করতেন। এসব অনুষ্ঠানে কবি বেলাল মোহাম্মদ ও ডা. অরবিন্দ বড়–য়ার মতো গুণীরা অংশ নিতেন।

বৈশাখি মেলা : বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে সিলেটে বৈশাখি মেলার আয়োজন শুরু হয় ১৩৯০ বাংলা (১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। শুধু তাই নয় ওই বছর থেকে সাংগঠনিকভাবেই নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। খেলাঘর ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে নগরের মীরাবাজারে মডেল হাই স্কুল প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দু বছর যৌথভাবে বৈশাখি মেলা করার পর পরবর্তীতে উদীচী এককভাবে মেলা আয়োজন করতে থাকে। তখন পর্যন্ত এটাই ছিল সিলেটের একমাত্র বৈশাখি মেলা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও পিঠা থেকে শুরু করে হরেকরকম পণ্যের স্টল থাকত মেলায়। এমনকি বইয়ের স্টলও থাকত। মডেল স্কুলে ১৪০১ বাংলা (১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত বৈশাখি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া একই সময়ে ১৩৯৩ বাংলা (১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ) থেকে সিলেটের চারটি নাট্য সংগঠন কথাকলি, সন্ধানী নাট্যচক্র, লিটল থিয়েটার এবং সুরমা থিয়েটার নগরের রিকাবীবাজার এলাকায় প্রান্তিক চত্বরে বৈশাখি মেলার আয়োজন শুরু করে। পরবর্তীতে নাট্য সংগঠনগুলোর অভিভাবক সংগঠন সম্মিলিত নাট্য পরিষদের ব্যানারে প্রতিবছর এই বৈশাখি মেলা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমিও এই মেলার সাথে যুক্ত হয়। এই মেলায় দেশিয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্টল, কুটির শিল্পের স্টল, কারুপণ্যের প্রদর্শনী, বানর নাচ, সাপের খেলা, চরকিসহ নানা আয়োজন থাকত। এখানে ১৪০৯ বাংলা (২০০২ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর একটানা বৈশাখি মেলা অনুষ্ঠিত হবার পর স্থানাভাবে প্রান্তিক চত্বরের বৈশাখি মেলা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বৈশাখি মেলা না হলেও বৈশাখ উদযাপনের নানা আয়োজন চলতে থাকে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে।

প্রায় তিন বছর সিলেটে কোন বৈশাখি মেলা না হওয়ায় ১৪১২ বাংলায় (২০০৫ খ্রিস্টাব্দ) সিলেট সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান আবার মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেন। ওই বছর থেকেই আবার নতুন করে বৈশাখি মেলা শুরু হয়। প্রথম দিকে সংস্কৃতিকর্মীদের সহযোগিতায় সিটি করপোরেশন মেলার আয়োজন করলেও পরে এককভাবে সিটি করপোরেশন মেলা করে আসছে। প্রতিবছর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কীন ব্রিজের কাছে সুরমা নদীর পাড়ে সপ্তাহব্যাপী বৈশাখি মেলা চলে। গত বছর এই মেলার এক দশক পূর্ণ হয়েছে। বর্ষবরণের এই কর্মসূচির মধ্যে বৈশাখি মেলা ছাড়াও আনন্দ শোভাযাত্রা, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাউল গান এবং পিঠা উৎসবও রয়েছে। এছাড়া সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্র“তি ২০০৯ খিস্টাব্দ থেকে ব¬ু-বার্ড স্কুলে বৈশাখি মেলা এবং বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন করে আসছে। বড় পরিসরে দিনব্যাপী এই মেলায় প্রভাতী সংগীত ছাড়াও দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে।

বর্ষবরণের নানা উদ্যোগ : ঢাকায় যেমন ছায়ানটের উদ্যোগে প্রভাতী সঙ্গীত দিয়ে বর্ষবরণের নানা আয়োজন শুরু হয় তেমনি সিলেটেও অনেকগুলো সংগঠন বর্ষবরণ উৎসব পালন করে। সংগীত সংগঠন আনন্দলোক ১৪০১ বাংলা থেকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে আসছে। প্রথম বছর সিলেট শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু হলেও পরের বছর থেকে নগরের মীরের ময়দানে সংস্কৃত কলেজে নিয়মিত অনুষ্ঠান করছে আনন্দলোক। বর্তমানে প্রত্যুষে বর্ষবরণের প্রভাতী আয়োজনে আনন্দলোকের অনুষ্ঠানটিই প্রধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়াও জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্য শিল্পী সংস্থা, উদীচী শিল্পী গোষ্টী, সাংস্কুতিক সংগঠন ‘সোপান,’ সম্মিলিত নাট্য পরিষদসহ বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলাদা আলাদাভাবে বর্ষবরণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রভাতী সংগীত, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাউল গান।
সিলেটে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সবচেয়ে বর্ধিত কলেবরে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে। ১৯৯৫ সালে ‘উচ্ছাস’ নামে একটি সংগঠন প্রথমবারের মত এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বর্ষবরণ শুরু করে। পরবর্তীতে কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতিবছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পহেলা বৈশাখে কলেজ ক্যাম্পাসে থাকে উপচে পড়া তারুণ্যের ভিড়।

সিলেটে বর্ষবরণের আয়োজনে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনও বর্নাঢ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের উদ্যোগে শোভাযাত্রা ছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিকড়, মাভৈঃ আবৃত্তি সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি, মিউজিক্যাল সংগঠন রিম, নোঙরসহ বিভিন্ন সংগঠন বর্ষবরণের নিজস্ব কর্মসূচি পালন করে আসছে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: