সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মৃত্যুদণ্ড ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা

unnamed (6)ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান::
গেল বছরের ৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় দেয়া হয়। অনেক বিতর্ক শেষে কামারুজ্জামানের রিভিউ পিটিশনের সুযোগের ভিত্তিতে রায় কার্যকরের বিষয়টি তখন স্থগিত হয়ে যায়। ৫ মাস পর শুনানি শেষে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রিভিউ পিটিশন খারিজ করে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এতে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া কামারুজ্জামানের আর কোনো পথ খোলা নেই। সে জন্যও আবার স্বল্প সময় পাবেন কামারুজ্জামান এমনটিই জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আব্দুল কাদের মোল্লার ন্যায় তিনিও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন না। ফলে ২-১ দিনের মধ্যেই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। ইতোমধ্যে রাষ্টপক্ষ থেকে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। কামারুজ্জামানের সাথে পরিবারের সদস্যদের দেখা করাও সম্পন্ন হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশন খারিজ করা রায়ে সোমবার পর্যন্ত স্বাক্ষর না করায় রায় কার্যকরে সরকারকে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর নিয়ে সর্বমহলে ব্যাপক ব্যাপক আলোচনা চলছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বিবিসি, সিএনএন ও আল জারিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে।ফলে আজকে এ বিষয়ে আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করছি।

এর আগে গেল ৩ নভেম্বরে সরকারপক্ষ থেকে কোর্টের রায় অনুসারে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিল। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিবৃতি দিয়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থগিতের আহবান জানিয়েছিল। এবার কিন্তু তেমনটি লক্ষ্য যাচ্ছে না।ফলে এবার রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে কোনো বাধা নেই বললেই চলে।

তবে কামারুজ্জামানের মৃতুদণ্ডের রায় কার্যকরের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী মঙ্গল ও বুধবার সারাদেশে হরতাল আহবান করেছে। সোমবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে দলটির নেতাকর্মিরা। এ ব্যাপারে অবশ্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যান্য শরিক দল বরাবরের ন্যায় এবারও অনেকটাই নীরব ভুমিকা পালন করে আসছে। আওয়ামী লীগসহ ১৪দল ও তাদের স্বপক্ষের লোকজন রায়টি দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের নেতারাও একই দাবি জানিয়েছে।

যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৩ সালের পর কোনো ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়নি৷ তবে কারাগারে এক হাজারেরও বেশি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রায় বিলোপ হবার পথে থাকলেও বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড এখনও প্রবল প্রতাপে বলবৎ আছে। বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় ১৫৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এক মামলায় এত বেশি সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।

মানবতা বিরোধী অপরাধ ছাড়াও বাংলাদেশে যেসব আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো—১. বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০, ২. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, ২০০০, ৩. এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ ও ৪. বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪।

বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড: বহুকাল আগে থেকেই চালু থাকলেও বিংশ শতাব্দীতে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে ক্রমেই বিভিন্ন দেশে জোরালো যুক্তিতর্ক উঠতে থাকে। বিশেষত মৃত্যুদণ্ড বিলোপের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী কিছু সংগঠন গড়ে ওঠে। যেমন- বৃটেনে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যাদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা।

কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও মতামত আসতে থাকে, বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সাধারণ যুক্তি দেওয়া হয়- এর ফলে অপরাধের সংখ্যা কমে যায়, এটা পুলিশ ও সরকারি উকিলের সহায়ক হয়। যেমন বলা যায়- মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করে বিনিময়ে জীবন রক্ষার ডিল করতে পারে, দণ্ডিত অপরাধী আর কোনো দিনই যে অপরাধের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে না সেটা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে, শিশু হত্যা, সিরিয়াল খুন এবং নির্যাতনমূলক হত্যার মতো নৃশংস অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই হচ্ছে ন্যায়সঙ্গত শাস্তি।

তবে মৃত্যুদণ্ড বিরোধীরা যুক্তি দেন যে, এসব যুক্তির বিপরীতে যারা হত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সবাই যে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড চান, তা নয়। যেমন ইনডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর হত্যাকারীকে সোনিয়া গান্ধী মাফ করে দিয়েছিলেন। সাধারণত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা ও বিত্তশালীরা বিভিন্নভাবে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়। কিন্তু সংখ্যালঘিষ্ঠ ও গরীবরা মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়। মৃত্যুদণ্ড সহিংসতার কালচারকে উৎসাহিত করে। ফলে দেশে সহিংসতা বেড়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড মানুষের মৌলিক অধিকার লংঘন করে।

মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার পেছনে আরো যুক্তির মধ্যে রয়েছে- ১। নানা স্তরে সাক্ষ্য, জিজ্ঞাসাবাদ, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পরই একজনকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থেকে যায় সে বিচারও কি ভুলত্রুটিমুক্ত? প্রশ্নাতীতভাবে এর উত্তর হবে, না। তাহলে নির্দোষ ব্যক্তির ফাঁসি হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে। তাহলে যার জীবন নেয়া হলো, তার জীবন কি ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব?

২। দোষী ব্যক্তি যেন আর অপরাধ করতে না পারে সেজন্য তাকে শাস্তি দেয়া হয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তার দণ্ডও হয়ে থাকে। কিন্তু দোষী ব্যক্তিকে যদি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, তাহলে সে তো আর অপরাধ করতে পারছে না। তাহলে কেন মৃত্যুদণ্ড?
৩। খুনের শাস্তি আরেকটি ‘খুন’ দিয়ে হতে পারে না। এটাকে কোনোভাবেই ন্যায়বিচার বলা যায় না। প্রতিশোধ বলা যেতে পারে।
৪। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ ধারায় জীবনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বর্তমানে বিশ্বে ৫৮টি দেশে মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত আছে। ৯৮টি রাষ্ট্র আইন করে এটি বন্ধ করেছে এবং ৩৫টি রাষ্ট্র আইন করে বন্ধ না করলেও দীর্ঘদিন সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। উদ্বেগজনক তথ্য হলো— সারা বিশ্বে যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তার ৯০ শতাংশই হয় এশিয়ায়। এমনকি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সুদান, ইরান এবং সৌদি আরবে ১৮ বছরের কম বয়সীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কী ভয়ঙ্কর! চীনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ২০১২ সালে এ সংখ্যা চার হাজারেরও অধিক। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে প্রায় সব দেশেই প্রকাশ্যেই ফাঁসি দেয়ার রীতি থাকলেও বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব এবং সোমালিয়া ছাড়া অন্য সব দেশে তা বন্ধ করা হয়েছে।

আমরা জানি, সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন তখনকার আদালত। অপরাধ— তিনি যুবসমাজকে ধ্বংস করছেন। তার বয়স ছিল তখন ৬৩ বছর। তিনি আরো দীর্ঘ জীবন পেলে পৃথিবী আরো কত কী পেত, সেটা ভাবাই যায় না। মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে এভাবে কত ক্ষতি হয়ে গেল পৃথিবীর, কে তার হিসাব রাখে? একবিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের অপরাধের জন্য আর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না সত্যি, কিন্তু অন্যান্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়ার হার এখনো অনেক বেশি। মূলত হত্যা, নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ধর্ষণ, মাদক পাচার এ ধরনের অপরাধের কারণেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে।

আমরা জানি, মানবসমাজের আদি যুগ থেকেই মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল। তুচ্ছ কিছু চুরি করার কারণেও ইংল্যান্ডের মতো দেশে বছরে শত শত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো। অষ্টম হেনরির সময় ৭২ হাজার চোরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। সেদিন আর নেই। মানুষ সভ্য হয়েছে বলে দাবি করে। সভ্য হওয়ার নমুনা হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত হচ্ছে একের পর এক। যেসব দেশে এখনো বন্ধ হয়নি, সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার জন্য আন্দোলন চলছে। বাংলাদেশে সেসব কিছুই দেখা যায় না। তার একটি কারণ হতে পারে, এখানে আইনের শাসন তেমন নেই এবং সব অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা যায় না। অপরাধী ব্যক্তি যদি প্রভাবশালী-বিত্তশালী হয়ে থাকে, তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া আরো কঠিন। সেখানে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করা খুব কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করণের বিরুদ্ধে কথা কোনো মানবাধিকার সংস্থা বা ব্যক্তি উদ্যোগে বলছে, তেমনটি তাই দেখাই যায় না। তাই বলে এ বাংলার মানুষ মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে, তা নয়। বাংলাদেশে যারা মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলন করবেন ভাবছেন, তাদের অনুপ্রেরণা হতে পারে ইংল্যান্ড। প্রায় দেড়শ বছর আন্দোলন করার পর শেষ পর্যন্ত ১৯৬৫ সালে Death Penalty (abolition) Act-এর মাধ্যমেই ব্রিটেন থেকে বিলোপ হয় মৃত্যুদণ্ড। ভেনিজুয়েলা প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করে ১৮৬৩ সালে। প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে পর্তুগাল বিলুপ্ত করে ১৮৬৭ সালে। কানাডা বিলুপ্ত করে ১৯৭৬ সালে, ফ্রান্স ১৯৮১ সালে, অস্ট্রেলিয়া ১৯৭৩ সালে।

অবশ্য বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০ টি মানবাধিকার সংস্থা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে লন্ডন ভিত্তিক এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্যতম। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যপী মৃত্যুদণ্ড রহিত করতে সব সময় সোচ্চার।বাংলাদেশে অব্যাহত মৃত্যুদণ্ডাদেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে সংস্থাটি। একই সাথে ফাঁসির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপের জোর আহ্বান জানিয়ে আসছে সংস্থাটি।

এ্যামনেস্টির দেয়া তথ্য মতে, “এখন পর্যন্ত ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে বা প্রথা হিসেবে বাতিল করেছে। যে মাত্র নয়টি দেশ ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ফাঁসি কার্যকর করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।”
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড এবং কার্যকর বিষয়ে এ্যামনেস্টি বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, শাস্তি হিসেবে বিশ্বে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার সংখ্যা বেড়েছে৷ ২০১৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২,৪৬৬ – যা আগের বছরের তুলনায় শতকরা হিসেবে ২৮ ভাগ বেশি৷ মিশর ও নাইজেরিয়ায় গণবিচারে কয়েকশ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় এই সংখ্যা বেড়েছে৷

তবে ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা কমেছে৷ ২০১৩ সালে বিশ্বের ২২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে৷ শতকরা হিসেবে এক বছরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিমাণ কমেছে ২২ ভাগ৷ ২০১৪ সালে ৬০৭টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে৷

অ্যামনেস্টি বলছে চীনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়৷ রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কারণে সেখানকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হিসাব পাওয়া যায়না৷ চীন এই হিসাব প্রকাশ করে না৷
আশার দিক হলো, মৃত্যুদণ্ড দেয়া দেশের সংখ্যা না বাড়া৷ ২০১৩ সালের মতো ২০১৪ সালেও ২২টি দেশেই শুধু মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়৷ ২০ বছর আগে সংস্থাটি যখন প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে তখন মোট ৪২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল৷

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে পাকিস্তানে৷ পেশোয়ারের স্কুলে তালেবান হামলায় ১৪১ জন নিহত হওয়ার পর গত ডিসেম্বরেই ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটি৷ বাংলাদেশে অন্তত একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যামনেস্টি ৷ তবে যুদ্ধাপরাধের কারণে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর৷

সম্প্রতি লন্ডনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যামনেস্টির ‘ডিরেক্টর অফ গ্লোবাল ইস্যুজ’ অড্রে গাউঘ্রান বলেন, ‘‘মৃত্যুদণ্ড কোনো সুবিচার নয়৷” মিশর এবং নাইজেরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অ্যামনেস্টি ভীষণ উদ্বিগ্ন৷ ২০১৪ সালে নাইজেরিয়ায় ৬৫৯ জন এবং মিশরে কমপক্ষে ৫০৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়৷ দু দেশেই বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক৷ ২০১৩ সালে ১৪১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নাইজেরীয় সরকার৷ মিশরে সে বছর একশ’র মতো লোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল৷

২০০৪-২০১৩ পর্যন্ত দশ বছরে মৃত্যুদণ্ডবিলোপকারী দেশের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৩-র শেষে বিশ্বের মোট ৯৮টি দেশ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইন তুলে দিয়েছে। ২০০৪-তে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ ছিল ৮৫টি দেশে। কিছু দেশে আইনত মৃত্যুদণ্ড চালু থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না। এই ধরনের দেশের সংখ্যা ৫২। অর্থাৎ মোট (৯৮+৫২) ১৪০টি দেশে এখন মৃত্যুদণ্ড, হয় আইনত নিষিদ্ধ অথবা নিষিদ্ধ না হলেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না। মোট ৫৮টি দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, যাদের অন্যতম বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের কাছাকাছি দেশগুলোর মধ্যে ভুটান, নেপাল ও মায়ানমার ও মরিশাস মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। শ্রীলংকা, মায়ানমার ও মালদ্বীপে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সেখানে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইনডিয়া, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে এবং কার্যকর করেছে। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৩টি সদস্য রাষ্ট্র মৃত্যুদন্ডমুক্ত ছিল।

উপরোল্লেখিত আলোচনা ও তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করার যে দাবি উঠেছে তা সরকারের বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। শুধু মানবতা বিরোধী অপরাধের আসামীদের সামনে রেখে নয়, সার্বিকভাবেই এটি বিবেচনার দাবি রাখে আমরা মনে করি।

সবশেষে বলবো, মানবাধিকার সমুন্নত রাখাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করতে গিয়ে যাতে আরেকটি মানবাধিকার লঙ্গনের ঘটনা না ঘটে সেদিকেও রাষ্ট্র ও সরকারকে খেয়াল করতে হবে।আমরা চাই, যথাযথ আইনে সব ৭১ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত সব মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার হোক, আর সেটা হতে হবে ধরনের প্রতিহিংসার উর্ধ্বে থেকে আইনের শাসনের ভিত্তিতে।অন্যথা এই বিচার ভবিষ্যতে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক।ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: