সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সাংবাদিকতার দিকপাল ও প্রথিতযশা মতিউর রহমান

মো: কায়ছার আলী:: গঙ্গা তিস্তার পূণ্য-প্রবাহ বিবৌত বরেন্দ্র ভূমির পুরাকীর্তির অনন্য নিদর্শন রামসাগর, কান্তজিউ মন্দির, কাটারীভোগ চাল এবং প্রাকৃতিক রসগোল্লা লিচুর স্বাদে তদানিন্তন বৃটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার ঐতিহাসিক প্রাচীন জেলাগুলোর অন্যতম আমাদের জন্ম জন্মান্তরের দিনাজপুর জেলা। আমাদের প্রাচীনতম ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সমানতালে বর্ণবৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহ্যময়। আবহমানকাল ধরে আমাদের রয়েছে সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাস। ঐতিহাসিক রাজপরিবার পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ দিনাজপুর জেলায় সংস্কৃতি চর্চার তীর্থ ভূমি আজ আধুনিক উচ্চমানের।বৃটিশ আমল থেকেই সাংবাদিকতার চর্চা ইতোমধ্যে শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। আমাদের প্রতিবেশী মহল্লা পাক-পাহাড়পুর সেখানেই দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি স্বভাবকবি ও চারণকবি নুরল আমিন শখের বসে ৬০ হতে ৭০ এর দশকে শুরু করেন মহান সাংবাদিকতা পেশা। তাঁর ৭ম পুত্র মতিউর রহমান (মতি)।

১৯৫১ সালের ১৭ মার্চ দিনাজপুর জেলার পাক-পহাড়পুরে এক মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা এবং তৎকালীন গুরু ট্রেনিং স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। এরপরই ১৯৬২ সালে দিনাজপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে ঝঝঈ পাশ করেন। পিতার আদর্শ, বিখ্যাত কবি কাজী কাদের নেওয়াজ, দেশবরেণ্য সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা, নারী জাগরণের অগ্রদুত বেগম সুফিয়া কামাল এর মত ব্যক্তিত্বরাই ছিলেন মতিউর রহমানের সাংবাদিক জগতের ভাবগুরু। রক্তের টান বড় টান। তাই ছোটবেলা থেকেই স্কুল ব্যাগ হাতে নিয়ে সাংবাদিক কবি বাবার পিছু পিছু ছুটতেন। বাবার সংগ আর স্পর্শেই আদর্শ, দর্শন ভিতরে ভিতরে জন্মাতে থাকে। কথায় আছে; একটি ভালো বীজই পারে ভালো ফসলের উপহার দিতে। তৈল চিত্র অংকন, স্কাউট, গার্ড অব অনার দেবার গৌরব এবং খেলাঘর শিশু কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠান জাতীয়ভাবে প্রচারিত হলে তিনি অনেক সুনাম পান। বিরামহীন পথচলার তাঁর কোন ক্লান্তি নেই।

‘৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান রয়েছে গৌরবের। তিনি ৭ম সেক্টরে অংশগ্রহণ করে ভারতের উচ্চতর ট্রেনিং গ্রহণ করেন। দিনাজপুরের রাধিকাপুর ও বিরল থানার নিকট পাক-বাহিনীর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হন। ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।তিনি পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। আজও তাঁর শরীরের দিকে তাকালে সে ঘটনাগুলোর স্বাক্ষ্য দেয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে আগস্ট থেকে শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন। জেলখানায় সাংবাদিক মতিউর রহমান এর সাথে অধ্যাপক ইউসুফ আলীর ছোট ভাই ইসরাইল আলীর পরিচয় সূত্রে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। তাঁদের দুইজনকেই রাখা হত সেলে। সেলের জন্য প্রতিজনের বরাদ্দ ছিল ২টি কম্বল, ১টি থালা ও ১টি বাটি। ঐ ১টি বাটি দিয়েই চলত জীবন ধারনের যাবতীয় কাজকর্ম। এই অমানুষিক নির্যাতন ছিল মৃত্যু যন্ত্রণা থেকেও বেশি। জেলখানায় খাওয়া বলতে সকালে ও রাতে ১টি রুটি ও ১চিমটি গুড়। দুপুরে নামমাত্র ভাত ও খাওয়ার অনুপযোগী তরকারী। রমজান মাসেও ছিল ১ মুট চিড়া ও সামান্য গুড়। ৪ জনের জন্য বরাদ্য ছিল ১ বালতি পানি। দিনরাত ছিল শুধু কান্না আর প্রার্থনা। দিনের পরে দিন, মাসের পরে মাস যেভাবে আসতে থাকে ঠিক সেভাবে বাংলাদেশ এর অসংখ্য অঞ্চল মুক্ত হতে থাকে প্রতিদিন। মেজর কামরুজ্জামান এর একটি লিখিত আদেশে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভোর ৫ টায় মুক্ত হন কমান্ডার ইসরাইল আলী; সাংবাদিক মতিউর রহমান সহ অন্যান্য ২৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। জেল গেটে তাঁদের স্বাগত জানান অসংখ্য সহযোদ্ধারা।

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়ার থেকে আরো বেশি কিছু মনে হয় না সাংবাদিক মতিউর রহমান এর। রাত্রি যত গভীর হতে থাকে প্রভাত তত এগিয়ে আসে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে অস্ত্র ফেলে দিয়ে আবার লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন সাংবাদিক মতিউর রহমান। ১৯৭৩ সালে পুরকৌশলে ডিপ্লোমা করে তৎকালীন রাজশাহী বিআইটি তে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হন। কিন্তু পূর্বে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের বৈষম্য নীতি মানতে না পেরে ছাত্রদের সাথে গোলমাল করে সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ স্থানীয় পত্রিকাসহ জাতীয় পত্রিকায় তিনি বিশেষ আসনে আসীন ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাকের বৃহত্তর দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় বিশেষ সংবাদদাতা, দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরার চীফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে তিনি বিটিভিতে যোগদান করেন এবং সাপ্তাহিক উত্তরকন্ঠ, সাপ্তাহিক কাঞ্চন ও সাপ্তাহিক পুর্ণভবা পত্রিকার বার্তা সম্পাদক পদে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অনেকদিন। বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি পদে অদ্যাবধি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং ১৯৮২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত নিউ ন্যাশন পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ল- কলেজ থেকে এল. এল. বি পাশ করেন। নেশার ঝোঁকে সাংবাদিকতা শুরু করতে গিয়ে ১৯৭৪ সালে দিনাজপুর লিলি সিনেমা হল ট্রাজেডি’র ঘটনার ছবি তুলে এবং খবর পরিবেশনের খবরের আলোকপাত হয় যখন তারই খবর জাতীয় মাধ্যম পার হয়ে আন্তর্জাতিক খবর মাধ্যম বি,বি,সি-তে স্থান পায়। সাংবাদিক মতিউর রহমান ৫ম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের মিডিয়া টিমের একজন হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরিফ, নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কৈরালা, ভুটানের রাজা জীগমে সিগমে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুম, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট শ্রীমাভো বন্দর নায়েক ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র শেখরসহ আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির। ভারতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ভেংকট নারায়ন এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে, ঐ সম্মেলনে। তিনি সার্কভুক্ত ৭টি দেশের সবকটিতেই অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনের বাংলাদেশের মিডিয়া টিমের প্রতিনিধি হয়ে যোগদান করেন। এতে করে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাংবাদিকতার বীজ বপন করেন দিনাজপুরের মতিউর রহমান। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনগুলিতে যোগদগানের কারণে তার সঙ্গে সার্কের আন্তদেশীয় সাংবাদিকদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে সাংবাদিক মতিউর রহমান পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা,ভূটান,নেপাল,সিংগাপুর, জাপান, ভারত সফর করেছেন একাধিকবার। জীবন সঙ্গিনী জিনাত রহমান তার কর্মময় জীবনে অনেকাংশ জুড়েই অবস্থান করছে। ছেলে মো: মাহফুজুর রহমান সোহাগ বর্তমানে স্থপতি প্রকৌশলী। সংসার জীবনে সে এক সন্তানের জনক এবং মেয়ে মাহফুজার রহমান সোহাগী বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছে। সে বেসরকারী টিভি চ্যানেল আরটিভি’র নি্উজ রুম এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। সদালাপী রসিক মানসিকতার অধিকারী সাংবাদিক মতিউর রহমান।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেষনের জন্য ১৯৯৫ সালের ১৭ আগস্ট একটি গণ আন্দোলনের সময় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার পত্রিকা অফিস ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। কিন্তু থেমে থাকেননি মতিউর রহমান। কেননা তিনি চলমানতায় বিশ্বাসী। তিনি অনেককে নিয়ে সামনের বহুদুর যাবার স্বপ্ন দেখেন। সাংবাদিকতায় তিনি অসংখ্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি সিসিডি কর্তৃক আয়োজিত প্রশিক্ষণ, পিআইবি আয়োজিত ফারাক্কা ও বাংললাদেশ পানি সম্পদ বিষয়ক রিপোর্টিং, অর্থনীতিক রিপোর্টিং কোর্স, অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিং ও পিআইবি এবং ইউনিসেয়ের যৌথ আয়োজনে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি নিউজ নেটওয়ার্ক এর আয়োজনে ১৯৯৮ সালে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। মো: মতিউর রহমান বিজিবি দিনাজপুরের আয়োজনে সীমান্ত চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার রোধের জন্য বিজিবি এর সার্বিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শক্তি বৃদ্ধিকরণ সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে টেলিভিশন এবং ইউনিসেফের আয়োজনের সরকারিভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় ডিজিটাল ক্যামেরা অপারেশন, শিশু সাংবাদিকতা এবং মহিলা বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্টিং এবং টেলিভিশন সংবাদদাতা সমিতি আয়োজনে টিভি সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন।

মো: মতিউর রহমান বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এর আয়োজনে কোড অব কন্ডাক্ট ফর জার্নালিস্ট বিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি কৃষি সাংবাদিকতা বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। শধু তাই নয়, মতিউর রহমান দৈনিক ইত্তেফাক সংবাদদাতা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং বিটিভি জেলা সংবাদদাতা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি পদে বর্তমানে কর্মরত। তাঁর কাছে প্রেরণা পেয়ে অনেকেই নিজেকে সাংবাদিকতা জগতে সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টায় রত। সাংবাদিক হিসেবে মো: মতিউর রহমান কতটা নান্দনিক এবং সৃজনশীল, তা তার প্রাপ্য স্বীকৃতির তালিকাকে বিশ্লেষণ করলে সামান্য হলেও আন্দাজ করা যায়। তবে তিনি যা স¦ীকৃতি পেয়েছেন তা যথেষ্ট নয়, বলে বিজ্ঞজনের ধারণা। তবে আগামীতে তার জন্য আরও বিশেষ কিছু অপেক্ষা করছে, এটা বলাই যায়। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এর ভিত্তি প্রস্তর এবং জাপানী কারিগরীর মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশন উদ্বোধনের দিন সেখানের উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক মতিউর রহমান। প্রতিভাদীপ্ত, সৃজনশীল, দেশী বিদেশী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন, ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, ডেলিগেট,পুরস্কার প্রাপ্তির পরে আরো মূল্যায়ন প্রাপ্তি ছিল এই মহান মানুষটির। যা আজকে পরম বাস্তবতা বা সময়ের দাবী।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: