সর্বশেষ আপডেট : ৫০ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

অমোঘ মৃত্যুর নির্মম দুয়ারে (মরহুম আব্দুর রৌফ চৌধুরী স্মরণে)

মোঃ কায়ছার আলী:: “যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপাড়ের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে। বুঝবে সেদিন বুঝবে। ছবি আমার বুকে বেঁধে, পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মরু কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাস চিরি, যেদিন আমায় খুঁজবে, বুঝবে সেদিন বুঝবে।” জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে এবং অনেক দূরে তথা না ফেরার দেশে চিরতরে চলে যায়। এভাবে আমরা হাজার হাজার বছর ধরে, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে একের পর এক ক্রমাগত ভাবে এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর দিকে। আমাদের এই শোক মিছিলের পদযাত্রা কেয়ামত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। প্রতি মূহুর্তেই আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি আমাদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত-অপরিচিত। প্রাণপ্রিয় নেতা বা জননেতা এবং পরিবারের সদস্যদেরকে। শুরুতেই আমরা রুহের জগতে ছিলাম। তখন আমরা ছিলাম কেবল আত্মা। যেটা ধ্বংস হয়না, রুপান্তর হয়। তারপর পেলাম আরেকটি জগত তখন আমরা হলাম পরস্পরের আত্মীয়। মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই যেন আত্মার আত্মীয়। সুতাহীন মায়ার বন্ধনে আমরা আবদ্ধ।

কখন যে সেই বন্ধন ছিন্ন হয় তা কেউ জানে না। জানেন শুধু একজনই যিনি আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। হঠাৎ করেই মানুষ চলে যায় তখন রেখে যায় এক বুক কষ্ট আর এই কষ্ট নিয়েই আমরা বেঁচে থাকি। এমনই একটা অব্যর্থ শর ২১ শে অক্টোবর ২০০৭ সালে অসীম বিদ্ধ করল সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুরে বেড়ে ওঠা কোমল প্রাণের মানুষ যাকে বিশেষণ দিয়ে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন নেই। যিনি স্বনামেই স্বনামধন্য। অগৌরবে গৌরবান্বিত, স্বমহিমায় মহিমান্বিত। তিনি আমাদের সকলের পরিচিত আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব আব্দুর রৌফ চৌধুরী। তাঁর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি গভীর শ্রদ্ধা ও বিন¤্রচিত্তে তাঁকে স্মরণ করছি। তাঁকে আমি ছাত্রজীবনে দেখেছি।

দিনাজপুর শহরের রাজপথে নেতৃত্ব দিতে বিশেষ করে এরশাদ সরকারের পতন এবং ১৯৯১-৯৬ সালে। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি স্টেশন রোডের আবাসিক নিউ হোটেলের ভিআইপি ১২ নম্বর কক্ষের তৃতীয় তলায় দীর্ঘ ১৭ বছর মামলা হুলিয়া ইত্যাদি মাথায় নিয়ে আওয়ামী লীগের মত বড় দলকে নেতৃত্ব দিতে। দিনাজপুরে আওয়ামী লীগে জন্ম লগ্নে যে কয়েকজন মানুষ নিউক্লিয়াসের মত ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর মধ্যে তিনি একজন। অন্যরা হলেন এ্যাডভোকেট আমজাদ এবং শাহ মাহতাব। তাঁরা আজ কেউ বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁদের প্রাণপ্রিয় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশ তথা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। জীবন মৃত্যুর কাছে সবসময় পরাজিত হয়। মৃত্যুর সঙ্গে কোন দাম্ভিকতা চলে না। যত বড় কীর্তিগাঁথা জীবনই হোক সে জীবনটাই যেন মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়েছে। তবে পরপারের সব যাত্রী কিন্তু স্মরণীয় নয়। কিছু কিছু যাত্রী আছেন যারা কর্ম ও সৃষ্টির মধ্যে এ পৃথিবীতে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। পারলৌকিক পীড়িত পথের মহারাজা মৃত্যুদূত অত্যন্ত নির্দয় ও নিষ্ঠুর। এ জগত সংসারে সে হাজির হয় শুধু প্রাণ নিতে এবং কষ্ট দিতে। এই দেয়া-নেয়ার মাঝখানের অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকি আমরা। মৃত্যুর খবরে আমরা ব্যথিত হই। আব্দুর রৌফ চৌধুরী একজন কীর্তিমান পুরুষ, ক্রীড়াবিদ এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।

তিনি ১৯৩৭ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর এক মাহেন্দ্রক্ষণে সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সমাজসেবা মৌলভী খোরশেদ চৌধুরী এবং মাতা আয়েশা খাতুন চৌধুরী। রৌফ চৌধুরীর জন্মের একবছর পর তাঁর পিতা মারা যান। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫২ সালেই তিনি ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পরবর্তীতে দিনাজপুর তৎকালীন এস.এন কলেজে (দিনাজপুর সরকারী কলেজ) বি.এ পড়েন। উচ্চ মাধ্যমিক পড়াকালীন সময়ে তিনি ছাত্রনেতা ছিলেন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর নিদের্শেই তিনি এস.এন কলেজের ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিত্ব করেন। পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর দিনাজপুর (বর্তমান দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়) জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন সরকারের বড় কন্যা রমিজা রৌফ চৌধুরীর সাথে বিবাহর বন্ধনে আবদ্ধ হন। একমাত্র পুত্র সন্তান ছাড়া তাঁদের আরও পাঁচটি কন্যা সন্তান রয়েছে। সমাজে তারা সকলেই প্রতিষ্ঠিত। তাঁর পুত্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (তিনবার), দিনাজপুর-০২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য (তিনবার) এবং মাননীয় নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর সহধর্মিনী তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসার সুন্দরভাবে পরিচালনা করে সন্তানদেরকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এক আনন্দ-বেদনার কাব্য। যেখানে মিলেমিশে আছে হৃদয়মথিত শোক এবং প্রতিরোধের দৃঢ়চিত্ত উত্থান, জীবন উৎসর্গ করে জীবন জয় করার আখ্যান। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাঁরা অবশ্যই ভাগ্যবান। যাঁরা শহীদ হয়েছেন অথবা গাজী হিসেবে বেঁচে আছেন তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহম্মেদ এর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের তিনি দূত ছিলেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর বোচগঞ্জ উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়। তাঁর মত ছাত্র নেতারা তথা সংগঠকেরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশে-বিদেশে ক্যাম্পে ক্যাম্পে আনাচে-কানাচে ঘুরে বেরিয়ে। শুনেছেন অনেক বোনের বৈধ্যব্যের যন্ত্রণা। অসংখ্য মায়ের সন্তানহারা আর্তনাদ, লক্ষ লক্ষ নিষ্পাপ রমনীর সতীত্ব হারানো বেদনায় কুঁকড়ে উঠা কলঙ্কিত জীবনে আর বেঁচে না থাকার কাকুতি-মিনতি, তাঁদের মাথায় হাত রেখে সেদিন অশ্রুসিক্ত নয়নে ছাত্রনেতারা বলেছিলেন “দুঃখ করো না বোন, মহান স্বাধীনতার সূর্য উঠবেই। তাঁর রৌশনীতে শুকিয়ে যাবে তোমার মুখের উপর ছড়ানো পবিত্র দাগ।” কি অসীম ত্যাগ! এই মহান স্বাধীনতার জন্য। তাঁরা জীবনের বিনিময়ে আমাদের নিরাপদ বাংলাদেশ দিয়ে গেছেন। পত্ পত্ করে আজও উড়ছে লাল সবুজের পতাকা। রয়েছে আমাদের সার্বভৌম মানচিত্র এবং বিজয়ের গান, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

১৯৯৬ এর পূর্ববর্তী সময়ে একাধারে ১৫ বছর তিনি দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ১৫ ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি পালনকালে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এরপর দীর্ঘদিন চিকিৎসারত ছিলেন তিনি। ‘৭৫ এর পরবর্তী সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯০ সালে বোচাগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে দিনাজপুর-০১ আসন (বীরগঞ্জ-কাহারোল) থেকে জাতীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বণাঢ্য ইতিহাস দৃষ্টিপাত করে তাঁকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সে সময় সুযোগ করে দেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ধারক এবং বাহক আব্দুর রৌফ চৌধুরীর তাঁর কর্মের মধ্যে আমাদের মাঝে বেঁচে রইবেন। জানি মৃত্যু ¤্রয়িমানতা সবাইকে কাঁদায়। এটা চরম অপ্রিয় সত্য কথা। সেটা স্বল্পক্ষণের দুঃখ ভারাক্রান্ত অন্তিম অনুভূতি। এই মৃত্যু যন্ত্রণা কেবল আপনজনকেই বেশি তাড়িত করে। তবে কীর্তিমানদের মৃত্যু সমাজ সীমানা পেরিয়ে দেশ ও জাতির হৃদয়ে স্পর্শ করে। আপনি দেহগত দূর অচিনপুরে চলে গেলেও বেঁচে থাকবেন কীর্তিকায়ার অন্তারালে কিংবদন্তীতুল্য কাতারে থেকে যাবে আপনার নাম যা কোনদিন মুছে যাবে না। পরপারে ভাল থাকেন এ দোয়া সবসময় করি।

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: