সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

কালাপাহাড়ের বিরুদ্ধে কালো ঘোড়ার লড়াই

পীর হাবিবুর রহমান:: বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বেআইনি কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আইনের খড়্গ নামিয়ে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা র‌্যাবের যে অভিযান চালিয়েছেন তাতে আদর্শিক রাজনীতি থেকে আদর্শহীন রাজদুর্নীতির বীভৎস, কুৎসিত চিত্রপট বের হয়ে এসেছে। রাজনীতি ও সমাজে বুক ফুলিয়ে হাঁটা আইন ও সংবিধান লঙ্ঘনকারী মাফিয়া ডন বা বাজিকরদের চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে।

অভিযানের সূচনায় যে আলামত দেখা যাচ্ছে আইনের গতিশীল পথে এ অভিযান অব্যাহত থাকলে সমাজের অন্ধকার জগতের, বেআইনি কর্মকান্ডের মাধ্যমে যে সীমাহীন নির্লজ্জ বেহায়াপনা ও বেআইনি কর্মকান্ড হচ্ছে তা-ই থামবে না, একের পর এক বাজিকরদের আটকই করা হবে না, সব অবৈধ কর্মকান্ডের খলনায়ক থেকে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও লুটের টাকার শরিকানাদেরও আইনের আওতায় আনা যাবে।

এমনকি এত দিন ঢাকা ও চট্টগ্রামে এসব অবৈধ কর্মকান্ড যেসব পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে সহযোগিতায় ভাগের লাভে হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। পুলিশ কি পোশাকের সম্মান রক্ষা করেছে? কারা ছিলেন এত দিন দায়িত্বে? পূর্ত দফতরের জি কে শামীম ধরা পড়েছেন, শিক্ষাভবনের শফিকুল, স্বাস্থ্য খাতের মিঠু থেকে সব দফতরের নিয়ন্ত্রকরা কোথায়?

এমনকি নিষিদ্ধ ক্যাসিনো থেকে বেআইনি স্পার নামে যৌন বাণিজ্যের কলঙ্কিত ব্যবসায়ী ও তাদের পাহারাদারদেরই ধরা হবে না আইনের জালে ব্যাংক লুটেরা থেকে শেয়ারবাজারের জুয়াড়ি ও বিদেশে অর্থ পাচারকারী থেকে একেকটি বাণিজ্য জগৎকে যারা বেপরোয়াভাবে নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসনিক সহযোগিতায় তারাও ধরা পড়বেন। এ অভিযান সফল হলে গোটা দেশ অপরাধের অন্ধকার জগৎ থেকে আইনের আলোর জগতে ফিরে আসবে। প্রমাণ হবে সবার জন্য আইন সমান। প্রমাণ হবে রাষ্ট্রনায়ক চাইলে সমাজে ন্যায়বিচার বা সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হবে, দুর্নীতি বন্ধ হবে।

বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ক্যান্সারের মতো যে দুর্নীতির রোগ আইনকে পঙ্গু করে দিয়ে, প্রশাসনকে বিকল করে দিয়ে রাজনীতির মহান আদর্শকে নির্বাসিত করে, সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের শেষ তলানিতে নিয়ে গিয়ে আইন ও বিচারের ভয়কে জয় করে রাষ্ট্র ও সমাজকে মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে চরম অর্থনৈতিক লুটপাট, অঢেল বিত্তবৈভব ও সীমাহীন ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে নিজেদের কালো দৈত্যে পরিণত করে অপরাধকে কালাপাহাড়ের মতো শক্তিশালী দানবে রূপ দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে চলমান অভিযান মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার সহ্য ও ধৈর্যের বাঁধভাঙা ন্যায়ের যুদ্ধ।

আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, মুনাফাখোর ও অসৎ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে না নিতেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে পরিবার-পরিজনসহ তাকে নৃশংসভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পথে সেনাবাহিনীর একদল সশস্ত্র বিশ্বাসঘাতক সন্ত্রাসী ও দলের মীরজাফর খ্যাত বিশ্বাসঘাতক বেইমান মোশতাকচক্র হত্যা করে তা স্তব্ধ করে দেয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর গরিবের দল আওয়ামী লীগের আদর্শিক নেতা-কর্মীরা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে সামনে নিয়ে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। ছিনতাই হওয়া গণতন্ত্র উদ্ধার করে, বার বার জীবনের ওপর আসা আঘাত ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা গণমানুষের দল আওয়ামী লীগকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখলেও দলের একটি অংশ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় মিলেমিশে লুটের রাজত্ব বা অপরাধের অন্ধকার জগৎ কিংবা দুর্নীতির মহোৎসবে ভোগবিলাসের পথে অর্থবিত্ত ও সম্পদ গড়ার নেশায় বুঁদ হয়ে কালাপাহাড় নামে দানবশক্তিকে জনগণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করেছে।

সুবিধাভোগী শ্রেণি যারা যখন ক্ষমতায় তাদের পা-চাটাদের নিজেদের সঙ্গে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিশ্বের সামনে বিস্ময়কর জায়গায় নিয়ে গিয়ে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি যখন দিতে যাচ্ছেন, তখন দলের ভিতর থেকেই নষ্ট একটি অংশ, অনুপ্রবেশকারী আদর্শহীন, নীতিহীন ও রাজনৈতিক চরিত্রহীনদের সঙ্গে প্রশাসনসহ অপরাধীদের মহাসম্মিলন ঘটিয়ে দেশে বেআইনি কর্মকান্ড, অপরাধ, অর্থনৈতিক লুটপাট, রাতারাতি বিত্তবৈভব ও জৌলুসময় জীবনের পথে অন্ধ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা একদল নষ্ট। তাদের সঙ্গে একদল অসৎ পুলিশ, প্রকৌশলী, আমলা, সরকারি কর্মচারী কতটা পাপে ডুবেছে? তাদেরও আইনের জালে আটকাতে হবে।

এরশাদ ও শেখ হাসিনা সরকারের ১৭ বছরের মন্ত্রী জীবনে পরাজয় না করা এমপি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছিলেন, শেখ হাসিনা হলেন অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্স, যাকে তিনি ইলেকটেড সিএমএলএ বলতেন। ইতিবাচক অর্থে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বা সরকারের কর্মকান্ড দৃঢ়তার সঙ্গে ক্ষিপ্রগতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাস্তবায়নে যে নেতৃত্বের গুণাবলি রাখেন তা বোঝাতেই তিনি এটি বলেছিলেন।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ বরেণ্য পার্লামেন্টারিয়ান ও সফল মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, মন্ত্রিসভা থেকে একনেকের বৈঠকে দেখা গেছে, যে কোনো বিষয়ে হয়তো কথা চলছে শেখ হাসিনা তখন কারও সঙ্গে কথা বলছেন কিন্তু কোনো শব্দ তার কানে যেতেই তিনি যখন সেটি নিয়ে কথা বলতেন, বোঝা যেত হোমওয়ার্ক করে প্রতিটি ফাইল পরতে পরতে পড়ে তিনি বৈঠকে আসেন। সংসদে বসে, গণভবনে বসে এমনকি তার কার্যালয় থেকে বিদেশ সফরকালেও ফাইল তিনি জমিয়ে রাখেন না। দল, সরকার ও দেশের জন্য ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রমী মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা বার বার অপরাধীদের সতর্ক করেছেন। তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সজাগ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অর্থ ও ক্ষমতার দম্ভে গরম সইতে না পারা লোভী অসৎ অপরাধীরা সতর্ক হয়নি, আমলে নেয়নি।

প্রয়াত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কী অবলীলায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘বাঘে ধরলে ছেড়ে দেয়, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।’ টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে গোটা দেশের জনগণকে আশাবাদী করে শেখ হাসিনা চলমান অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন সেই কথার সত্যতা। দানবশক্তি কালাপাহাড়ের বিরুদ্ধে এ লড়াই মানবশক্তির নেতা অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্স বা কালো ঘোড়ার উপমা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বরাজনীতিতে নিজের আসন প্রশংসিত করা শেখ হাসিনার লড়াই। বেআইনি শক্তির বিরুদ্ধে এটা আইনি শক্তির লড়াই। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বা রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের বাজিকরদের বিরুদ্ধে আদর্শিক রাজনীতির গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনার লড়াই। অভিযানে যারা অংশ নিচ্ছেন, তাদের সামনে এখন সব লোভ-মোহ উপেক্ষা করে গভীর দেশপ্রেম ও আইনের প্রতি অবিচল থেকে কঠোর থাকার কথা।

এ লড়াইয়ে শেখ হাসিনার জেতার কোনো বিকল্প নেই। এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। এ লড়াইয়ে শেখ হাসিনা জিতলে আইন ও সুশাসন জয়ী হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার জয়ী হবে। পাপাচারের বিরুদ্ধে সততার জয় হবে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা এত কর্মসংস্থান করেন, ট্যাক্স দেন, দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন অথচ সেসব বড় বড় শিল্পপতি থেকে ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা, সরকারি-বেসরকারি সৎ চাকরিজীবীরা জীবিকা থেকে শুরু করে গরিব কৃষক-শ্রমিক দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, অন্যদিকে সংবিধান ও আইনকে লঙ্ঘন করে রাজদুর্নীতির সুবাদে সমাজের একটি নষ্ট শ্রেণি অবক্ষয় ও নীতিহীনতার অন্ধকার জগৎ থেকে উঠে এসে অবৈধভাবে অর্থনৈতিক লুটপাটের মহোৎসব করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাবেন, এটা সমাজ সইতে পারে না।

শেখ হাসিনার চলমান এই যুদ্ধে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের অনিবার্য বিজয় দেখতে চাইলে গোটা সমাজকে গণজাগরণ ঘটিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে এগিয়ে আসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এ যুদ্ধে দেশ হোঁচট খেতে পারে না। অপরাধীদের, বেআইনি কর্মকান্ডে জড়িতদের সিন্ডিকেট যত বড় হোক, শিকড় যত বিস্তৃত হোক রাষ্ট্র ও জনগণের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে না। আওয়ামী লীগের মতো দলে কমিটি বাণিজ্য হয়, যুবলীগে পিয়ন থেকে নেতা, ব্যবসায়ী ও পদ বাণিজ্যের হাট বসে ছাত্রলীগ নেতারা ৮৬ কোটি টাকা কমিশন চায়, কমিটি, পদ বাণিজ্য করে। জেলা আওয়ামী লীগ থেকে কেন্দ্রের নেতা নজরদারিতে থাকে। অঢেল সম্পদ গড়ে কোথা থেকে? আবেগ অনুভূতি সততা এদের কাছে নির্বাসিত হলো!

ঢাকায় ৬০টি ক্যাসিনো জুয়ার রমরমা বাণিজ্য অবৈধভাবে করেছে।অনেকগুলোতে র‌্যাবের অভিযানে মালিক থেকে একদল জুয়াড়ি আটক হয়ে রিমান্ড ও কারাগারে। এদের পক্ষে দলের ভিতর থেকে যখন অনেকে কথা বলেন, তখন লজ্জা হয়। বিএনপি জমানায় শুরু হওয়া ক্যাসিনো বাণিজ্য বা রাতের ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ক্লাবপাড়ায় সংগঠিত জুয়াড়িদের শেখ হাসিনার শাসনামলেও কারা অব্যাহত রেখেছে, কারা বিকশিত করেছে, কারা পাহারা দিয়েছে, কারাই বা এই অবৈধ বাণিজ্যের উড়ন্ত টাকার নিয়মিত ভাগবাটোয়ারা পেয়েছে সবাইকেই একে একে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ দেশের মানুষ ফুটবল প্রেমে উন্মাদ ছিল একসময়। বিএনপির মোসাদ্দেক আলী ফালু মোহামেডান ক্লাব দেখতেন। তার সহকর্মী ছিলেন লোকমান। ফালু দেশছাড়া লোকমান কীভাবে হয়ে যান আওয়ামী লীগার? কারা তার হাতে তুলে দেয় মোহামেডান ক্লাব? কাদের শক্তিতে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য বসান সেখানে লোকমান?

কীভাবেই তিনি বিসিবির কর্মকর্তা হয়ে যান? অনুপ্রবেশকারীরা দলের বদনাম করেছে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। কাদের হাত ধরে অনুপ্রবেশই তারা করেনি, অবৈধ অর্থসম্পদের মালিক ও জুয়াড়িদের বাজিকর হয়ে উঠেছে? জনগণকেই জবাব দিতে হবে না, লাখ লাখ কর্মীর রক্তেভেজা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর কাছেও এই জবাব দিতে হবে। দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা নেতা-কর্মীরা কীভাবে একেকটি ক্লাবে প্রধান হয়ে বেআইনি ক্যাসিনো-বাণিজ্য চালিয়েছেন? ফ্রিডম পার্টি থেকে আসা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া কেমন করে যুবলীগের নেতা হয়ে যান? ফুটবলে টাকা কাজে লাগেনি, বাকিদের কপাল খুলেছে। অন্যদিকে দলের দুঃসময়ে মাঠের লড়াই করা কর্মীরা পদ-বাণিজ্যের ভয়াবহতার যুগে রাজনীতি করার জন্য কোনো কমিটিতে ঠাঁই পান না! নষ্টদের সরিয়ে দলেও আদর্শিকদের বসানোর দায়িত্ব নেতৃত্বকে নিতেই হবে।

বিএনপি নেতা ও সাবেক পূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের যুবদলের টোকাই কর্মী ছিলেন জি কে শামীম। স্কুলশিক্ষক পিতার এই অশিক্ষিত কুসন্তান বিএনপির ওপর সরকারের দমননীতির পরে কীভাবে বাগিয়ে নেন যুবলীগের দুই আনি পদ? ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায়। মির্জা আব্বাসসহ বিএনপি নেতারা তাদের নিয়ে ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি অবস্থা। কার দরজা দিয়ে আওয়ামী লীগে এসে জি কে শামীম পূর্ত মন্ত্রণালয়ে সবার রুটি-রুজি বন্ধ করে বা সব ঠিকাদারকে হটিয়ে ঠিকাদারির একচ্ছত্র মুঘল হয়ে ওঠেন কাদের পৃষ্ঠপোষকতায়?

সমাজে নিজে কতটা অচল সেটা বুঝতে পেরেছি র‌্যাবে আটক করার পর তার নাম প্রথম শুনে! অথচ সাংবাদিকদের সংগঠনও টাকা নিয়ে তাকে বিশেষ অতিথি করেছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। বসিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশে। পূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীরা র‌্যাব হেডকোয়ার্টারসহ সরকারি বিভিন্ন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব একচ্ছত্রভাবে তাকে দিয়ে উদ্বোধন বা ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী থেকে র‌্যাবের ডিজির পাশেও তার ছবি তোলার সুযোগ করে দিয়েছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ পাওয়া এই মাফিয়া ডন জি কে শামীম রাস্তার টোকাই থেকে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের এত বড় মুঘল হয়ে ওঠেন যে প্রায় পৌনে দুইশ কোটি টাকার এফডিআর, এক কোটি ৮০ লাখ টাকা নগদ তার অফিসে পেয়েছে। র‌্যাবের হাতে আটকের সময় তাকে ছেড়ে দিতে ১০ কোটি টাকার অফার দিয়েছেন। দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন নেত্রী যেখানে দুই কোটি টাকার অনিয়মের জন্য আদালতের রায়ে প্রায় দুই বছর অসুস্থ শরীর নিয়ে জেল খাটছেন তখন প্রশ্ন জাগে- রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবে লুটে নেওয়া জি কে শামীম কতজন তৈরি হয়েছে? ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও অর্থ পাচারকারীরা কত টাকা লুটে নিয়ে গেছে? এ অভিযানে তাদের পৃষ্ঠপোষকসহ সব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা থেকে প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করে দেশে সুশাসন বইয়ে দিতে পারলে এ দেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনা মহান দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে অমরত্ব লাভ করবেন।

যে দেশের শ্রমিকরা বিদেশে শরীরের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের রেমিট্যান্স পাঠায় অথচ বছরে বিমান ভাড়ার জন্য প্রিয়জনের পাশে আসতে পারে না, যে দেশের কৃষক কৃষিবিপ্লব ঘটিয়ে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না, সে দেশে দুর্নীতিবাজদের উল্লাসনৃত্য সহ্য করা যায় না। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের দাগ এই মাতৃভূমির প্রতিটি জমিন জড়িয়ে আছে। জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের দাগ এখনো বত্রিশ নম্বর বাড়িতে লেগে আছে। এখনো এ দেশের মাটিতে তিনি শায়িত আছেন। লাখ লাখ শহীদের কঙ্কাল এ দেশের জমিনের নিচে পড়ে আছে। আড়াই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের আর্তনাদ বাতাস ভারি করে রাখে। কত দেশপ্রেমিক সাহসী সন্তানের রক্ত মিশে আছে এই মাটিতে। এখানে এই অপরাধী দানবশক্তির উত্থান ও তাদের দম্ভ অন্যায়-অবিচার গ্রহণযোগ্য নয়।

ফিল্মি মাফিয়াদের মতো পাঁচ ফুট উচ্চতার জি কে শামীম ছয় ফুট উচ্চতার সাতজন সশস্ত্র দেহরক্ষী ও ২০-২৫টি মোটরসাইকেল আরোহী নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে পথ চলতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করলেও পাপের জগতের এই মুঘলকে কেন আটকাননি? কারা তাকে সূর্যের আলো দিতেন? জি কে শামীম গণপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে এক হাজার এক শ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আয়মের স্নেহধন্য রফিকুলই বা কীভাবে প্রধান প্রকৌশলী হয়েছিলেন? বিদায়ী উপপ্রধান প্রকৌশলীসহ সাবেক ২০ জন কর্মকর্তাকে ৪০০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন। অনেক ক্যাডার, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মচারী ও রাজনীতিবিদকে নিয়মিত বখরা দিতেন। একেকটি অপরাধের সঙ্গে কারা কারা সামনে কারা নেপথ্যে? সবাইকে আইনের আওতায় আনতে না পারলে অভিযান চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করবে না। ফুটবলের সেই ক্রেজ নির্বাসিত হলেও মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবকে পর্যন্ত ক্যাসিনো বাণিজ্যের পাপে নিমজ্জিত করা হয়েছে। চুনোপুঁটি ধরলে হবে না, নেপথ্যের রাঘববোয়ালদের মাথাটা টেনে আনতে হবে। সব জায়গায় মিস্টার টেন টু টুয়েন্টি পার্সেন্ট কমিশন বাজিকরদের দেখতে হবে।

যাক, প্রায় ১১ বছর ধরে দেশে শাসকদল আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে বিভিন্ন কমিটি বা দলীয় ক্ষমতাবানদের আশ্রয়ে সুবিধাভোগী যারা বেআইনি কর্মকা- বা স্বজনপ্রীতি লাভ করে রাতারাতি অর্থবিত্ত, আলিশান বাড়িঘর, দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ গড়েছেন তাদের যেমন তালিকা করে এ শুদ্ধি অভিযান সফল করে আইনের আওতায় আনতে হবে, তেমনি প্রচলিত আইন-কানুন, নিয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে ক্যাসিনো মালিক বা স্পা অথবা জি কে শামীমের মতো বিভিন্ন প্রকৌশল দফতরে একচ্ছত্র ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের তালিকা তৈরি করে আইনের আওতায় আনতে হবে। দলের এমপি হয়ে, বিভিন্ন কমিটিতে জায়গা পেয়ে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ পেয়ে অবৈধ অর্থবিত্ত গড়েছেন তাদের তালিকাও চূড়ান্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। শাস্তি পেতে হবে অপরাধীকে যারা আইনের পোশাকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে প্রশ্রয় দিয়েছেন।

এমনকি অভিযান যেখানে বিদ্যমান আইনের আলোকে বেআইনি কর্মকান্ড জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে সেখানে সমাজে যেন এমন আতঙ্ক তৈরি না হয় যাতে ভয়ে বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যান। অপরাধীদের যেমন পালাতে দেওয়া যাবে না তেমনি অর্থ পাচার রোধে নিরাপত্তা করতে হবে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ক্যাসিনো-বাণিজ্য আর ঠিকাদার বাজিকরদের যেভাবে ধরা হচ্ছে সেভাবে ব্যাংক লুটেরা থেকে শেয়ার লুটেরা ও বিদেশে অর্থ পাচারকারী দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এবং রাষ্ট্রের টাকায় পড়ালেখা করা গরিবের যেসব সন্তান বুয়েট, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনের শীর্ষ পদে থেকে দুর্নীতিতে ডুবেছেন, তাদেরও পাকড়াও করতে হবে।

না হয় দলের নেতা-কর্মীরা বলতেই পারেন, দলের দুঃসময়ে আমরা ছিলাম লড়াইয়ে, ক্ষমতার সুসময়ে দু’টাকা কামাতে গিয়ে আমরা দন্ড ভোগ করলাম অথচ বড় বড় লুটেরা ঘুষখোর দুর্নীতিবাজরা থাকল আইনের ঊর্ধ্বে। আমাদের একটাই আকুতি, অপরাধী যে-ই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উক্তির কঠোর বাস্তবায়ন হোক। দুর্নীতির পাগলা ঘোড়াকে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়।

এ রকম অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে টিআইবি থেকে তথাকথিত সুশীলসমাজ বা রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দিয়ে মাঠে না নামতে দেখে অবাক হয়েছি। সবারই এ অভিযানকে সমর্থন দেওয়ার এখনই সময়। এমনকি গণমাধ্যমের কেউ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে আইনের খড়্গ তার জন্যও সমান। তেমনি মুজিবকন্যাকে সহায়তা করতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সারা দেশের লুটপাট ও অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়ার এখনই সময়। সে রাজনৈতিক শক্তিই হোক আর প্রশাসনিক শক্তিই হোক।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক
বাংলাদেশ প্রতিদিন।




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: