সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ধর্মের গ্লানি ও অধর্ম বেড়ে যাওয়ায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব

শ্রীধর দত্ত:: জ্যোতিষ শাস্ত্রানুসারে আজ থেকে ৫২৪৫ বছর পূর্বে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ৩২২৮ সালের ১৮ জুলাই সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রে হর্ষণযোগে মধ্য রাত্রিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়। অষ্টমী তিথিতে জন্ম হয়েছিল বলে, সে সময়কে বলা হয় জন্মাষ্টমী। শ্রীকৃষ্ণের পিতার নাম বসুদেব এবং মাতার নাম দেবকী। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের অষ্টম গর্ভের সন্তান। গোকুল রাজ্যের রাজা নন্দ হচ্ছে বসুদেবের খুড়তুতো ভাই। তবে শ্রীকৃষ্ণকে লালন পালন করেন নন্দ ও তাঁর স্ত্রী যশোদা। গর্গ মুনি ধ্যানের মাধ্যমে জানিয়ে কৃষ্ণ নামটি রাখেন। শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর, পরমেশ্বর, গোবিন্দ, ভগবান সহ ১০৮ নামে ডাকা হয়। তিনি ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। সনাতন ধর্মের শাস্ত্রানুযায়ী চার যুগে অবতার রূপে ভগবান যেমন : সত্যযুগে শ্রীহরি, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র, দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ এবং কলিযুগে শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর। পৃথিবীতে যখন ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্ম বেড়ে যায তখন মানব কল্যাণে ভগবান মনুষ্যরূপ ধারণ করে মর্তলোকে আবির্ভূত হন। ধরাধামে এসে ভগবান তিনটি কাজ করেন প্রথমত দুষ্টের দমন, দ্বিতীয়ত সৃষ্টের পালন এবং পরিশেষে সাধুদের রক্ষা ও ধর্ম সংস্থাপন। তাই শ্রীমদ্ভগবদগীতার চতুর্থ অধ্যায়ের জ্ঞানযোগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত
অভ্যুত্থানম ধর্মস্য তদাত্নানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে’’।

দেবকীর জ্যাঠতুতো ভাই দুরাচারী কংস মগধের রাজা জরাসন্ধের সহায়তায় বৃদ্ধ পিতা রাজা উগ্রসেনকে কারাগারে পাঠিয়ে মথুরার রাজা হন। মথুরার রাজা উগ্রসেনের ভ্রাতুষ্পুত্রী দেবকীর সঙ্গে রাজা বসুদেবের বিবাহের সময় আকাশ বাণী আসে, “হে অবোধ কংস! তুমি যে ভগ্নি দেবকীকে এত যত্ন করে নিয়ে যাচ্ছ তাঁর অষ্টম গর্ভের সন্তান তোমাকে সংহার করবে”। ফলশ্রুতিতে কংস দেবকীর সমস্ত পুত্রকে জন্মের পরপরই মেরে ফেলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অবশেষে কংস দেবকী ও বাসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন। কারাগারে তাঁদের পর পর ছয়টি সন্তান হয়, তাঁদের সকল সন্তানকে কংস হত্যা করেন। রাজা নন্দের রক্ষণাবেক্ষণে বসুদেবের আরেক স্ত্রী ছিলেন রোহিণী। রোহিণীর গর্ভে যোগমায়ার দ্বারা সপ্তম সন্তান বলরাম নামক পুত্রের জন্ম হয়। বসুদেব ও দেবকীর উপর কংসের নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বয়ং নারায়ন দৈববাণী করলো যে “আমি তোমাদের ঘরে জন্ম নিবো। আমাকে যশোদার কাছে রাখবে এবং যশোদার কন্যা সন্তানটি কারাগারে নিয়ে আসবে”। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের রাত ছিল গভীর অন্ধকার, তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বসুদেব দেখলেন শিশু চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম ধারণ করে আছেন, তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণব্রহ্ম স্বয়ং নারায়ন তাঁদের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছেন। বসুদেব করজোড়ে প্রণাম ও বন্দনার পর কৃষ্ণ তার বালক রূপ ধারণ করেন। বসুদেব যখন শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃন্দাবন যাচ্ছিলেন তখন প্রচুর ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল, ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে কারাগার আপনা আপনি খুলে গেল এবং প্রহরীসহ সকল জীব সে সময় ছিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে গোকুলে যাবার পথে যমুনা নদী ও বাসুকি নাগ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিল। সেই রাতেই নন্দের স্ত্রী যশোদার কন্যা যোগমায়ারূপে জন্মগ্রহণ করেন দেবী মহাশক্তি। শ্রীকৃষ্ণের জীবন বিপন্ন জেনে এইভাবে জন্মরাত্রেই দৈব্য সহায়তায় কারাগার থেকে কৃষ্ণকে গোকুলে যশোদার ঘরে রেখে পুনরায় সদ্যোজাত কন্যা সন্তানকে মথুরায় নিয়ে আসেন। কংস তখন কন্যাটিকে পাথরে নিক্ষেপ করে হত্যা করতে আদেশ দেন, কিন্তু কন্যাটি (আদ্যা শক্তি মহামায়া) নিক্ষিপ্ত অবস্থায় আকাশে উঠে গিয়ে বলেন, “তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে”। গোকুলে শ্রীকৃষ্ণকে হত্যার জন্য কংস পুতনা, বকাসুর, কেশী, তৃণাবর্ত, অঘাসুর সহ আরো অনেক রাক্ষস পাঠিয়েছিল। সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কংস যজ্ঞ করে কৌশলে কৃষ্ণকে মথুরায় আমন্ত্রণ জানান। তারপর নন্দকে বন্দি এবং উগ্রসেন ও বসুদেবকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এই আদেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ কংসকে আক্রমণ করেন এবং সিংহাসন থেকে ছূঁড়ে মেরে হত্যা করেন। তারপর কৃষ্ণ উগ্রসেনকে সিংহাসনে বসিয়ে মথুরায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি কালীয় নাগ, শঙ্খাসুর, নরকাসুর, শিশুপাল ও শাম্ব সহ আরো অনেক দুরাচারী ও রাক্ষসকে হত্যা করে। শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন বাল্যলীলার মধ্যে মাতা যশোদাকে বিশ্বরূপের দর্শন ও কৃষ্ণের মাখন চুরি করে খাওয়া, ধামবন্ধ ও গোবর্ধন পর্বত অন্যতম।

জন্মাষ্টমীতে দেশের বিভিন্ন মন্দিরে পূজা-অর্চনা, শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা, গীতাযজ্ঞ, জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা, পদাবলী কীর্তন ও তারকব্রহ্ম হরিনাম কীর্তনের মাধ্যমে কৃষ্ণ প্রীতি লাভের নিমিত্তে ঘরে ঘরে ভক্তরা উপবাসে ব্রতী হন। মহাভারতের তিনি অর্জুনের মাধ্যমে গীতায় ১৮টি অধ্যায়ে জাগতিক জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি, বিভূতি, মুক্তি, যশ, খ্যাতি, অর্থবিত্তের মায়াজাল, অন্যায়, অসত্য, পাপ, আত্ম-অহংকার ও মোক্ষলাভ প্রভৃতি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। জীবকুলে তিনি তমোগুণ ও অসৎ কাজের প্রভাব দূর করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও ধর্মনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ-তত্ত্বজ্ঞ রূপে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। জীবনে তিনি সত্যের বাণী প্রতিষ্ঠা করেছেন। জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের সহিত আমাদের চিন্ময় সম্পর্ক গড়ে উঠুক এটাই হোক একমাত্র ব্রত।

 




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: