সর্বশেষ আপডেট : ৭ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

অভিমান নিয়ে চলে গেলেন প্রিয় শফিক ভাই

মুকতাবিস-উন-নূর ::

এক মাসের ব্যবধানে আমার দু’জন প্রিয় মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আ.ফ.ম. কামাল বিদায় নিলেন গত ১৩ জুলাই। আর গত বুধবার (১৪ আগস্ট) বিদায় নিলেন আ.ন.ম. শফিক। দু’জন সমবয়সী ছিলেন এবং তারা উভয়েই বয়সে আমার ১০/১২ বছরের বড়ো ছিলেন। তদুপরী তাদের উভয়ের সাথে আমার অন্তরঙ্গতা ছিলো, ছিলো বন্ধুত্ব। দু’জনই আমার ‘সিনিয়র ফ্রেন্ড’।

আ.ন.ম শফিকের সাথে চলাফেরা উঠাবসা সূত্রপাত ১৯৮৫ সাল থেকে। আমি তখন সিলেট প্রেসক্লাবের সেক্রেটারী। এরপর সময়ে সময়ে সে সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। বিশেষ করে মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ঘনিষ্টতা অন্তরঙ্গতায় রূপ নেয়। শফিক ভাই ছিলেন সামাদ আজাদ সাহেবের ডান হাত। আর আমিও সামাদ আজাদ সাহেবের প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামীলীগ বিরোধী দলে অবস্থান নিলেও সামাদ আজাদ সাহেবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অটুট ছিলো, যার কারণে শফিক ভাই’র সাথেও সম্পর্ক যথাপূর্বং থাকে। সামাদ আজাদ সাহেবকে আমি পছন্দ করতাম, শ্রদ্ধা করতাম তাঁর উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। অন্য সবার মতো আমিও তাকে ‘লিডার’ সম্বোধন করতাম। সেই প্রিয় লিডারের ভাবশিষ্য ছিলেন আ.ন.ম শফিক। ফলে ‘লিডার’ এর উদার দৃষ্টি ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা শফিক ভাই’র মধ্যে ফুটে উঠে।

পরবর্তীতে আমি সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হলাম। শফিক ভাইও আওয়ামীলীগের সভাপতি হলেন। শফিক ভাই আমাকে বললেন, ‘নূর ভাই আমরা দু’জনই বিশ্বনাথের, আমাদের নানা বিষয়ে একমত থাকতে হবে। বলতে দ্বিধা নেই, আমি কিছুটা আঞ্চলিকতাবাদী বটে, তাই শফিক ভাই’র প্রস্তাবকে আমি সব সময় গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি।
শফিক ভাই’র কর্মজীবন শিক্ষকতা দিয়ে শুরু। সংবাদপত্রের সাথে তার কিছুটা সংশ্লিষ্টতা ছিলো তাই তিনি রাজনীতির মাঠে কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলেছেন। সিলেটের রাজনৈতিক ময়দান দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশ কয়েক বছর আলাদা ছিলো।

রাজনৈতিক হানাহানি এখানেই খুব কম হয়েছে। সিলেটের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের অন্যতম প্রধান নায়ক আ.ন.ম শফিক। শফিক ভাই-শামীম ভাইয়ের ঐকান্তিক সহযোগিতায় সিলেটের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সিলেটে শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা দুরীকরণে ২ বছরের জন্য ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হয়। এক্ষেত্রে সিলেট প্রেসক্লাব তথা সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ উদ্যোগীর ভূমিকায় ছিলেন। একইভাবে শাবি’র নামকরণ বিরোধী আন্দোলনের পর এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমাকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিলেন আ.ন.ম শফিক ভাই। শফিক ভাই রাজনীতি করতেন, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক বৃত্তে বন্দী ছিলেন না।

শফিক ভাই ছিলেন তীক্ষè বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। যে কোন পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার সক্ষমতা তার ছিলো। ফলে তিনি সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। শফিক ভাই সাদামাটা চলতেন। কথা বলতেন হাসিমুখে। ভিন্নমতের রাজনীতিবিদদের খোঁজখবর নিতেন। শেষ জীবনে এসে তিনি দলীয় রাজনীতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। আজীবন কর্মমুখর শফিক ভাই, তখন সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতির সূতিকাগার কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদকে নিয়ে সময় কাটান। সেখানেও তার উদার মনোভাবের কারণে তিনি ভিন্নমতের মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা অর্জন করেন এবং গত বছর তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন।

সুস্থ থাকাকালে শফিক ভাই’র সাথে মাঝে মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হতো। কোন সময় তিনি আমার অফিসে আসতেন। কোন সময় আমি তাঁর বাসায় যেতাম। অসুস্থ হয়ে ভারতে যাওয়ার আগে একদিন আমার অফিসে এলেন। মুসলিম সাহিত্য সংসদ সহ নানা বিষয়ে দীর্ঘসময় কথা হলো। এরপর চিকিৎসার্থে ভারত যাওয়ার সময় ফোন করে দোয়া চাইলেন।

ভারত থেকে ফেরার পর সামান্য সুস্থ হলেও পরবর্তীতে ক্রমাগত অসুস্থতা বাড়তে থাকলো। বিদেশে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসার যথেষ্ট সঙ্গতি শফিক ভাই’র ছিলোনা, তাঁর আশা ছিলো বড়ো সরকারী সহায়তার। কিন্তু তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো না। শেষ অবধি গত রমজান মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে শফিক ভাই’র চিকিৎসার জন্য ৫ লক্ষ টাকা দেয়া হয়। কিন্তু সে টাকা শফিক ভাই’র চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট ছিলো না। আর রোগের জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় সেরে উঠার সম্ভাবনাও স্থিমিত হয়ে পড়ে।

আর এভাবেই অভিমান নিয়ে নীরবে চলে গেলেন শফিক ভাই। শফিক ভাই এখন মহাকালের বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শোকাহত। এটা সকলের ভাগ্যে জুটেনা। শফিক ভাই প্রমাণ করে গেলেন, উদারতা পরমত সহিষ্ণুতা দিয়ে মানুষের অন্তরে স্থায়ী আসন করে নেয়া যায়। এটাই একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত সফলতা-সত্যিকার প্রাপ্তি।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জালালাবাদ





নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: