সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ৫১ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাঘের উপত্যকায়!

শিমুল খালেদ:: খেয়া নৌকায় নদী পার হলেই হাঁটা পথ। ধূলাময় মেঠোপথ ধরে একটু এগুলেই ছোট একটি সেতু। তার পাশে গাছতলায় জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসি। দুই পাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত। সঙ্গী জুবায়ের আঙুলের ইশারায় একটা ধানি জমি দেখিয়ে বলল, ঠিক এই জায়গাটিতে বাঘ মারা হয়েছিল! শীতের শুরুর দিকের ঘটনা। এক রাখাল বেরিয়েছিল গরুর খোঁজে। আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে নলখাগড়ার ঝোপে চোখে পড়ে কিছু একটার নড়াচড়া। গরু মনে করে এগিয়ে যায় সে। তার পরই চক্ষু চড়কগাছ।

ভীতসন্তস্ত্র চেহারায় ছুটে গ্রামে পৌঁছে খবর দেয়, নলখাগড়ার ঝোপে বাঘ লুকিয়ে আছে। দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চারপাশ থেকে ঝোপ ঘিরে ফেলা হয়। বাঘটি আর পালাতে পারেনি। খবর শুনে কয়েক মাইল হেঁটে দেখতে এসেছিল জুবায়ের। ওর গল্প শুনে মনে পড়ল কয়েক বছর আগে এখানেই একটি বাঘ ধরা পড়েছিল। পত্রিকায় বেরিয়েছিল খবরটা। মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা উপত্যকার নুনাছড়া চা বাগানে ধরা পড়েছিল বিরল প্রজাতির একটি ব্ল্যাক প্যান্থার। সিলেটের কানাইঘাটের লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল। চিতা বিড়াল ধরা পড়ার খবরও পত্রিকায় পড়েছিলাম কিছুদিন আগে।

বন্ধু জুবায়েরদের আরেকটি বাড়ি ডোনা উপত্যকার গহিনে। সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকার বাড়িটিতে পরিবারের কয়েকজন থাকেন। কয়েক কিলোমিটার চড়াই-উতরাই ট্রেইলের হাঁটা পথ। বাড়িতে আছে কমলার বাগান। ভাগ্য ভালো হলে বন্য প্রাণী দেখার সুযোগও হতে পারে। ধুলাময় মেঠোপথ, পাথরের বোল্ডার ছড়ানো বন্ধুর ট্রেইল, জলাভূমির নলখাগড়ার ঝোপ, ধানক্ষেতের আল, নড়বড়ে সাঁকো পেরিয়ে ক্লান্ত শরীরে ওদের বাড়িতে পৌঁছলাম। দেশি মুরগির সুস্বাদু সালুনে পেটপুরে খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম।

বছর পঞ্চাশেক আগে রাতে এখানে প্রায়ই বাঘের গর্জন শোনা যেত। সন্ধ্যার পর কেউ খুব একটা বাইরে বের হতো না। এখনো বাঘের আনাগোনা কদাচিত শোনা যায়। সীমান্ত একেবারে কাছে হওয়ায় মেঘালয় পাহাড় থেকে বাঘসহ বন্য প্রাণীরা নেমে আসে। কিছুদিন আগেও পাহাড়ের ঢালে ভোরবেলা বাচ্চাসহ মা হরিণকে ঘাস খেতে দেখা গেছে। মেঘালয় পাহাড়সংলগ্ন কানাইঘাট উপজেলার এসব এলাকা একসময় ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের অধীন। পাহাড়, টিলা, ঝোপ-জঙ্গল আর উপত্যকার নলখাগড়ার বনে ঘেরা এলাকায় শীতকালে বাঘ নেমে আসত। রাজার আদেশে তখন বাঘ মারতে পারা ছিল দারুণ বীরত্বের ব্যাপার। বাঘ শিকারের আয়োজন হতো ঢাকঢোল পিটিয়ে। আশার কথা, সেই চল এখন আর নেই। এলাকায় বাঘ আসার খবর পেলে জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে ধরা হয়। এই পদ্ধতির নাম ‘বাঘ কেওড়’।

পরদিন ঘুম ভাঙল বেশ সকালে। পুব আকাশ ফুঁড়ে সূর্যের আলো সবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে উপত্যকার বুকজুড়ে। শিশির ভেজা ঝরাপাতা মাড়িয়ে ওঠে গেলাম বাড়ির পেছনের টিলার চূড়ায়। টিলাময় সুপারিগাছের বাগান। ভেজা ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে পাকা সুপারি ঝরে পড়েছে। কমলার পাতা শিশিরে নেয়ে চিকচিক করছে। টিলার পূর্বপাশে যেখান থেকে ঘন জঙ্গল ঢাল বেয়ে নেমে গেছে, সেখানে খানিকটা ফাঁকা। এ জায়গাটিতেই একটি ছাগল বাঁধা ছিল। টিলার নিচে পুকুরপারে বসে গল্প করছিল জুবায়ের ও পরিবারের সদস্যরা। হঠাত ছাগলটির গগনবিদারী আর্তনাদ। তারা দৌড়ে এসে দেখে, ছাগলের গলা কামড়ে ধরে আছে একটি বাঘ! তাদের দেখে কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়ায় বাঘটি। তারপরই ঝাঁপ দেয় ঝোপের ভেতর। ততক্ষণে মারা গেছে ছাগলটি। গা শিউরানো সেই গল্প শুনতে শুনতেই উঠান থেকে চা-নাশতার হাঁক।

নাশতা শেষে গাছ থেকে কমলা পাড়ার তোড়জোড়। গাছে চড়ে বাঁশের কাঠি দিয়ে টেনে ডাল থেকে পাকা কমলা পেড়ে রাখা হয় ঝুড়িতে। কিছু কমলা একটু ঝাঁকুনিতেই ঠুস করে খসে পড়ে মাটিতে। ফাটা খোসার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে টসটসে তাজা রস। গাছতলায় বসে তাজা কমলার স্বাদ নিই আমরা। কমলা বাগানের পরই টিলার ন্যাড়া পাদদেশ। জমিটিতে একসময় আনারস বাগান ছিল। রাতে শজারু, বন্য শূকর আর দিনে বানরের পাল পুরো বাগান সাবাড় করে ফেলেছে। শূকরের উতপাতে কচু, আনারস এসব কন্দজাতীয় উদ্ভিদও এখানে চাষ করা মুশকিল। তবে বন্য শূকর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ধানের। ধান পাকার সময় তাই ক্ষেতের মাঝে মাচাঘর বানিয়ে রাতের বেলা পাহারা দেয় এখানকার বাসিন্দারা।

পরের গন্তব্য রাতাছড়া খাসিয়াপুঞ্জি। পথে দূর থেকে চোখে পড়ে পুঞ্জির পাহাড়ে মাথা উঁচু করে থাকা সুপারি বাগান। হলদেটে মাটির পথ উঠে গেছে পাহাড়ের মাথায়। খাসিয়াদের তকতকে পরিষ্কার ঘর-বারান্দা। পথের মাঝে একটি গির্জা। পাশে বড় বড় পাথরের চাঁই। নানা জাতের পাহাড়ি ফুল, লম্বা লেজ আর ঝুঁটির মোরগ, পানের বরজ আর কথাবলা পোষা পাহাড়ি টিয়া পাখি মন জুড়িয়ে দেয়।

বিকেলবেলা বের হলাম ডোনার একমাত্র বাজারের উদ্দেশে। ডোনা বাজারে পৌঁছার আগেই অন্ধকার নেমে এলো। সন্ধ্যার পর বাজারটি বেশ জমে ওঠে। গরম পেঁয়াজু আর চায়ের কাপে শীত তাড়ানোর সঙ্গে গল্প জমে ওঠে।

কিভাবে যাবেন?
বাসে কিংবা ট্রেনে সিলেট এসে তারপর জকিগঞ্জগামী বাসে আটগ্রাম বাজার। সেখানে সুরমা নদীর খেয়াঘাটে খোঁজ করলে গাইড পাওয়া যাবে। থাকার সুব্যবস্থা নেই, তাই দিনে দিনে ফিরতে হবে।




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: