সর্বশেষ আপডেট : ৫ ঘন্টা আগে
সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

জীবন ও জীবিকা: সংবাদপত্রকে সঙ্গী করেই মোমিনের দিনযাপন

জীবন পাল:: ’আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বইটি বিক্রি করে দিন শেষে অনেকটা আনন্দ পেয়েছিলেন আব্দুল মোমিন। একদিনেই প্রায় ২০০ কপি বই বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে বইয়ের মূল্য ছিল আনুমানিক ৩টাকা।
তাই শুধুই আনন্দ নয়,সেই দিনটিকে উপভোগ করেছিলেন তিনি। যার কারণে দিনটিকে নিজের জীবনের স্মরনীয় একটি দিন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন তিনি। ৬৯-এ বঙ্গবন্ধু যেদিন সিলেট আসেন,সিলেট ষ্টেডিয়ামে ভাষন দেন সেদিনই এই স্বরনীয় দিনটি তার জীবনে উদাহরণ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

সেই ৬৯ সাল থেকেই একজন হকার হিসেবে আব্দুল মোমিনের সংবাদপত্র বিক্রির ব্যবসা শুরু। তখন পত্রিকার দাম ছিল ২৫ পয়সা। পুরো মাসে প্রতি গ্রাাহকের বিল হত সাড়ে ৭ টাকা। সব মিলিয়ে ১০০-১৫০ পত্রিকা বিক্রি করলে ২৫ পয়সা কমিশন প্ওায়া যেত। লোকাল পত্রিকা বলতে ছিল যুগভেরী। যা তখন ছিল সাপ্তাহিক। যার দাম ছিল ১২ পয়সা। তৎকালীন সময়ে ১০০ টাকা বিক্রি করলে সাড়ে ১২টাকা কমিশন পাওয়া যেত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গন্ধুকে গ্রেফতারের কারনে ৪ দিন পত্রিকা বন্ধ ছিল। ৪ দিন পর স্থানীয় পাকিস্থান প্রশাসন থেকে সিলেটের সকল এজেন্টকে সকাল ১০টার মধ্যে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। সকালে সকল হকারদেও উপস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন থেকে পত্রিকা বিলির নির্দেশ দেওয়া সাথে সাথে বিলিতে কোন সমস্যা হলে সহযোগিতারও আশ^াস প্রদান করা হয়। তখন পত্রিকার মধ্যে ছিল দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ,দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক মর্নিং নিউজ, দৈনিক অবজারভার। যুদ্ধ চলাকালীন সময় পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক দৈনিক ওয়াতান নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশিত হত,যা সারা দেখে থাকা পাকিস্থান আর্মিরা পড়তো। দেশ স্বাধীন হবার পর যে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর ভারত থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার, যুগান্তর,ইন্ডিয়া টাইমস পত্রিকা সিলেটে আসতো। এদিকে ৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্থান থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকাটি সিলেটে পাওয়া যেত। দেশের বাইরের পত্রিকাগুলো তখন ফ্লাইটে আসতো। এয়ারপোর্ট থেকে সংগ্রহ করতে হত । তখন প্রিন্টির দিক থেকে আমাদের দেশের পত্রিকার মানটাই ভাল ছিল বলে দাবি করছেন মোমিন।

বাবার অসুস্থতার কারণেই অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল আব্দুল মোমিনের। তাই সংসার চালানোর জন্যই অন্য দিকে না ঝুঁকে পত্রিকার হকারটাকে জীবন-জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এভাবে হকার হিসেবে সংবাদপত্র বিক্রি করতে করতে ১৯৮৩ সালে জিন্দাবাজারের হাজারী বিল্ডিংয়ে দোকান ভাড়া নিয়ে ’নিউজ ষ্টোর’ নামে পত্রিকার সাব-এজেন্ট হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন। দোকান ভাড়া ছিল প্রতি মাসে ৩০০ টাকা। ব্যবসা ভাল ছিল। তখন পত্রিকার দাম ছিল ১ টাকা।১৯৯০ সালে তা গিয়ে দাড়াতে থাকে যথাক্রমে ৩টাকা,৪.৫টাকায়। এর মধ্যে আব্দুল মোমিনের সেই দোকান ভাড়া পর্যায়ক্রমে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। প্রায় ১৫ বছর সেই বিল্ডিংয়েই ব্যবসা চালিয়ে গেছেন । অত:পর ১৯৯৬ সালে জিন্দাবাজারের বক্স বিল্ডিংয়ে ১২০০ টাকা ভাড়ায় নতুন দোকান নেন। পারিবারিক পরিচিতির কারনে সেই সময় নতুন দোকানটির জন্য কোন এডভান্স করার প্রয়োজন হয়নি মোমিনের। ১৯৯৬থেকে ওয়ান ইলেভেন পর্যন্ত ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে গেছেন। তারপর দোকান কিনে নেন। তখন পত্রিকার জগতে চলতে থাকে ভোরের কাগজ,ইনকিলাব,বাংলাবাজার,ইত্তেফাক মত পত্রিকা। তারপর সময়ের সাথে সাথে আসতে থাকে নিত্য-নতুন পত্রিকা। পরবর্তী দেড়-২ বছর পর প্রায় সব পত্রিকার দাম ৭-৮ টাকা হয়ে যেতে থাকে। তবে পত্রিকা বাড়ার সাথে সাথে পত্রিকার ব্যবসাটাও কমতে থাকে বলে মনে করেন আব্দুল মোমিন।

এদিকে ১৯৯৮ সালের দিকে একবার বিদেশ যাবার ভুত চাপে আব্দুল মোমেনের। গন্তব্য ছিল মালেশিয়া। তখন ৩০-৪০ হাজার টাকায় মালেশিয়া যাওয়া যেত। কিন্তু মোমিন দালালকে ধরায় সেখানে তাকে গুনতে হয়েছিল ৫০-৬০ হাজার টাকা। বিদেশ যাওয়ার চক্করে পত্রিকা ব্যবসা অন্য একজনকে দিয়ে ৩ মাস বেকার সময় কাটান তিনি। অত:পর দালালের খপ্পরে পড়ে দালালকে দেওয়া ৫০-৬০ হাজার টাকায় ধরা খেয়ে বিদেশের ভুত মাথা থেকে ঝেড়ে পুনরায় নিজ ব্যবসায় মনোযোগ দেন।

মো. আব্দুল মোমিন এর বর্তমান বয়স ৫৮। ৪ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে রোশান আহমদকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছাটা পূরন করতে মালদ্বীপ পাঠিয়েছেন। মেয়ে রিমা আক্তারকে এস.এস.সি পর্যন্ত পড়িয়ে ভাল সমন্ধ পাওয়ায় বিয়ের শুভ কাজটি সেরে ফেলতে দেরি করেননি। অন্য সন্তানদের মধ্যে সুমন আহমদ ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে সিলেটের সিলনেট কোম্পানীর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে কর্মরত আছেন। আর ইমন আহমদ ডিগ্রি সম্পন্ন করার আগ মুহুর্তেই বাবার মতই বিদেশ পাড়ি দেওয়ার চিন্তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখায় অন্য ভাইদের মত গ্র্যাজুয়েশনের দিকে এখন পর্যন্ত মনোযোগী হতে পারেননি। ছোট ছেলে পাভেল আহমদ বর্তমানে ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত।
সংবাদপত্রের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখে যেহেতু জীবন চালিয়েছেন । সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করেছেন। সন্তানরা সংসারের হাল ধরেছেন। সবাই যেখানে এখন প্রতিষ্ঠিত। সেখানে সন্তানদের শত বারন থাকলেও সংবাদপত্রকে সাথে নিয়েই জীবনের শেষ সময়টা কাটাতে চান আব্দুল মোমিন।
বর্তমানে সংবাদপত্র বিক্রির ব্যবসাটা আগের মত লাভজনক না হওয়া স্বত্তেও মূলত সময় কাটাতে এবং মানুষের হাতে প্রতিদিনের খবরের কাগজ তুলে দিতেই জিন্দাবাজারের নিজস্ব ’নিউজ ষ্টোর’ এ বসেন আব্দুল মোমিন।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: