সর্বশেষ আপডেট : ৫ ঘন্টা আগে
সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

জীবন ও জীবিকা: একটি স্কুল আঙ্গিনা; করিমের বেঁচে থাকার শক্তি

জীবন পাল:: ১৯৬৪ সালে সিলেট নগরীর দি এইডেড হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তিনি। গফুর স্যার, বারি স্যার,অবনি স্যার ছিলেন যার প্রিয় শিক্ষকদো মধ্যে কয়েকজন শিক্ষক। আর কুয়ারপারের বাচ্চু, ইন্ডিয়া পাড়ি দেওয়া মধু বাবুর ছেলে কুমার, আবুল বাছিদ, তাহির মিয়া ছিলেন প্রিয় বন্ধু তালিকার কয়েকজন বন্ধু। যাদের মধ্যে তাহির মিয়া আজ আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই আব্দুর করিমের বাবা,মা। বয়সের ভারে ও অসুস্থ্যতায় এর মধ্যে হারিয়েছেন ভাই-বোনদের। তবে ৮২ বছর বয়সেও এই বয়সী অন্যদের থেকেও নিজেকে অনেকটাই সুস্থ্য ও সবল মনে করছেন মো. আব্দুল করিম।

মো. আব্দুল করিমের বর্তমান বয়স ৮২ বছর। অভাবের কারণে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর পর পড়ালেখার ইতি টেনে নিজ স্কুলেই শুরু করেছিলেন বাদাম,চানা,আচারের ব্যবসা। সেটা সেই ১৯৬৭ সালের কথা। মায়ের জমানো ১টাকা ২০ আনা দিয়ে যে ব্যবসার শুরু। তখন বাদামের সের ছিল ৪ আনা। প্রতিদিন বিক্রির জন্য বাদাম ভাজা হত ৪ থেকে ৫ সের। যেখানে ৩থেকে ৪ সের বিক্রি করাটা অনেক কষ্টকর ছিল। তবে প্রতিদিন স্কুলে ২থেকে আড়ায় সের বাদাম নাকি অনায়াসেই বিক্রি করে ফেলতেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সিলেট ছিলেন করিম। স্বাধীনতার ৩ মাস আগে পরিস্থিতি অনেকটা খারাপ হওয়ায় এক রকম বাধ্য হয়েই নাম লেখান স্বরনার্থীদের খাতায়। পাড়ি জমান শিলচরের ফটিকবাজারে। উঠেন আত্মীয়ের বাড়িতে। দেশ স্বাধীন হবার পর জানুয়ারীর ১২/১৪ তারিখের দিকে দেশে ফেরেন। শুরু করেন পুরনো ব্যবসা। দেশের অবস্থা খারাপ থাকার কারনে ব্যবসাটাও তেমন ভাল চলতো না। অনেক কষ্টেই সেই দিনগুলো অতিবাহিত করতে হয়েছে ।

তবে কষ্টের কাছে হার মানতে কখনো প্রস্তুত ছিলেন না করিম। কষ্টের সাথে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা যার ছোট বেলা থেকেই সে কি কখনো কষ্টের কাছে হার মানতে পারে? ৩ ভাইসহ করিমের মাকে বিয়ে করেছিলেন করিমের বাবা হাসান বক্স। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যৃর পর সম্পত্তি দেখভালের জন্যই করিবের বাবার এই দ্বিতীয় বিয়ে করা। কিন্তু সম্পত্তির লোভে দ্বিতীয় বিয়েটি মেনে নিতে পারেননি করিবের প্রথম মায়ের ৪ ভাই-২ বোন। যে কারনে বাবার মৃত্যুর পর করিমের মাসহ ৩ ভাইকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় প্রথম মায়ের ভাই-বোনেরা।
আর কারো করুনার পাত্র হতে না চাওয়ায় মা ও ৩ ভাইকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে সিলেটের কুয়ারপাড়ের মামার বাসায় পাড়ি জমায়। সেই থেকে সিলেটের বাসিন্দা হয়েই করিমের বেড়ে ্ওঠা। সে কারনে শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সুনামগঞ্জের বীরগাও ইউনিয়নের সলফ গ্রামে করিমের খুব একটা বেশি সময় কাটেনি।

১৯৩৮ সালের মে মাসে বিয়ে করেন আব্দুল করিম। যার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে-রুবেল আহমদ নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। আর ছোট ছেলে জুবের আহমদ, মেট্রিক খারাপ করায় আর পরীক্ষা দিতে রাজি হয়নি। অত:পর করিম উল্লাহ মার্কেটে ব্যবসা শুরু। আর মেয়ে রুমা আক্তারকে পড়িয়েছেন এইচ,এস.সি পর্যন্ত। বিয়ে দিয়েছেন বিয়ানীবাজারে। বর্তমানে মেয়ে ্ও মেয়ের জামাই দুজনেই সিলেট সিটি করপোরেশনে চাকুরী করেন।

আব্দুল করিমের সন্তানেরা চাননা তাদের বাবা এই ব্যবসা করুক। কিন্তু সন্তানদের সকল বাঁধা অমান্য করে এই স্কুলেই ছুটে আসেন করিম। স্কুলে না আসলে নাকি তিনি অসুস্থ্য হয়ে যাবেন। ৫২ বছর ধরে এই স্কুলে এই ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। এই ৫২ বছরে ¯ু‹লের পড়াশোনা শেষ করে কত ছাত্র ভাল ভাল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ ডাক্তার,কেউবা ইঞ্জিনিয়ার আবার কেউবা জজ-ব্যারিষ্টার। তবে অনেকের অনেক সফলতা নিজের চোখে দেখলেও নিজেকে কখনো ব্যর্থ ভাবতে চাননা করিম। তার মতে,নিজেকে পরের অধীনে রাখার মধ্যে স্বাধীনতা নেই। নিজের স্বাধীনতার জন্য এয়ারফোর্সে লোড-আনলোডের চাকুরী পেয়েই মাত্র ১৫ দিন চাকুরী করে ছেড়ে চলে এসেছিলেন তিনি।
ডায়াবেটিস,প্রেসার নিয়েই জীবনযুদ্ধ করে যাচ্ছেন তিনি। গত ৪ বছর ধরে খিচুরী,চানাভ’না,আলুর চপ বিক্রি শুরু করেছেন। নিজের রুটিনের মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন সকাল ৮টা ৩০মি. স্কুলে আসা,বিকাল সাড়ে ৩টায় বাসায় যাওয়া, নামাজ পড়া তারপর সন্ধ্যায় মালামাল কিনতে বাজার যাওয়া। রাতে খেয়ে ঘুম। সকালে ভোরে উঠা। ভোর ৪টা- সকাল৮টা পর্যন্ত দোকানের রান্নাবান্না।

আব্দুর করিমের মনে করেন, এসব বক্রি করে খেয়ে-দেয়ে বেঁচে চলার দিন আর শেষ । সেই সময় বা বয়সও নেই। কিছু করতে পারেননি। তবে ছেলে-মেয়েদেও মানুষ করেছেন। তরুনদের ধন-সম্পদ কওে কেউ নিয়ে যেতে পারেনা, তাই এখনের তরুনদেও অল্পে সন্তোষ্ট থাকার অভ্যাস করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

করিমের মতে, আগের কাস্টমার আর এখনের মধ্যে রাতদিন ব্যবধান । আগের দিনে ১ থেকে দেড় টাকায় রোজ চাল,ডাল নিয়ে যাওয়া য্ওায়া যেত।

বর্তমানে দৈনিক ১০০০-১২০০ টাকা আয় হয়। যেখানে ঝড়বৃষ্টির দিনে ব্যবসা নেমে আসে ৪০০-৫০০ টাকায়। কিন্তু তবু যেন কোন কিছুর মধ্যে সন্তুষ্ট কিংবা আগের দিনের মত শান্তিটা নেই। স্কুল বন্ধ থাকলে ছোট ছেলে সংসার চালায় । তবে আমি কোনদিন কারো উপর ভরসা করিনি। নিজের বল হচ্ছে সব থেকে বড় । পরের উপর ভরসা,আশা করাা ত্যাগ করতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে।

করিমের এক বোন মৃত্যুও আগ মুহুর্ত পর্যন্ত লন্ডন ছিলেন। সেই বোনের ছেলে-মেয়েরা এখন লন্ডন আমেরিকায় থাকেন। কিন্তু নিজ পেশাকে অনেক সম্মান করেন করিম। আর হাত পাতাটাকে সব চেয়ে ঘৃণা করেন তিনি।

আব্দুর করিমের বাবা হাসান বক্স ১২০ বছর বেচে ছিলেন। মা জমিনা খাতুন বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮০ বছর। আর করিমের বর্তমান বয়স ৮২ বছর। করিমের মতে, আল্লাহর কাছে দোয়া যাতে ভাল ভালই মাটিতে মিশে যেতে পারি ।
তবে একটা কথা না বললে নয়, এই স্কুল ছেড়ে দিলে আমি মারা যেতাম। এই স্কুলে না আসলে ভালই লাগেনা। এখানে আসলে বাচ্চাদেও সাথে ঢং কওে সময় কেটে যায়। না হলে অসুস্থ্য হয়ে যেতাম । লাভ হউক আর না হউক,এখানেই আমার সকল আনন্দ।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: