সর্বশেষ আপডেট : ১৭ মিনিট ১৭ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ফরেনসিক রিপোর্টে মিজান-বাছিরের ঘুষ লেনদেনের সত্যতা মিলেছে

নিউজ ডেস্ক:: ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক বাছিরের মধ্যে কথোপকথনের সত্যতা মিলেছে! দু’জনের মধ্যে একদিন নয়, একাধিকবার কথা হয়েছে।

‘এসএমএস’ বিনিময় হয়েছে বহুবার। ডিআইজি মিজান দুদক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার জন্য একটি ফোন ও সিমকার্ড কিনে দেন। বডিগার্ড হৃদয়ের নামে এ ফোন সেটসহ সিম কেনা হয়। সেই নম্বরেই দু’জনের মধ্যে বহুবার কথা হয়েছে।

দেখা হয়েছে একাধিকার। দু’দফায় ঘুষ বিনিময় হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। সেই টাকা একটি বেনামি হিসাবে কিভাবে রাখা যায় পরিচালক সেই পরামর্শও চেয়েছিলেন ডিআইজি মিজানের কাছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। রোববার (২৩ জুন) যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন মিজান মালিক।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও দুদক আইনে ঘুষ দেয়া-নেয়া দুটোই সমান অপরাধ। বিশেষ করে কাউকে যদি পরিকল্পনা করে ঘুষের ফাঁদে ফেলা হয়, তাহলে যিনি এ কাজটি করেছেন তিনিও একই ধারায় আসামি হিসেবে সাব্যস্ত হবেন।

দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় (ক্ষমতার অপব্যবহার) দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা এমনকি বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারেরও ক্ষমতা আছে দুদকের হাতে। এখন দুদকের অনুসন্ধান টিম দু’জনের অডিও রেকর্ডসংক্রান্ত ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এ সপ্তাহেই রিপোর্টটি পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে।

দুদকের এক পদস্থ কর্মকর্র্তা জানান, অডিও রিপোর্ট হাতে আসার পর দু’জনকে তলব করে ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দুদকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন বিতর্কিত করার জন্য এমনটি করা হল এ প্রশ্ন থাকবে প্রথমে। এরপর পর্যায়ক্রমে দু’জনকেই জেরা করা হবে অভিযোগের বিষয়ে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পরই অনুসন্ধান টিম কমিশনে সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে।

সূত্র জানায়, ঘুষ কেলেঙ্কারি ঘটনায় গঠিত নতুন অনুসন্ধান টিম দায়িত্ব নেয়ার পর দু’জনের মধ্যে কথোপকথনের সব রেকর্ড সংগ্রহ করে। কোন টেলিভিশনে ডিআইজি মিজান কি ধরনের অভিযোগ করেছেন বা বক্তব্য দিয়েছেন সেসব তথ্যও সংগ্রহ করে টিম।

পরে ১৬ জুন দুদকের টিম সব রেকর্ড ও দু’জনের কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা করতে বিশেষায়িত সংস্থা এনটিএমসির কাছে পাঠায়। ওই সংস্থা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ফরেনসিক পরীক্ষা করে।

পরীক্ষায় দু’জনের কণ্ঠ মিলেছে বলে সূত্রটি আভাস দিয়েছে। তবে পরীক্ষাসংক্রান্ত রিপোর্ট এখনও দুদককে সরবরাহ করা হয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে তা দুদককে দেয়া হতে পারে।

ডিআইজি মিজান ও পরিচালক এনামুল বাছির কোন টাওয়ারের অধীনে ছিলেন বা কথা বলেছেন, কি ধরনের এসএমএস বিনিময় করেছেন, কতদিন কথা বলেছেন সব কিছু নিয়ে আসা হয় পরীক্ষায়। এ কারণে ওই সংস্থার রিপোর্ট কিছুটা বড় হতে পারে।

পরিচালক এনামুল বাছির জোর গলায় বলেছিলেন, তিনি ডিআইজি মিজানের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে কথা বলেননি। তার কণ্ঠ নকল করা হয়েছে। কিন্তু দুদকের এক কর্মকর্তা বলছেন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিনি অসত্য কথা বলেছেন। তিনি বহুবার কথা বলেছেন ডিআইজি মিজানের সঙ্গে।

ঘুষ কোথায় দেয়া হবে, কখন দেয়া হবে সব কিছু তার সম্মতিতেই হয়েছে। ডিআইজি মিজান তাকে ফাঁসাতে এসব করছেন তিনি সেটিও বুঝতে পারেননি। পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজান এখন বলছেন, ‘জানুয়ারির ১১ তারিখের দিকে রমনা পার্কে আমার সঙ্গে বাছির দেখা করেন এবং ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন।

তিনি জানান, এর ফলে আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বাদ দেয়া হবে। ১৫ জানুয়ারি আমি তাকে ২৫ লাখ টাকা ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিলাম।’ সেই রেকর্ডও তার কাছে আছে বলে দাবি করেন। এও বলেন, এনামুল বাছিরই তাকে একটি টিঅ্যান্ডটি নম্বর দিয়ে কথা বলতে বলেন।

ডিআইজি মিজান ফোন করলে বাছির তার সঙ্গে রমনা পার্কে দেখা করতে বলেন। বডিগার্ড ও গাড়িচালককে নিয়ে ডিআইজি মিজান রমনা পার্কে বাছিরের সঙ্গে দেখা করতে যান। বাছির তাকে বলেন, তার ফাইলে যে কাগজপত্র আছে, তাতে তাকে (ডিআইজি মিজান) ধরার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু টাকা-পয়সা ছাড়া তিনি তার পক্ষে প্রতিবেদন দিতে পারবেন না। তিনি শুরুতে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে ৪০ লাখ টাকায় রফা হয়। ঘুষের টাকা দেয়ার পর ডিআইজি মিজান অনুসন্ধান প্রতিবেদন তার পক্ষে দেয়ার জন্য পরিচালককে চাপ দিতে শুরু করেন।

কিন্তু এরই মধ্যে ২৩ জুন পরিচালক ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগে মামলার সুপারিশসহ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেন। ২ জুন এনামুল বাছির ডিআইজি মিজানের সঙ্গে দেখা করতে পুলিশ প্লাজায় তার স্ত্রীর দোকানে গিয়ে জানান, কাজটা তিনি করতে পারেননি (অর্থাৎ তিনি মামলার সুপারিশ করেছেন)। এর ৭ দিনের মাথায় পরিচালককে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ ফাঁস করেন ডিআইজি মিজান।

সূত্র জানায়, টাকা নেয়ার পর ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাননি দুদকের পরিচালক এনামুল বাছির। টাকা নেয়ার পরও মামলার সুপারিশ করায় তিনি সেই টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডিআইজি মিজান তাতে রাজি হননি।

তিনি দুদক কর্মকর্তাকে ফাঁসাতেই এ পরিকল্পনা করেন। আর সেই ফাঁদে পা দেন পরিচালক বাছির। পরিচালক ভেতরে ভেতরে এতকিছু করেছেন কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার এমনকি ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাও আঁচ করতে পারেননি।

মিজানও কারও কাছে এ ধরনের কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেননি। বাছির ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও মামলার সুপারিশ নিয়ে গড়িমসি করায় পদস্থ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে জানতে চান। পরে তিনি কশিনের মনোভাব বুঝতে পেরে মামলার সুপারিশ করেন। ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনেন ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে।

এর আগে কথোপকথনের একপর্যায়ে পরিচালক বাছির ডিআইজিকে বলেন, তিনি চেয়ারম্যানের চাপে মামলার সুপারিশ করতে বাধ্য হন। এটি জানার পরই ডিআইজি মিজান ছক আঁকেন কিভাবে পরিচালকের ঘুষের বিষয়টি ফাঁস করে দুদককে বিতর্কিত করা যায়।

৯ জুন তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে সব ফাঁস করেন। একই সময়ে তার সঙ্গে দুদক পরিচালকের কথোপকথনের ক্লিপ তিনি গণমাধ্যমকে সরবরাহ করেন। সেটি সম্প্রচারের পরই অন্যসব গণমাধ্যম তাদের ঘুষ কেলেঙ্কারির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়।

বিষয়টি কমিশনও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। ওই দিনই (৯ জুন) দুদক সচিব মুহম্মদ দিলওয়ার বখতকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ওই কমিটি এনামুল বাছিরের জবানবন্দি গ্রহণ করে।

তাতে বাছির বলেন, তিনি নির্দোষ। ডিআইজি মিজানের সঙ্গে তার ঘুষ লেনদেন হয়নি। তার কণ্ঠ নকল করে একটি সিডি বানিয়ে ডিআইজি মিজান সেটি গণমাধ্যমে সরবরাহ করেছেন। এ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আসামির কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ আনে।

১০ জুন ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন পরিচালক এনামুল বাছিরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন। একই সঙ্গে ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দুদক পরিচালক মো. ফানাফিল্লাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আরও একটি কমিটি করে দু’জনের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য।

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, অনুসন্ধানে ঘুষের ঘটনা প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। একই কথা দুদকের অন্য কর্মকর্তাদেরও। তারাও বলেছেন, এ ধরনের ঘটনায় ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ভার প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না।

এদিকে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দু’জনের ব্যাংক হিসাব তলব করে দুদক বাংলাদেশ ব্যাংকে যে চিঠি দিয়েছিল এর প্রেক্ষিতে বেশ কিছু তথ্য এসে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এনামুল বাছিরের কোন হিসাবে টাকা গেছে সেই হিসাবেরও সন্ধান করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন আজ কমিশনে দাখিল হতে পারে বলে জানা গেছে। এতে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অন্তত ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হতে পারে।

এনামুল বাছিরের অনুসন্ধানে অনেক ফাঁকফোকর ছিল বলে জানান একজন কর্মকর্তা। তার প্রতিবেদনে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের টিমের ৭ দিনের অনুসন্ধানে আরও অন্তত ২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য বাড়তি মিলেছে।

ডিআইজি মিজান তার ভাগ্নের নামে সেগুনবাগিচায় যে বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট কিনেছেন তার চুক্তিমূল্য ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। নতুন টিম সেই তথ্য বের করে আনে। কিন্তু আগের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তা ছিল না। এমন আরও বেশকিছু সম্পদের তথ্য থাকছে প্রতিবেদনে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার আদালতে দুদকের আবেদনে ডিআইজি মিজানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

মিজান-বাছিরের কথোপকথনের অংশবিশেষ

ডিআইজি মিজান : আপনার জন্য কিছু বই এনেছি। এগুলোয় আইনের বইটই আছে।

এনামুল বাছির : নিয়া আসেন টাক… কোন ফর্মে আনছেন? বাজারের ব্যাগে… না…

ডিআইজি মিজান : বাজারের ব্যাগে।

এনামুল বাছির : এগুলা কি…

ডিআইজি মিজান : বই আছে এতে।

এনামুল বাছির : কি বই…

ডিআইজি মিজান : আইনের বইটই আছে… আমি আজকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আইনের বই কিনলাম।

এনামুল বাছির : …. ও।

ডিআইজি মিজান : বড় ভলিউম না… এই টোয়েন্টি ফাইভ তো। তেমন বড় ভলিউম না… সব এক হাজার টাকার নোট।

এনামুল বাছির : আচ্ছা…

দ্বিতীয় রেকর্ড
ডিআইজি মিজান : কমিশন আমাকে হ্যারেস করছে।

এনামুল বাছির : জি ইনক্যুয়ারি রিপোর্ট আমি দেখেছি… এটা একটা ভুয়া রিপোর্ট। …ওনারাও বুঝতেছেন আপনাকে ধরা যাবে না।

ডিআইজি মিজান : জি, ধরা যাবে না।

এনামুল বাছির : আমি আপনার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ চাই… এইটা হইল কথা। বাকিগুলো হইল…

ডিআইজি মিজান : …না না শুনেন আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮-১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।

এনামুল বাছির : এত সময় দেয়া যাবে না… আগামী সপ্তায়…

ডিআইজি মিজান : আচ্ছা…।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: