সর্বশেষ আপডেট : ১৫ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বন্দিরা ১৭০০ টাকা কেজি গরু ও ৬০০ টাকায় মুরগির মাংস খাচ্ছেন

কক্সবাজার কারাগার অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া

নিউজ ডেস্ক: কক্সবাজার জেলা কারাগারে লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কারাগারে আটক বন্দিদের নিকট এক কেজি গরুর কাঁচা মাংস বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। সেই সঙ্গে কাঁচা মুরগির মাংস বিক্রি করা হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০০ টাকা করে।

এত উচ্চ দামের মাংসের ক্রেতারা হচ্ছেন- আত্মসমর্পণ করা কোটিপতি কারাবন্দি ইয়াবা কারবারিরা।

কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলতে আদায় করা হয় জনপ্রতি ১২০০ টাকা করে। এর পরবর্তী মিনিট নেয়া হয় ১০০ টাকা করে।

কারাগারের ভেতর থাকা ক্যান্টিন ব্যবসায় প্রতিমাসে ৭০/৮০ লাখ টাকা লাভ হয়। এ ক্যান্টিনেই ২ টাকার শপিং ব্যাগ বিক্রি করা হয় প্রতি পিস ২০ টাকা।

সাধারণত দেশের প্রতিটি কারাগারে দুর্নীতি-অনিয়ম চলে আসলেও কক্সবাজার জেলা কারাগারের সাম্প্রতিক চিত্র ভিন্ন রকমের।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছে ৪ হাজার ২৬০ জন। এসব বন্দির মধ্যে শতকরা ৭০ জন অর্থাৎ তিন হাজারেরও বেশি রয়েছেন ইয়াবা কারবারি।

কারাকর্মীরা ইয়াবা কারবারিদের টার্গেট করে যেনতেনভাবে টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এমন কাজের খেসারত দিতে হচ্ছে অন্যান্য অপরাধে জড়িত সহস্রাধিক বন্দিদের।

বিশেষ করে গত ১৬ ফেব্রয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করা ১০২ জন কোটিপতি ইয়াবা কারবারি কারাগারে অবস্থানের পর থেকেই কারা অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বদলে গেছে।

আগে কারা অভ্যন্তরে সিট বেচাকেনার বিষয়টি অনেকটাই সহনশীল ছিল। কিন্তু ইয়াবা কারবারিদের কারণে এখন অন্যান্য মামলার বন্দিরা আর কোনো সিট কিনে থাকতে পারছেন না। কেননা কারবারিরা যে টাকা দিয়ে সিট কিনে কারাগারের ভেতর থাকতে পারছেন তা অন্যান্য বন্দিদের কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

কারাগারে পানির অভাব হওয়ায় আত্মসমর্পণ করা টেকনাফের হ্নীলা গ্রামের বাসিন্দা এক ইয়াবা কারবারি নিজেই ৭/৮ লাখ টাকা খরচ করে ২টি গভীর নলকূপও স্থাপন করে দিয়েছেন। বিনিমেয় ওই কারবারি কারাগারের ২০টি ওয়ার্ডের যেখানেই ইচ্ছা সেখানেই দিনরাত কাটাতে পারেন। নলকূপ স্থাপনকারী কারবারির কদরও কারাগারে এখন অন্যরকমের। তিনি কারারক্ষীদের নিকটও বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছেন। কেননা নলকূপের পানি নিয়েও চলছে ভালো বাণিজ্য।

জেলা কারাগারের ভেতর ভিতর বর্তমানে ২০টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ড মিলে রয়েছে ৫টি ক্যান্টিন। তদুপরি ওয়ার্ডের বাইরে কারা ফটকেও রয়েছে আরো একটি ক্যান্টিন। ক্যান্টিনগুলোই মূলত কারাবন্দি মানুষগুলোকে জিন্মি করে টাকা উপার্জনের বড় ফন্দি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কারাগারের পুরনো বিশ্বস্ত বন্দিদের সহায়তায় রক্ষীরাই ক্যান্টিনগুলো নিয়ে গলাকাটা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। খাবার দাবার থেকে শুরু করে একজন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যই ক্যান্টিনে থাকে। তবে দাম বাইরের বাজারের ৩/৪ গুণ বেশি। বন্দিদের স্বজনরা বাইর থেকে কোনো পণ্য নিয়ে ভেতরে দিতে পারবে না। যাই দিতে হয় তার সবই কারাগারের ক্যান্টিন থেকে কিনে দিতে হবে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি রাজনৈতিক মামলা থেকে জামিনে মুক্ত কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা আবুল কাসেম কালের কণ্ঠকে জানান- ‘কোনো না কোনো কারণে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার বিশেষ সখ্য ছিল। আমি নিজেও ক্যান্টিন পরিচালনায় তাদের একদম কাছে থাকতাম।

আমার জানা মতে কেবল জানুয়ারি মাসেই ক্যান্টিনে নীট মুনাফা এসেছিল ৪৫ লাখ টাকা। আর ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন ইয়াবা কারবারি কারাগারে ঢুকার পর থেকেই মাসিক আয় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হতে বাধ্য।’ কেননা ইয়াবা কারবারিদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিজেদেরই কয়েকজন মিলে রান্না করে খাবারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই তাদের কয়েকগুণ বেশি দামে মাংস কিনে নিতেও গায়ে লাগছে না।

ঈদের তিনদিন আগে জেলা কারাগার থেকে একটি মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া দিদারুল আলম নামের কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার একজন প্রবাসী জানিয়েছেন, কারাগারের ভেতর ইয়াবা কারবারিদের এক ভিন্ন রকমের প্রভাব চলছে। এ প্রভাবের কারণে কষ্টে আছেন রাজনৈতিক কারণের মামলাসহ বিভিন্ন মামলার কারাবন্দি আসামিরা।

এই প্রবাসী নাগরিক বলেন- ‘কারাগারের হাসপাতাল থেকে আমদানি ওয়ার্ডসহ সবখানেই ইয়াবা কারবারিরা টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখেন। তাদের অবৈধ টাকার কাছে অন্যান্যরা অসহায়।’ তিনি জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডে সিট নিয়ে রয়েছেন কক্সবাজার শহরের শাহজাহান আনসারী ইয়াবা ডন। তার জন্য প্রতিদিনই তিন বেলা বাসা থেকে ভাত যায় কারাগারে।

র‌্যাবের হাতে ৪টি অস্ত্র নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া একজন সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির তিন ভাই সহ ৫ জন কোটিপতি কারাগারের ৩ নম্বর সেলের ২ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। তারা জনপ্রতি মাসিক ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে এমন সুযোগ নিয়েছেন। ওয়ার্ডটির বিশেষ সুযোগ হচ্ছে টাইলস করে দেওয়া হয়েছে ওদের সুবিধার জন্য। কারাগারে কারবারিরা মোবাইলও ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিমধ্যে কয়েকবার মোবাইল উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। ইয়াবা কারবারিদের কারণে কারাগারটিতে বাড়তি আয় দেশের অন্যান্য কারাগার থেকে সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন। তাই এখানে একবার পোষ্টিং নিয়ে যিনি এসেছেন তিনি কোনোভাবেই এখান থেকে অন্যত্র যেতে রাজি নয়।

মাস তিনেক আগে কারাগারটির ব্যবস্থাপনা তদারকিতে নতুন করে ৯ সদস্যের একটি বেসরকারি কারা পরিদর্শক দলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন স্থানীয় এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, একজন জেলা যুবলীগ নেতা, একজন নারী নেত্রী, একজন শিক্ষাবিদ ও একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বেসরকারি পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও উঠেছে নানা অভিযোগ। বলা হচ্ছে, ওই পরিদর্শক কয়েক ঘণ্টা ধরে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে চুক্তির পর দর্শনার্থীদের কারগারে পাঠিয়ে থাকেন।

এসব ছাড়াও সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, কারাগারের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে। হাসপাতালে চুক্তির মাধ্যমে ইয়াবা কারবারিরা দখল করে নিয়ে থাকেন। তবে কোনো পরিদর্শন দল গেলে দ্রুত কারবারিদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে কিছু অসুস্থ এবং উন্মাদ প্রকৃতির লোকজনকে এনে দেওয়া হয়।

এসব বিষয় নিয়ে বেসরকারি কারা পরিদর্শক এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফার সঙ্গে গত রাতে আলাপ করলে তিনি বলেন, ‘আমার সময়ের অভাবে কারাগারে তেমন যাওয়া হয়না। তবে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এসব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি অবশ্যই কারাগারে গিয়ে এসব অন্যায়-অবিচার তদন্ত করে জোরালো প্রতিবাদ করব।’

অপরদিকে বেসরকারি কারা পরিদর্শক মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘আমাদের বেসরকারি কারা পরিদর্শকের তালিকায় রেখে কারাগারের অভ্যন্তরে ফ্রিস্টাইলে আকাম-কুকাম চলবে তা কিছুতেই হতে দেব না। আমি এসবের ঈঙ্গিত পেয়েই কারাগারের তত্ত্বাবধায়ককে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি এখনো কোনো ব্যবস্থা নেননি।’

গত বৃহস্পতিবার ঈদের পরের দিন কারাগারে এত বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর ভিড় জমেছিল যে, এদিন দর্শনার্থীদের নিকট থেকে কারারক্ষীরা যে যেভাবেই পেরেছেন টাকা আদায় করে নিয়েছেন। এ কারণেই কক্সবাজার কারাগারের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের চলমান অনিয়ম-দুর্নীতির কথা চাওর হয়ে পড়ে। ঈদের পরের দিন বৃহস্পতিবার কারাগারে অন্তত ৬/৭ হাজার দর্শনার্থীর ভিড় জমেছিল বলে জানা গেছে। এদিন বন্দেদের সঙ্গে দেখা করে ভাত-তরকারির একটি ক্যারিয়ার ঢুকাতেও কারা কর্তৃপক্ষ আদায় করেছে ২০০/৩০০ টাকা।

এসব বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক বজলুর রশীদ আখন্দ দাবি করেছেন- ‘অভিযোগসমূহ সত্য নয়। বৃহস্পতিবার কয়েক হাজার দর্শনার্থী ছিল কারাগারে। ওই সময় আমি কিছু সময়ের জন্য বাইরে ছিলাম। একারণে এ সময় কিছু অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাই এসব অভিযোগের বিষয়ে আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’ সূত্র: কালের কন্ঠ



এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: