সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘সন্তান মানেই টাকা রোজগারের মেশিন নয়’

পিকলু প্রিয়:: ছোট বেলায় শুনতাম ‘সুদখোর’ মানে মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার নিলে যার বিনিময়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হত। এবং বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে সেটাকেও সুদ বলা হত! সময়ের বিবর্তনে সবকিছুই পাল্টায় এবং সেটা স্বাভাবিক তাই এখন আর সুদ নামক শব্দটির কথা শুনি না। তার মানে এই নয় সুদ নামক শব্দটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে! সেটা এখন নতুন মোড়কে ঘুষ নামক শব্দে রুপান্তিত হয়েছে!

মানুষ ব্যাংকে টাকা ইনভেস্ট করার কারণ তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা ও টুকটাক সমস্যার সমাধান করা ইত্যাদি।
ঠিক তেমনি প্রায়শই পিতা মাতা সন্তান জন্ম দেন তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, বংশের প্রজন্ম বিস্তার করা ও বৃদ্ধা বয়সে তাদের দেখাশুনা করার জন্য। আমি মনে করি বৃদ্ধা বয়সে মাতা পিতাকে অবহেলা করা কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে রাখা যতটুকু পাপ ঠিক ততটুকুই পাপ পিতা মাতারা যখন সন্তানের প্রাণবন্ত জীবনটাকে পণ্য মনে করেন। যদিও এই রকম পন্যবাজি পিতা মাতার সংখ্যাটা অনেকাংশ কমে এসেছে।

এইবার আসেন যে সত্য সচরাচর বলা হয় না রীতিমত মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়! সেটা নিয়ে কিছু আলাপ করি, এখন মিডিয়ার যুগ পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল, ফেইসবুক ইত্যাদি’তে পিতা মাতাকে সন্তান দেখাশুনা করে না এই ধরণের নিউজ প্রায়’ই ভাইরাল হয়, নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। আমিও সেগুলোকে তীব্র নিন্দা জানাই এবং মন থেকে ঘৃণা করি। যে পিতা মাতার সীমাহীন শ্রম আর অ-গনতি কষ্টের ফলে পৃথিবীতে আগমন হওয়া। তাদেরকে অবহেলা করা! এর থেকে বড় কোন অমনুষ্যত্ব্য ও পাপ আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু অধিকাংশ পিতা মাথার নীরব মানসিক নির্যাতনে হাজার হাজার সন্তানের জীবন টা বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে! বাজে কটুক্তি আর শারিরীক মানসিক অত্যাচারে সন্তানের আত্নবিশ্বাস, মানসিক শক্তি, ভবিষ্যত ইত্যাদি নষ্ট করে দেওয়ার হাজার ঘটনাও আমরা কম বেশি সবাই জানি এবং শুনি। কিন্তু কেউ তা প্রচার করি না! কারণ সব পিতা মাতার বক্তব্য উনারা সন্তানের মঙ্গলের জন্য এগুলো করে থাকেন ধরা যাক ভালোর জন্যই করেন কিন্তু উনারা কী জানতে চান সন্তান কী ভাবে ভাল থাকতে চায়? মোদ্দা কথা পিতা মাতারা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তানদের ভালো মন্দের বিচার করেন সন্তানদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়!

অপরদিকে দেখবেন স্বামী, স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে অনেকেই মুখ খুলেন এবং প্রচার করেন আমি সেটারও পক্ষে। কিন্তু কোন সন্তান’কে দেখিনি পিতা মাতার অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে। তারা নীরবে নিভৃতে সহ্য করে যায়, কাউকে দেখিনি এই নিয়ে এক কলম আজ পর্যন্ত লিখেছে বা প্রচার করেছে! আর যদি বাস্তবিক জীবনে কেউ করেও থাকেন তা হলে সেটা আমার নজরে আজ অবধি আসেনি। সত্যি কিছু কষ্ট মানুষ কেবল খুব নীরবে সহ্য করে যায়। কিছু কষ্ট কাউকে বলা যায় না খুব কাছের মানুষকেও না।

দয়াকরে আপনারা যারা পিতা মাতা হয়েছেন সন্তানের প্রতি একটু সদয় হবেন। আপনার সন্তান কেবল আপনার টাকা রোজগারের মেশিন নয়! তার ও একটা মন আছে, তারও একটা স্বপ্ন আছে, তারও দুঃখ কষ্ট হয়, তার ইচ্ছে হয় নিজের মত করে বাঁচতে, দয়াকরে বুঝতে চেস্টা করুন। হাজার হাজার সন্তান কেবল তাদের পিতা মাতার কারণে আজ সম্ভাবনা আর যোগ্যতা থাকার পরেও জীবন থেকে ছিটকে গিয়েছে এবং যাচ্ছে! যারা আজ জীবনে ব্যর্থ বা কাঙ্খিত সাফল্য পায়নি খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাদের অনেকের জীবনে এমন কিছু ইতিহাস আছে। শুধুমাত্র পিতা মাতার মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তানরা নীরবে হাজার হাজার বার মরে যাচ্ছে! সন্তান জন্ম দিয়েছেন বলে তাকে মানসিক ভাবে হত্যা করার অধিকার কোন জন্মদাতার থাকে না! থাকে কী?

অনেক ছেলে মেয়ে আছে যারা একে অপরকে ভালোবাসে এক সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটানোর স্বপ্ন দেখে কিন্তু পিতা মাতারা সন্তানদের স্বপ্নকে কবর দিয়ে তাদের পছন্দমত বিয়ে দেন। এখানেই’তো আপনার জীবিত সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনকে গলা টিপে হত্যা করে দিলেন! মরে মরে বেঁচে থাকে তারা একমাত্র পিতার মাতার কথা চিন্তা করে।

মানব, সমাজ, ও ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যপুস্তক খানিকটা পড়েছি, আচ্ছা- ধরে নিন আমি পাঠ্যপুস্তক তেমন পড়ি নাই ইতিহাসও তেমন একটা জানি না। তবে নিজের ২৪ বছর বয়সের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অনেক পরিবারকে দেখেছি মেয়ে সন্তান জন্ম হলে পিতাসহ পরিবারের সবাই তেমন একটা খুশি হতেন না কারণ মেয়ে জন্ম নিলে’তো রোজগার হবে না বরং ভরণপোষণ করে এক সময় বিয়ে দিতে হয় তখনও টাকার ব্যয়!

আমরা চার ভাই, বোন নেই! অনেকেই বলতেন তোমার’ত বোন নেই কোন চিন্তা নেই! পিতা মাতাকে বলতেন তোমাদের’তো মেয়ে নেই বিয়ের খরছ থেকে বেঁচে গেলে! এই ধরণের কথাগুলো যখন শুনতাম তখন খুব অবাক হতাম আর মনে মনে ভাবতাম এরা এতটাই কম শিক্ষিত, এতটাই অমানবিক লেখাপড়ার বালাই কি তাদের মধ্যে একদম নেই! নাকি কয়েকটা সার্টিফিকেট আর একটি চাকুরি পর্যন্ত’ই তাদের লেখাপড়া সীমাবন্ধ! তারা কী জানে না কাজী নজরুলের কবিতা “সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”। সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন “কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী’। তবে বর্তমানে সমাজের টাবু ভেঙ্গে অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। তারা এখন আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজেদেরকে সন্তান জন্ম দেওয়ার মেশিন ভাবে না, পুরুষতান্ত্রিক প্রথার দাসি ভাবে না। তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজেদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে শিখেছে। সারা বিশ্বে এখন পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে নারীরাও কাজ করে যাচ্ছে। তবে নারীদের বাস্তবিক যাপিত জীবনেও এখনো রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতার অনেক প্রভাব। তারপরও আমি স্বপ্ন দেখি নারী পুরুষ মিলে এই পৃথিবীটা একদিন মানুষের হবে। এখানে নারীবাদের কোন প্রসঙ্গ আমি টানি নাই শুধু মেয়ে সন্তান জন্মালে মানুষদের অনুভুতি তুলে ধরতে গিয়ে এই প্রসঙ্গগুলো যুক্ত করতে হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি নারীবাদের মূলমন্ত্র ‘শুদ্ধতম মানুষ হওয়া’।

এইবার আসেন পূঁজিবাদের শুরুটা নিয়ে একটু আলাপ করি, পূঁজিবাদের বৃত্তে মাত্র ১২ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে যখন এগ্রিকালচারাল রেভোলুশন শুরু হয় তখন মানুষ টিকে থাকার স্বার্থে প্রথম শ্রমিকের উপযোগিতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তারপর উনারা অবিষ্কার করেন একজন পুরুষ যদি জমিতে লাঙ্গল দেন এবং একজন নারী যদি গন্ডা গন্ডা সন্তান জন্ম দিয়ে লাঙ্গল দেওয়ার মত শ্রমিক তৈরি করতে পারেন! তা হলে হয়তো সব থেকে বেশি ফসল উদ্বৃত্ত থাকে। এইটা একদিনে হয় নাই এই ঘটনা ঘটতে কয়েক হাজার বছর সময় লেগেছে।

পরিশেষে বলছি, পৃথিবীর সকল পিতা মাতা’কে আমি ঈশ্বরের থেকে বড় মনে করি। পৃথিবীর সকল পিতা মাতাদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জ্ঞাপন করে বলছি দয়াকরে আপনারা মেয়ে জন্ম নিলেই তার ভরণপোষণ করে বিয়ে দেওয়া, আর ছেলে জন্ম নিলে টাকা রোজগারের মেশিন ভাববেন না। ছেলে হউক মেয়ে হউক প্রথমে তাদেরকে মানুষ হতে সহযোগিতা করুন তাদেরকে শুদ্ধতম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন তারপর দেখবেন তারা নিজ থেকে নিজেদের তাগিদে, জীবনের তাগিদে, জীবিকা সরবরাহ করবে সংসার করবে নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করবে। এতঃপর পিতা মাতাকে ঈশ্বরের উর্ধ্বে ভাববে। আর নয়তো একদিন দেখবেন পৃথিবীর অলি’তে গলিতে প্রতিটি ছেলে মেয়েদের দীর্ঘশ্বাসের সাথে ধ্বনিত্ব হবে নির্বাসিত দাউদ হায়দারের সেই কবিতার লাইন “জন্মই আমার আজন্ম পাপ”।

লেখক: পিকলু প্রিয়, দোহা, কাতার।, E-mail : [email protected]




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: da[email protected]

Developed by: