সর্বশেষ আপডেট : ৫৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

যে বাড়ির সামনে দিয়ে জুতাপায়ে হেঁটেচলা ছিল অপরাধ

মিলাদ জয়নুল ::
নিভে গেছে রঙিন আলো। ঝাড়বাতির বাহারও নেই। কোথাও বাজে না পাখোয়াজ। শোনা যায় না নূপুরের নিক্কণ। বিরাণ প্রান্তরের কোণে একখন্ড অতীতকে বুকে চেপে নিথর দাঁড়িয়ে রয়েছে খাসা এলাকার জীর্ণ জমিদার মহলের স্মৃতির আঙিনা।
ক’দিন আগে বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পুলিশও ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির জমিদারী রেওয়াজ দেখে ভড়কে যায়। প্রায়ই বাড়ির আশপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।

গ্রাম আর শহরের মিশেলে বিয়ানীবাজার পৌরশহরের প্রবেশমুখে হাজিবাড়ি দীঘির বিপরীত দিকে তাকালে অদূরের প্রাচীন জমিদার মহলের ক্ষয়িষ্ণু বাড়ি-ঘরগুলোর স্মৃতিচিত্র মানসপটে ভেসে আসে। বর্তমানের পরিবর্তনের নিচে চাপাপড়া ঐতিহ্য টের পাওয়া যায়।
বিয়ানীবাজার পৌরএলাকা এমনিতেই ধণাঢ্য। চারদিকে ছিমছাম প্রাসাদ, সচেতন মানুষের কোলাহল। কাছের নয়াবাজারের ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন (৪৫) বলেন, এখন ওই জমিদার বাড়িতে কিছু নেই। কিছুদিন পরপর জমি নিয়ে বিরোধের কথা শুনা যায়। তবে এ বাড়ির অনেকেই এখনো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।

জানা গেল, অনাদার ও অযত্নে নষ্ট হচ্ছে অনেক কিছু। বাড়ির লোকজনও কেউ নেই। পরিবর্তনের তোড়ে খাসার ওই জমিদার বাড়ি এখন প্রাচীনত্বের স্থলে নবসৃষ্টির আগ্রাসী দাপটের অধীন। একসময় ওই বাড়ির সামনে দিয়ে জুতাপায়ে হেঁটেচলা ছিল অপরাধ। এবাড়ির প্রতিবেশী ও উদীচি শিল্পী গোষ্টির আহবায়ক ছরওয়ার হোসেন জানান, শুধু জুতা নয়, ছাতা টানিয়েও কেউ বাড়ির পথধরে হেঁটে যায়নি। বাড়ির বাসিন্দাদের সেবায়েত হিসেবে অনেকেই কাজ করেছেন। যাদের পরবর্তী সময়ে জমিজমা দান করেন জমিদার বাড়ির বাবুরা।

এখন সেইদিন নেই। বদলে গেছে সব। বাড়ির উত্তরাধিকারী অরুনাভ পাল চৌধুরী মোহন জানান, অনেক আগে বাপ-দাদারা দাসগ্রামে স্থানান্তরিত হন। বাড়ির একসময়ের উত্তরাধিকার ছিলেন সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সিএম শফি সামি। তারা লাউতায় স্থায়ীভাবে চলে গেছেন। বাড়িটিতে বসবাস করছেন প্রয়াত ভূবতি পাল চৌধুরীর দুই সন্তান। তারাই মূলত: বাড়িটি দেখভাল করে থাকেন। সামাজিকভাবে অবহেলিত এই দু’জনের পথচলা যে খুব সুখময়, তা কেউই বলতে স্বীকার করবেননা। তারা হলেন-সুস্মিতা পাল চৌধুরী ও ভাষ্কও পাল চৌধুরী। এই দু’জন ছাড়াও বাড়িটির আরো উত্তরাধিকার হলেন তিমির পাল চৌধুরী, অরুনাভ পাল চৌধুরী ও অনিবার্ণ পাল চৌধুরী। অরুনাভ পাল চৌধুরী অভিযোগ করেন, বাড়ির সামনের বারো পালের দীঘিও ছিল তাদের সম্পত্তি। কিন্তু ৫৬ ইংরেজীর রেকর্ডে এটি অন্যের নামে চলে যায়। এনিয়ে আদালতে আইনী লড়াই চলছে বলেও জানান তিনি। রাজ বংশের চতুর্থ রাজপুরুষ রাজা বারানসী পাল নিজ বাড়ির পূর্বপাশে এক বিরাট দীঘি খনন করেন। এই দীঘিই বারো পালের দীঘি নামে পরিচিত। অমিতাভ পাল চৌধুরী জানান, সপ্তম শতাব্দীর দিকে ত্রিপুরার মহারাজা মিথিলা থেকে গঞ্জগোত্রীয় পাচঁজন বৈদিক ব্রাক্ষণকে নিয়ে যজ্ঞ সম্পাদন করেন। যজ্ঞ সম্পাদনের পর মহারাজা ব্রাক্ষণগণকে তাঁর রাজ্যেও অর্ন্তভূক্ত একটি অঞ্চলে বসবাসের অনুরোধ করেন। মহারাজার অনুরোধে ব্রাক্ষণগণ এখানে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজা কালিদাস পাল ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়সহ সকলের সহযোগীতায় ট্ঙ্গেইর রাজ্যের অধিপতি ও সর্দারদের বিতাড়িত করেন। সবার অনুরোধে রাজা কালিদাস পাল এক স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন এবং নাম দেন পঞ্চখন্ড।

আগের আর্থিক জৌলুস না থাকলেও বাড়িটি ঐতিহ্যগত দিক থেকে পঞ্চখন্ডের ইতিহাসের গৌরবময় অংশ। পালাবদলের পৃথিবীতে সামাজিক কাঠামোর নানা অদল-বদল এবং উত্থান-পতনের হাত ধরে একদার হাতি-ঘোড়া সজ্জিত প্রাসাদ বিরাণ হয়ে গেছে। আবার বিরাণ জনপদ আলো ঝলমল হয়েছে। কালের গর্ভে বিলীন সেইসব কথা ও কাহিনি ইতিহাসের প্রাচীন-ধুসর পাতায় কিংবা লোকশ্রুতিতে এখনো চকচক করে। আজকের বদলে যাওয়া বিয়ানীবাজারের দিকে পেছন ফিরে তাকালে টের পাওয়া যায় সমৃদ্ধ অতীতের স্মৃতিমেদুর দ্যুতিময় ঝলক।

লেখক : সাংবাদিক, বিয়ানীবাজার সিলেট।



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: