সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

এই অমানুষগুলোকে থামান দয়া করে!

লেখক, মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদঃ বাংলাদেশের মুসলমানেরা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই ধর্মভীরু। বিশেষ করে যারা মফস্বলে বাস করেন, তাদের মধ্যে শুধুমাত্র ধর্মভীরু হবার কারণেই পরিবারের যেকোন এক সন্তানকে শিক্ষার জন্যে মাদ্রাসায় পাঠানোর ব্যাপারটা দেখা যায়। কেউ হয়তো আগেই নিয়ত করে রেখেছিলেন, কেউবা ভাবেন, বড় সন্তানদের তো বাংলা-ইংরেজী মিডিয়ামে পড়ালাম, এবার ছোটটাকে মাদ্রাসায় দেই, একটু আল্লাহ-খোদার নাম যদি নেয়।

বাসার পাশেই বড় এক মাদ্রাসা থাকায় সেখানকার নিয়ম-নীতিগুলো খুব কাছে থেকেই দেখেছি। মাদ্রাসা সিস্টেমের মধ্যে সবচেয়ে অমানবিক যেটা মনে হয়েছে আমার কাছে, সেটা হচ্ছে অকথ্য মার। পান থেকে চুন খসলেই বেত বা লাঠি দিয়ে ছাত্রদের ইচ্ছেমতো পেটাতো মাদ্রাসার হুজুরেরা। মাদ্রাসায় নাকি বাবা-মায়েরা সন্তানকে ভর্তি করানোর সময়ই বলতেন, ‘হুজুর, আপনার জিম্মায় রেখে গেলাম, মাংস থাকা লাগবে না, হাড্ডিটা ফেরত পেলেই হবে।’ হুজুরদের মধ্যে কেউ কেউ এই খুল্লাম-খুল্লা সার্টিফিকেট পেয়ে অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাতেন ছাত্রদের ওপরে।

স্কুল কলেজে মার আমরাও খেয়েছি, কিন্ত হুজুরদের হাতে মাদ্রাসার ছাত্রদের যেভাবে অত্যাচারিত হতে দেখেছি, সেটা আমাদের সঙ্গে ঘটলে পরদিনই বোধহয় দলবেঁধে গিয়ে স্কুল জ্বালিয়ে দিয়ে আসতাম। তেরো-চৌদ্দ বছরের একটা বাচ্চাকে কেউ একজন কিভাবে এমন অমানুষের মতো মারতে পারে, এটা কখনোই আমার মাথায় ঢোকেনি, আজও ঢোকে না। ছেলেটা তো মানুষ খুন করেনি, চুরি-ডাকাতিও করেনি। মাদ্রাসা পালিয়ে ক্রিকেট খেলার অপরাধে বা কারো গাছ থেকে আম পেড়ে খাওয়ার অপরাধে যে একটা ছোট ছেলেকে কেন এভাবে মারতে হবে?

এই হুজুরেরা আবার আমাদের ধর্মভীরু সমাজে ভীষণ সম্মান পেয়ে থাকেন। একটা সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ তার এলাকায় যতোটা না প্রভাবশালী, তারচেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী এসব মাদ্রাসার শিক্ষকেরা। কারণ বাঙালি মুসলমানের মাথায় অটোমেটিক সেট করা হয়ে গেছে, মাদ্রাসার হুজুর মানেই আলেম ব্যক্তি, আল্লাহর প্রিয় বান্দা! কিন্ত আলেম আর জালেমের মাঝে যে শুধুই একটা বর্ণের পার্থক্য, সেটা হয়তো আমরা অনেক সময়ই বুঝি না, বা বুঝলেও তখন অনেক দেরী হয়ে যায়।

গত কয়েকদিন ধরে খবরের কাগজ আর ফেসবুকের নিউজফিড ভর্তি এসব জালেমের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে। ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাতের ওপর যৌন নিপীড়ণ চালালো মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, মামলা হওয়ায় নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হলো। এখন একে একে বেরিয়ে আসছে সিরাজ উদ দৌলার অতীত অপকর্মগুলো, কোথায় সে কবে কাকে মলেস্ট করেছে, কোন মাদ্রাসা থেকে ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগে বহিস্কৃত হয়েছে, সব এখন উঠে আসছে একে একে। অথচ গত পনেরো-বিশ বছর ধরে এসব অপকর্ম করে এলেও, নুসরাতের ঘটনার আগে কিন্ত কেউ সিরাজ উদ দৌলার চুলটাও বাঁকা করতে পারেনি কেউ! সোনাগাজীতে তাকে এতদিন আলেম-ওলামা হিসেবেই জেনে এসেছে সবাই!

গত পরশু এক মসজিদের ইমাম আর মুয়াজ্জিন মিলে মক্তবে আরবি পড়তে আসা একটা ছোট্ট শিশুকে টাকার জন্যে অপহরণ করেছিল, তারপর শিশুটাকে হত্যাও করে এই অমানুষেরা। কোন মাত্রার অমানুষ এরা? এই লোকগুলোকে আমরা মাথায় তুলে রাখি, এদের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ি, বাসায় দাওয়াত দিয়ে ভালোমন্দ খাওয়াই, এগুলো ভাবতেই তো ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর!

গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এক মাদ্রাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হলো এক ছাত্রের লাশ। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সেটাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্ত পরে ছেলেটার শরীরে পাওয়া গেল বেশ কয়েকটা ক্ষত। বারো-তেরো বছর বয়সের একটা ছেলে কেন নিজেকে খুঁচিয়ে রক্ত বের করে, তারপর জানালার গ্রিলের সাথে গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করবে? কোন যুক্তি আছে এটার পক্ষে?

এলাকাবাসী সেই মাদ্রাসাটাতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। মজার ব্যাপার কি জানেন, হাটহাজারীর এই মাদ্রাসা থেকেই ২০১৩ সালে নাস্তিক-ব্লগার কতলের ডাক দেয়া হয়েছিল। সেদিনই যদি সাহস করে কেউ মাদ্রাসাটায় তালা লাগিয়ে দিতো, তাহলে হয়তো এই বাচ্চা ছেলেটাকে আজ মরতে হতো না।

মাদ্রাসায় ছাত্র বলাৎকারের ঘটনা ঘটে প্রায়ই। খবরের কাগজে হয়তো একশোটা ঘটনার মধ্যে একটা বা দুটো ঘটনা ছাপা হয়, বাকীগুলোর কথা আমরা জানতেও পারি না। কিছু হয়তো আপোষে মীমাংসা করা হয়, কিছু ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়। মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকেই নাকি চায় না তাদের ছাত্রছাত্রীরা উপযুক্ত যৌনশিক্ষা পাক। কে জানে, বলাৎকারের মহোৎসব বন্ধ হয়ে যাবে একারণেই হয়তো! তারা যৌনশিক্ষার কথা শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, পাঠ্যবইয়ের ছবিতে কোন মেয়ের গায়ে ওড়না না থাকলে তারা আন্দোলন শুরু করে দেয়। তাদের কাছে যৌনশিক্ষা হারাম, কিন্ত ছাত্র বলাৎকার করায় খুব আরাম!

এরাই আবার ধর্ষণের ঘটনায় নারীর পোষাকের দোষ দেয়, এরা বলে, মিষ্টি খোলা রাখলে মাছি তো বসবেই! আরে ব্যাটা, বারো বছরের ছেলেটা যে ধর্ষণের শিকার হলো, সে কোন মধুটা গায়ে মেখে বসে ছিল? তার ওপরে কেন একটা অমানুষ হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো? এসব প্রশ্নের জবাব তারা কখনও দেন না!

পরিমলের কথা মনে আছে? কিংবা কুষ্টিয়ার পান্না মাস্টার? দুটো ঘটনাতেই ছাত্রী ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল স্কুলের দুই শিক্ষক। দুই জায়গাতেই স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করেছে, বিচারের দাবী তুলেছে। আর সোনাগাজীর মাদ্রাসায় আমরা কি দেখলাম? এখানে উল্টো ধর্ষক-নিপীড়ক অধ্যক্ষের মুক্তি দাবী করে মিছিল হয়েছে! এই জানোয়ারটার নামের আগে ‘সম্মানীত’ বিশেষণ বসেছে ব্যানারে! যারা মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে, এরা কি মানুষ?

এরকম ন্যাক্কারজনক একটা ঘটনা ঘটে গেল, চারদিনে দেখলাম না কোন মাদ্রাসার পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি আসতে, উল্টো সোনাগাজীতে নুসরাতের ওপর হামলার বিচার চেয়ে মানববন্ধন যাতে না করা হয়, সেই চেষ্টা করেছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী! কওমি মাদ্রাসার নেতারাও কিছু বললেন না গত পাঁচদিনে, এমনকি নুসরাতের মৃত্যুর পরেও তাদের কোন বিকার নেই! অবশ্য, তাদের কাজ তো সময়ে সময়ে সরকারকে হুমকি দেয়া আর নাস্তিকদের বিরুদ্ধে ‘ব্যবসায়িক ধান্ধায়’ জেহাদ করাতেই সীমাবদ্ধ। রেলওয়ের জমির ভাগাভাগিতেই তারা এখনও ব্যস্ত হয়তো।

মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে আমরা কোনভাবেই নই। এদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়ছে, সেখানেও ভালো শিক্ষক আছেন অজস্র। কিন্ত জানোয়ারদের সংখ্যাটাও এখানে তুলনামূলক বেশি। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থাটাকেই ঢেলে সাজানোটা এখন সময়ের দাবী, যাতে নিজেকে আলেম/ওলামা দাবী করে কেউ ছাত্রীদের গায়ে হাত দিতে না পারে, বারো-তেরো বছরের বাচ্চাকে বলাৎকার করতে না পারে। নাস্তিক কতলের চেয়ে নিজেদের মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের সুরক্ষা দেয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মাদ্রাসার শিক্ষক আর কওমি নেতাদের বোঝা উচিত।
সূত্রঃ এগিয়ে-চলো




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: