সর্বশেষ আপডেট : ৪৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি জমাতে ভূমধ্যসাগরেই সিলেটী তরুণদের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ

নিউজ ডেস্কঃ পূর্ব সিলেটের হাজারো যুবক ও তরুণ স্বপ্নের দেশ ইউরোপে পাড়ি জমাতে ট্রানজিট রুট লিবিয়া-তুরস্কের পথ ধরেছে। কাজের সন্ধানে ও জীবিকার তাগিদে মৃত্যুর সমূহ ঝুঁকি নিয়ে কম শিক্ষিতরা ইউরোপে যাচ্ছেন।

ইউরোপে গিয়ে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে আশ্রয় চাওয়া লোকের সংখ্যাও কম নয়। জীবিকার তাগিদে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইতালিতে পাড়ি দিচ্ছেন তারা।

রাজধানী ঢাকা থেকে লিবিয়া, এরপর ইউরোপের দেশ ইতালি পৌঁছানোর প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ দিন থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সিলেটের একটি আদম পাচারকারী চক্র। গত এক বছর লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে সাগরে ট্রলার ডুবিতে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের দুই শতাধিক তরুণের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত ২৩ জানুয়ারি লিবিয়ার উপকূল ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ১২০ জন অভিবাসীর মধ্যে নিখোঁজ রয়েছে ১১৭ জন। নৌকাডুবির ঘটনায় গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও বড়লেখার একাধিক তরুণ, যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাদের পরিবারে চলছে এখন আহাজারি।

লিবিয়া উপকূল থেকে ইউরোপের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরে ট্রলারে করে যাওয়ার পথে যারা মারা যান। তাদের মধ্যে কয়েকজন যুবক হলেন সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার খাসা গ্রামের ইমরান হোসেন, ফতেহপুর গ্রামের হুমায়ুন রশিদ ইমন, চারখাইয়ের এক মাদরাসা ছাত্র, গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণের সাকের এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখার চান্দগ্রামের ফারুক হোসেন।

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া শরণার্থীরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক যেতে একজনকে ১০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়। একটি এজেন্সি’ তাদের লিবিয়া পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয়। ওয়ার্কিং ভিসার জন্য এজেন্সিকে তিন থেকে চার হাজার ডলার দিতে হয় বলেও জানিয়েছেন তারা। অনেক বাংলাদেশী দীর্ঘ দিন লিবিয়াতে বাস করার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন এবং সরাসরি ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

আইওএম-র তথ্যানুসারে, একজন বাংলাদেশী অভিবাসীকে লিবিয়া যেতে ১০ হাজার ডলার এবং ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার জন্য নৌকা খরচ দিতে হয় ৭০০ ডলার। নির্যাতন, তিনবার দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, এবং নিজ আত্মীয়কে মরতে দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন খালিদ হোসেন। অথচ স্বপ্ন দেখেছিলেন, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। মনে করেছিলেন, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সূত্র জানায়, উঠতি বয়সী যুবক ও কলেজপড়–য়া তরুণদের টার্গেট করেই দালাল চক্রটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রলোভন দেখানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের দেখানো হয় নানা লোভ-লালসা। মোটা অংকের টাকার চুক্তির মাধ্যমে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর শুরু হয় এসব যুবক ও তরুণদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন। তাদের কৌশলে অপহরণ করে পরে আদায় করা হয় মোটা অংকের টাকা।

খালেদ হোসেন দক্ষিণ এশিয়ার আরো অনেক তরুণের মতো লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই তিনি একদিন হাজির হন লিবিয়ার সমুদ্র উপকূলে। সমুদ্র পাড় হলেই ইতালি। তাই আশায় বুক বাঁধেন তিনি, উঠে বসেন একটি নৌকায়। হোসেনের কথায়, ‘আমি উদ্দীপ্ত ছিলাম এটা ভেবে যে, কয়েক ঘণ্টা পরেই ইতালি পৌঁছাব। ভেবেছিলাম, আমার পরিবারের সব আর্থিক সমস্যা তখন মিটে যাবে। পঙ্গু বাবার কাছে প্রমাণ করব আমি ফেলনা নই।’

কিন্তু খালেদের স্বপ্ন দুঃসপ্নে পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি। ছোট্ট নৌকায় তার সাথে শতাধিক যাত্রী উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে আফ্রিকার অনেক মানুষ ছিলেন, ছিলেন হোসেনের নিজের এলাকা বিয়ানীবাজারের বেশ কয়েকজনও। ৩০ ফুট লম্বা প্লাস্টিকের নৌকাটি ইতালির উদ্দেশে মাত্র ঘণ্টা তিনেক চলার পর ভেঙে যায়।

ইতালিতে আশ্রয় নেয়া যুবক নাহিদ এই যাত্রার একটি অংশের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ‘উত্তাল সমুদ্রে ভাসছে নৌকা। প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে নৌকায় পানি উঠতে শুরু করেছে। নৌকা ঘিরে চক্কর দিচ্ছে হাঙ্গর ও ডলফিন। নৌকা ডুবলেই মানুষগুলোকে গিলে খাবে হাঙ্গার! ভাগ্য বদলের আশায় লিবিয়ার জোয়ারা উপকূল থেকে সাগরে ভাসছেন বাংলাদেশের রবিউলসহ ৮০ জন। গন্তব্য ইউরোপ। কিন্তু ইউরোপ নয় মৃত্যু এখন তাদের খুব কাছে। ডুবছে নৌকা, সেই নৌকায় সোমালিয়া, ক্যামেরুনের কালো চামড়ার মানুষের ভিড়ে থাকা রবিউলদের কান্না কি কেউ শুনতে পায়? আব্দুছ ছামাদ জুনেদ নামে আরো একজন জানান, মুহূর্তের মধ্যে নৌকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ সাগরের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার নৌকার পাটাতনে থাকা পেট্রোলের প্লাস্টিকের ক্যানগুলো খালি করতে শুরু করেন। আশা সেগুলোতে ভেসে জীবন বাঁচাবেন।

এই হুড়াহুড়িতে চোখের সামনেই মারা যান এক বাংলাদেশী। খালেদ হোসেনের মতো এমন অবস্থা আরো অনেকের হয়েছে। যদিও দালালরা সেসব ঘটনা চেপে গিয়ে বরং দুয়েকটি সাফল্যের গল্প শুনিয়ে বাংলাদেশী তরুণদের এমন কঠিন যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করে। শুধুমাত্র খালেদের এলাকা বিয়ানীবাজার থেকেই গত এক বছরে হাজারখানেক তরুণ এভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর গোটা বাংলাদেশের হিসেব করলে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি।

সার্বিক বিষয় নিয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান জীবিকার জন্য কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোথাও পাড়ি না জমানোর আহ্বান জানিয়ে দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, প্রশাসন মানবপাচার চক্রের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক। কোনো তথ্য পেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায়।



এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: