সর্বশেষ আপডেট : ১২ মিনিট ৭ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সিলেটের অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে নেই ন্যূনতম ইএমটি সেবা

নগরীতে বৈধ-অবৈধ ৩শর বেশি অ্যাম্বুলেন্স

মারুফ হাসান ::

রোগী পরিবহনের কাজে নিয়োজিত বিশেষ যানবাহনকে বলে অ্যাম্বুলেন্স। ‘ইএমটি’ বা ইমারজেন্সি মেডিক্যাল টেকনিশিয়ানরা যাত্রাপথে রোগীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা ও জরুরী ঔষধ প্রদান করে থাকেন।

সিলেটের দু-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোথাও কোনো অ্যাম্বুলেন্সে ‘ইএমটি’ সেবা চালু নেই। শুধু তাই নয়, নগরীতে চলমান (সরকারী বেসরকারী) প্রায় ৩শ-এর অধিক অ্যাম্বুলেন্সের কোনোটিতেই ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি নেই। থাকার মধ্যে আছে একজন চালক, বাইরে লালবাতি আর হুইসেল, ভেতরে একটি স্ট্রেচার ও অক্সিজেন সিলিন্ডার। ফলে যথাযথ স্বাস্থ্য সেবার অভাবে হাসপাতালে পৌছানোর আগে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন।

সরেজমিন অনুসন্ধ্যানে দেখা যায়, নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার ওয়েসিস হাসপাতালের ১টি, সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালে ১টি এবং রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ১টি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিষেবার সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। তবে রোগী চাইলে তারা অ্যাম্বুলেন্সের সাথে মেডিকেল টেকনিশিয়ান দিয়ে থাকেন। ওয়েসিস হাসপাতালের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় রোগী প্রেরণের ক্ষেত্রে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে একজন ব্রাদার থাকেন।

আল হারামাইন হাসপাতালের দুটি অম্ব্যুলেন্সের একটিতে ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করেন হাসপাতালের অনুসন্ধান বিভাগের এক কর্মকর্তা।

এদিকে ইবনে সিনা ও ওমেন্সে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সেবা নেই। যা আছে তা শুধুমাত্র চিকিৎসক আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। অনেক হাসপাতাল বা ক্লিনিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসকে একটি বাড়তি ঝামেলাই মনে করছে। তাই নগরীতে ব্যক্তিগত, সমিতি কিংবা কোম্পানী ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে।

সিলেটের অন্যতম স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ফজলুর রহমান জানালেন, তাদের ৪টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি দিয়ে রোগী পরিষেবা দেয়া হয়। সেই অ্যাম্বুলেন্সটিতে রোগীকে প্রাথমিক সেবা দেবার সকল ব্যবস্থা আছে।

হাসপাতালের ১১ জন অ্যাম্বুলেন্স চালকদের প্রধান রুস্তম খান জানালেন, রোগী পরিবহণকারী অ্যাম্বুলেন্সটিতে সকল ব্যবস্থা আছে কিন্তু রোগীকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়ার জন্য থাকেনা কোনো ব্রাদার কিংবা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত টেকনিশিয়ান। কল আসলে চালক একাই অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়ে ছুটে যান রোগীর গন্তব্যে।

নরগীতে চলমান অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইএমটি সেবা নেই এ বিষয়ে মেয়র আরিফুল হকের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রথম কেউ আমার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করলো, বিষয়টি নিয়ে আমি সংশ্লিষ্টদের সাথে বসবো এবং একটি জনকল্যাণমূলক সমাধানের পথ বের করবো। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স কয়টি এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র আরিফ বলেন, একটি ছিল বর্তমানে তা অকেজো, আমাদেরকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। আশা করছি খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবো। না পেলে আমরা নিজেরাই ক্রয় করবো বলে আশ্বস্ত করেন মেয়র।

সিলেটে এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. দেব পদ রায় জানালেন, ওসমানীতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে সংখ্যা ৭টি। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স সচল আছে এবং ভেতরে শুধুমাত্র অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়া অন্যকোনো সেবার ব্যবস্থা নাই। অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে ‘ইএমটি’ বা ইমারজেন্সি মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান থাকা জরুরী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইএমটি’ সেবা চালু করার বিষয়টি আমি আমাদের নিয়মিত বৈঠকে উপস্থাপন করবো।

মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন অফিসার সৈয়দ আতিকুর রব চৌধুরী জুয়েল জানান, আমাদের হাসপাতালে ৭টি অ্যাম্বুলেন্স আছে। এর মধ্যে দুটি ছোট এবং দুটি বড় অ্যাম্বুলেন্স রোগী পরিষেবার কাজে নিয়োজিত থাকে অপর তিনটি ডাক্তার পরিবহনে ব্যবহার হয়। তবে রোগী পরিবহনের সময় অ্যাম্বুলেন্সে ইমারজেন্সি মেডিক্যাল টেকনিশিয়ানদের কেউ না থাকলেও, একজন ওয়ার্ড বয় থাকেন বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ১টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে বলে জানালেন এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া ও কমিউনিটি সার্ভিস) মো. জেদান আল মুসা। তিনি বলেন রোগী পরিবহনের সময় আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন মেডিকেল এ্যাসিসটেন্ট থাকেন। জেদান আরো জানান, আমাদের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স না থাকলেও যেটি আছে সেটিতে প্রাথমিক চিকিৎসার সকল প্রকার সরঞ্জামাদি রয়েছে। তিনি মনে করেন সকল অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

নগরীরতে পারাপার নামক অ্যাম্বুলেন্স সেবা পরিচালনা করছেন এর সত্ত্বাধিকারী অরুন চক্রবর্তী। তিনি জনালেন, তার ৭টি অ্যাম্বুলেন্স আছে এর কোনোটিতেই অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া অন্য কোনো সাপোর্ট নেই। ইমারজেন্সি মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান বিষয়টি তার জানা নেই। একই ভাবে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিয়ে থাকেন মনির আহমদ। তার ৫টি অ্যাম্বুলেন্সের একটিতে অক্সিজেন ছাড়া অন্য কোনো সাপোর্ট নেই।

সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন ১৪১৮-এর অর্ন্তভূক্ত ওসমানী মেডিকেল রোড উপ কমিটির চেয়ারম্যান আকমল হোসেন লুকু জানান, কাজলশাহ এলাকার প্রায় ৮০ জন অ্যাম্বুলেন্স চালক আমাদের সংগঠনে সদস্য। ওসমানী হাসপাতালের রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত প্রায় ২শত অ্যাম্বুলেন্সে এরা পর্যায়ক্রমে ডিউটি করে থাকে। লুকু বলেন, এইসকল অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া তেমন কোনো সেবা ব্যবস্থা নাই।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে ক্রিটিক্যাল কেয়ার দেয়ার মতো স্টাফ সরকারের নেই, আমাদেরও নেই। যদিও ‘অ্যাম্বুলেন্স এটেন্ডেন্ট’ বলে একটি পদ রয়েছে। এই পদটি শুধুমাত্র ওসমানী হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। তিনি বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে সিলেটে যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো রয়েছে সেগুলো আদতে কোনো অ্যাম্বুলেন্সই নয়, মাইক্রো কেটে, পুলিশকে ম্যানেজ করে এগুলো চলাচল করছে। সিভিল সার্জন মনে করেন রোগী পরিষেবায় প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বসাধারণকে সচেতন হবার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেন স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তা।

সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান মনে করেন যেহেতু একজন মুমুর্ষ রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স কল করা হয় তাই রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসার সকল সাপোর্ট ঐ অ্যাম্বুলেন্সে থাকা উচিত। তিনি বলেন, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সকে বিষেশায়িত অ্যাম্বুলেন্স হতে হবে। এটি একটি সেবামূলক সার্ভিস। রোগীকে অক্সেজেন সরবরাহ, তার প্রেসার যাচাই করাসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সাপোর্ট দেয়ার জন্য অন্তত একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিকেল টেকনিশিয়ান অ্যাম্বুলেন্স থাকা উচিত। তিনি বলেন, আমি লক্ষ করেছি ইদানিং নগরীতে নোহা গাড়ি কেটে উপরে লাইট লাগিয়ে সেটিকে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এগুলোকে অ্যাম্বুলেন্স বলা যায় না।

সিলেটের সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট আফতাব চৌধুরী জানান, ব্যাংককে একজন ইমার্জেন্সি রোগীর প্রয়োজনে হাসপাতালে পৌছানোর আগেই লিফটের মধ্যে এক্সরে সম্পন্ন করা হয়। তারা এতোটাই এগিয়েছে। সেই তুলনায় আমরা এতোটাই পেছনে যে প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহণকালীন কোনো সেবা পাওয়া যায় না। তবে প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স প্রাথমিক চিকিৎসার সকল ব্যবস্থার পাশাপাশি একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনিশিয়ান থাকাটা বাধ্যতামূলক করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ইমার্জেন্সি মেডিকেল টেকনিশিয়ান ‘ইএমটি’ সেবা নেই এমন অ্যাম্বুলেন্সগুলো রোগীদের সাথে প্রতারণা করছে বলে মনে করেন সুজন সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, রোগী পরিবহনকালীন সময়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিস্টার, ব্রাদার কিংবা মেডিকেল টেকনিশিয়ান থাকা খুবই জরুরী। চাইলে নয়, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে তা বাধ্যতামূলক ভাবে রাখা উচিত। তিনি মনে করেন যেসকল অ্যাম্বুলেন্সে রোগীপরিষেবা নেই তা বাতিল করা প্রয়োজন। প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের বিষয়ে সিভিল সার্জন অফিস অভিযান পরিচালনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সিলেট ট্রাফিকের ডিসি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, নগরীতে কতগুলো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করে তার সঠিক হিসাব আমাদের কাছে নেই। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর সিলেট অফিসের ডিডি আব্দুস সাত্তার জানান, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৫টি এবং পুরো জেলাতে আরো ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স আমাদের তালিকাভূক্ত আছে।

সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় (সরকারী তালিকাভূক্ত) অবস্থিত সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সংখ্যা ৫৮টি, বেসরকারী ব্লাড ব্যাংক রয়েছে ৩টি এবং ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৬৫টি। এছাড়াও সিলেট জেলায় রয়েছে আরো প্রায় ৭০টি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান। তালিকাভূক্ত এই ১৯৬টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের একাধিক অ্যাম্বুলেন্স আছে তবে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তার পরিবহনে ব্যবহার হয়ে থাকে। রোগী পরিষেবায় ব্যবহৃত অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সই ব্যক্তিমালিকানা বা কোম্পানী ভিত্তিক এবং অবৈধ। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সকে নিবন্ধনের আওতায় এনে রোগীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে প্রতারণার হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার বিষয়টি সরকাকেই বিবেচনায় আনতে হবে।



এ বিভাগের অন্যান্য খবর



নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে. এ. রাহিম. সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: