সর্বশেষ আপডেট : ৭ ঘন্টা আগে
সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

পিডিদের থলের বিড়াল বের করে মন্ত্রীর তোপ

ডেইলি সিলেট ডেস্ক:: সিলেট বিভাগীয় গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০১৫ সালে অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ। এ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মোস্তফা হাসান। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান তাঁর কাছে জানতে চান, ‘আপনি ঢাকায় বসে অফিস করেন, নাকি প্রকল্প এলাকায় থাকেন?’ জবাবে পিডি বলেন, তিনি ঢাকায় থাকেন।

সিলেট বিভাগের চার জেলায় বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) আওতায় চলমান ৫৮টি প্রকল্পের বেশির ভাগেরই অবস্থা এই গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মতো। প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ পরিচালকই থাকেন না প্রকল্প এলাকায়।

উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ কেন নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না; প্রকল্পে কোথায় এবং কিভাবে অনিয়ম হয়—এত দিন ধরে থলের ভেতর থাকা সেসব বিড়াল বেরিয়ে এলো এক পর্যালোচনা সভায়।

গতকাল শনিবার সিলেটে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং সিলেট জেলা প্রশাসকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় উঠে এসেছে এমন আরো সব তথ্য। এসব তথ্য শুনে বিস্মিত হন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ। ফলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে মন্ত্রীর কাছ থেকে। তাঁর তোপের মুখে প্রকল্প পরিচালকদের বেশির ভাগই সদুত্তর দিতে পারেননি। ক্ষোভ প্রকাশ করেন একজন সংসদ সদস্যও।

সিলেট বিভাগীয় গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোস্তফা হাসানকে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে লাখ লাখ টাকার দামি গাড়ি দেওয়া হয় হাওরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য; কিন্তু আপনি যদি সেই গাড়িতে চড়ে গুলশান-বনানীতে ঘুরে বেড়ান তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কিভাবে? আপনি নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন। অন্তরের দিকে তাকান। ঠিক করছেন কি না।’

পরিকল্পনামন্ত্রী আরো বলেন, ‘জনগণের টাকায় গাড়ি কেনা হচ্ছে। সেই গাড়ি সব থাকছে ঢাকায়; কিন্তু কাজ থাকছে গ্রামে। এটা অদ্ভুত বিষয়। হাওরে প্রকল্প হচ্ছে; কিন্তু আমি জানি না। জনগণ আমাদের কাছে জানতে চায়, আমাদের জবাবদিহি করতে হয়।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৭ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ঘোষণা দেন, এডিপির আওতায় সারা দেশে চলমান প্রকল্পগুলো তিনি সরেজমিন পরিদর্শনে যাবেন। নির্ধারিত সময়ে কেন প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না, কোথায় সমস্যা—এসব সরেজমিনে গিয়ে দেখবেন। আটটি বিভাগে চলমান প্রকল্পের পিডিদের নিয়ে বসবেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা বিভাগ দিয়ে মন্ত্রী শুরু করেন তাঁর কাজ।

স্বাধীনতার পর কোনো সরকার এর আগে প্রকল্প পরিচালকদের এভাবে জবাবদিহির আওতায় আনেনি। এবারই প্রথম তাঁদের জবাবদিহির মধ্যে আনা হলো।

গতকাল সিলেট বিভাগের চারটি জেলার ৫৮ প্রকল্পের পিডিদের নিয়ে সিলেট সার্কিট হাউসে বসেন মন্ত্রী। সভায় আইএমইডি সচিব জানান, চলমান এসব প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটির অগ্রগতি শূন্য। ৩০টি প্রকল্পের অগ্রগতি সামান্য। বাকি প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক। ২০১৫ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পও আছে, চার বছর পেরিয়ে গেলেও যা বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। সভায় বেশ কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক না আসায় ক্ষুব্ধ হন আইএমইডি সচিব।

সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ অন্যরা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তুষার কান্তি সাহা একাই দুই হাজার ২২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের ছয়টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পগুলো থেকে গাড়িসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন তিনি। অথচ সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে, ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে কোনো প্রকল্পে একজন পিডি একাধিক প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

সিলেট সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে নেওয়া একটি প্রকল্পের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। উল্টো এই প্রকল্পের আওতায় সিটি করপোরেশনের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য দুই কোটি টাকা ব্যয়ে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়ায় বিস্মিত হয়ে প্রকৌশলীদের কাছে মন্ত্রী জানতে চান, এ ধরনের সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজেও পরামর্শক প্রয়োজন হয় কেন? ‘এটা তো আমি নিজেও এসব কাজ করতে পারি’, যোগ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এটা অর্থ অপচয়ের শামিল।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় নিম্নবিত্তদের জন্য ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালে অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত জমিই অধিগ্রহণ করতে পারেনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি যখন অনুমোদন পায়, তখন জমির ক্ষতিপূরণ ছিল দেড় গুণ। ২০১৭ সালে করা নতুন আইনে এখন জমির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তিন গুণ। ফলে প্রকল্পটি এখন অন্ধকারে। এই প্রকল্পের পরিচালকও থাকেন ঢাকায়। তিন বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য।

সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের পিডি জানান, বিদ্যুতের সব উপকরণ চীনে পড়ে আছে। সুরমা নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে চীন থেকে যন্ত্রপাতি আনা যাচ্ছে না। সুরমা নদীতে পানি এখন কম। তখন আইএমইডি সচিব বলেন, ‘সুরমা নদীর পানি কখন কমে যায়, আপনি এসব আগে পর্যালোচনা করেননি কেন?’

এর জবাব পিডির কাছ থেকে মেলেনি।

কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন প্রকল্পটি ২০১১ সালে নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৭ শতাংশ। কেন এই প্রকল্পের ধীরগতি জানতে চাইলে পিডি জানান, ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। প্রকল্পটি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার কেন্দ্রিক হলেও পিডি অবস্থান করছেন চট্টগ্রামে। কালেভদ্রে তিনি প্রকল্প এলাকায় আসেন।

বাল্লা স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অবস্থা বেহাল জমি অধিগ্রহণ জটিলতায়।

সিলেট বিভাগের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। অগ্রগতি এত কম কেন জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক আলী হোসেন চৌধুরী। তিনিও ঢাকায় থাকেন। মাসে একবার প্রকল্প এলাকায় আসেন।

থ্রিজি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অগ্রগতি শূন্য। প্রকল্প পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ ছাড় করাতে বেশ কয়েকবার মন্ত্রণালয়ে গিয়েও নানা জটিলতায় অর্থ পাননি।

ডিজিটাল সিলেট সিটি করপোরেশন প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন পায়। প্রকল্প পরিচালক ও উপপরিচালক নিয়োগ দিতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সিলেট জেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম শামসুদ্দীন পর্যালোচনা সভায় আসেননি।

ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে; কিন্তু এখনো কাজই শুরু হয়নি। পরিকল্পনামন্ত্রী প্রকল্পটির পরিচালক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের কাছে জানতে চান তিনি কোথায় থাকেন। উত্তরে হাবিবুর রহমান বলেন তিনি ঢাকায় থাকেন। তিনি সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা। তখন মন্ত্রী বলেন, ‘আমি সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে কথা বলব।’

প্রকল্প পরিচালক অজুহাত দেখিয়ে বলেন, কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করতে দেরি হওয়ার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি।

সভার একপর্যায়ে সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সড়ক ও জনপথ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। উল্টো তিনিই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেক সময় তাঁদের পাওয়া যায় না। কাজের অনুরোধ করলেও কাজ হয় না।

সভায় অনিয়মের তথ্য বা অভিযোগের পাশাপাশি ভালো কাজের উদাহরণও এসেছে। সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পের অগ্রগতিকে দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখালেন মন্ত্রী-সচিব। ৯ তলা একাডেমিক ভবন ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি গত বছর নেওয়া হয়। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির পরিচালক ড. আশুতোষ দাস জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করেছেন। এ প্রকল্প থেকে অন্যদের শিক্ষা নিতে বলেছেন মন্ত্রী-সচিব।

সভার প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আধুনিক জাতি হতে চাই। সেটা হতে গেলে আমার টাকার অপচয় বন্ধ করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন হলো প্রকল্প পরিচালককে এলাকায় থাকতে হবে। সেটা সবাইকে মানতে হবে। অবশ্যই একজন পিডিকে একাধিক প্রকল্পের পিডি হওয়া যাবে না; কিন্তু এটা মান্য হচ্ছে না। ঢাকায় গিয়ে এ বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনব। বাকিটা দেখবেন প্রধানমন্ত্রী।’

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: