সর্বশেষ আপডেট : ৪১ মিনিট ১ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

কমলগঞ্জে মৌ চাষে নীরব বিপ্লব, সরকারের উদ্যোগে স্থায়ী কেন্দ্র স্থাপনের দাবী

মো: মোস্তাফিজুর রহমান:: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ৪ শতাধিক চাষী মধু চাষ করে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। প্রথমে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও সরকারি আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই নিজেদের স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে দরিদ্র চাষীরা মধু উৎপাদন শুরু করলেও বর্তমানে বিসিক ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই পেয়েছেন স্বাবলম্বী হবার সুযোগ। পরির্বতন ঘটেছে পারবিারিক অবস্থায়। ৫-৬ বছর আগেও মধু চাষের বিষয়টি যে উপজেলার চাষীদের কেউ কল্পনাও করেননি অথচ আজ সেই চাষীরাই তাদের উৎপাদিত মধু বাজারজাত করে বছরে কোটি টাকা আয় করছেন। সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এ উপজেলা হয়ে উঠতে পারে মধুচাষের অন্যতম ক্ষেত্র।

মৌমাছি, মৌমাছি /কোথা যাও নাচি নাচি ছড়ার এই পংক্তিগুলো মাথার ভেতর ছিল। ছড়ার সূত্রেই জানা ছিল মৌমাছির এক রানি আছে। সেই রানির পিছে পিছে ছোটে সব মৌমাছি। এর পরই চলতে থাকে মৌমাছির ভিড়ে রানির খোঁজ।

কিন্তু রানির দেখা তো মেলে না। একবার পাহাড়ি এক জলার ধারে দলে দলে মৌমাছি এসে পানি পান করছে, আর ফিরে যাচ্ছে। সেখান থেকে মৌমাছিদের পিছু ধরা। একসময় বনের ভেতর দেখা মিলল মৌচাকের, দেখা মিলল রানির। কৌশলে রানিকে ধরা হলো, সুতা দিয়ে বেঁধে রাখা হলো এক স্থানে। দেখা গেল ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে অনেক মৌমাছি রানির কাছে ছুটে এসেছে। রানিকে ঘিরে গুন গুন করছে। এরপর বাড়িতে এনে রানিকে রাখা হলো একটি কাঠের বাক্সে। কয়েক দিনেই সেই বাক্স ও এর আশপাশ মৌমাছির গুঞ্জনে সরব হয়ে ওঠে। চার মাসের মধ্যেই বাক্সে জমল প্রায় আট কেজি মধু। ঘটনাটি ১৯৯৮ সালের। ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালকান্দি গ্রামের মধুশিকারি মো. আজাদ মিয়া। রানি মৌমাছি ধরার পর তাঁর মধু চাষে সাফল্য আসতে শুরু হলো। তার হাত দিয়ে প্রথম মধুচাষের সূচনা হয়।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মধু চাষের সংখ্যা। প্রথমে আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের মধ্যভাগ কালারায়বিল, ছয়ঘরি, কাঁঠালকান্দি, কোনাগাঁও, কানাইদাশী, রাজকান্দি, আধকানি, পুরান-বাড়ি, নয়াপত্তনসহ প্রায় ২৫টি গ্রামে চাষ হলেও বর্তমানে পৌরসভা, সমসেরনগরসহ আরো ইউনিয়নের মানুষ আগ্রহী হয়ে মধু চাষে মনোযোগী হয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৩৫টি গ্রামে বারো মাস মধু সংগ্রহ করা হয় এবং প্রায় ৪ শতাধিক চাষী মধুচাষে জড়িয়ে পড়েছেন। এই মধুচাষিদের অনেকেই এটাকে বাণিজ্যিকভাবে বাড়তি আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অনেকে একমাত্র জীবিকার উপায় হিসেবেও নিয়েছেন। এই মধু চাষের জন্য বাড়তি জমির প্রয়োজন নেই। ঘরের এক পাশে বা কোণে, বারান্দায় বা বাড়ির ঝোপঝাড়ের পাশে বাক্স রাখলেই চলে। মৌচাক বানানো, মধু সংগ্রহের বাকি কাজটুকু করবে মৌমাছি। একটি বাক্স থেকে এক মৌসুমে ৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। বছরে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়, শ্রাবণ ও পৌষ এই মাসগুলোতে মৌচাকে মধু ভালো জমে। এখানকার চাষীদের উৎপাদিত মধু মৌলভীবাজার, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয় চাষীদের। তার পর কেজি প্রতি ১০০০/৮০০ টাকা দরে বিক্রয় করেন চাষীরা। শুধু এলাকায় নয় প্রবাসীরাও মধু কিনে বিদেশ নিয়ে যাচ্ছেন। মধু সংগঠক আহমদ সিরাজ বলেন, ‘ আমার তিনটি বাক্স আছে। বছরে প্রতিটি বাক্স থেকে প্রায় ২৫ কেজি মধু পাই। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মধু বিলি করার পরও ১০/১৫ হাজার টাকা মিলে। আলাপকালে চাষী মোস্তাফিজুর রহমান, খালেদ অঅহমেদ নাজমুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, কোন ধরনের প্রশিক্ষন ছাড়াই নিজেদের চেষ্টায় তারা মধু চাষ করছেন। সরকারী উদ্যোগে চাষীদের প্রশিক্ষণ ও তাদের উৎপাদিত মধু বাজারজাত হলে যেমন আরও অধিক উৎপাদন সম্ভব হতো তেমনি বাজারমূল্য আরও বেশী পেতেন।

বিগত ৪বছর ধরে এ উপজেলায় মধুচাষে নিরব বিপ্লব ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজ মধু, দাশকুলি মধু, মাছি মধু, ঘামি মধু ও মধু মালতি- এ ৫ জাতের মধুর চাষাবাদ হলেও কমলগঞ্জে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হচ্ছে দাশকুলি মধুর বাক্স (অ্যাপিস সেরেনা) স্থাপনের মাধ্যমে। মধু চাষীদের বাড়িতে ২-৩টি করে মধু উৎপাদনকারী কাঠের বাক্স স্থাপন করা আছে। এসব বাক্স থেকে বছরে ৩ থেকে ৪ বার মধু সংগ্রহ করেন চাষীরা। স্বল্প খরচে এক একটি বাক্স থেকে ২৫-৩০ কেজি মধু আহরণ করা যায়। বছরে সংগ্রহীত মধু বিক্রি করে চাষীরা জনপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কেজি মধু উৎপাদন করছেন তারা। যার বাজারমূল্য কোটি টাকা। আর এ মধুচাষের কারণে তাদের ঘরে ঘরে এখন আর অভাব নেই বললেই চলে। প্রতিটি পরিবারে ফিরে এসেছে আর্থিক সচ্ছলতা।

প্রথমে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের প্রচেষ্টায় মধুচাষে সাফল্যের মুখ দেখায় এসব গ্রামের নারীরাও এখন নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন এতে। তারাও এখন ব্যস্ত দিন কাটান। শুধু তাই নয়, নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে তারা গড়ে তুলেছেন ‘কমলগঞ্জ উপজেলা মধুচাষী উন্নয়ন সমিতি’ নামে একটি সংগঠন।
কমলগঞ্জে মধু চাষী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শিক্ষক আলতাফ মাহমুদ বাবুল বলেন, এলাকায় মধু চাষের এমন নীরব বিপ্লব ঘটছে। বর্তমানে বিসিক ও কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারী সহযোগীতা পাচ্ছেন মধুচাষীরা। এই এলাকায় মধু চাষের একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। পুঁজির ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও সরিষার চাষাবাদ বৃদ্ধি করা হলে মধু চাষে আরো বিপ্লব হবে বলে দাবী করেন।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ. আর. সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: