সর্বশেষ আপডেট : ৫ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শাস্তির বদলে পদোন্নতি! লেক দূষণ রোধের ৫০ কোটি টাকা নয়ছয়

নিউজ ডেস্ক:: গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধে ৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। উদ্দেশ্য ছিল, লেকের পাড়ের যেসব বাসাবাড়ির আউটলেটের মাধ্যমে মানবসৃষ্ট পয়ঃবর্জ্য লেকের ভেতরে পড়ে, সেগুলো বন্ধ করে পানি দূষণ রোধ করা। ঢাকা ওয়াসা ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি শেষ করলেও দেখা যায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আউটলেটগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে। সেগুলো দিয়ে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি লেকের ভেতরে গিয়ে পড়ছে।

কাজ না করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ওই টাকা নয়ছয় করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটির রিপোর্টে এর প্রমাণ মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তবে গত দুই বছরে ওয়াসা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাকে উচ্চতর পদে বসিয়েছে। এর মধ্যে ওই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত কর্মকর্তা আটজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে পেয়েছেন বিস্ময়কর পদোন্নতি।

সম্প্রতি সরেজমিন লেক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, আউটলেটগুলো আগের মতোই বিদ্যমান। সেগুলো দিয়ে স্যুয়ারেজ বর্জ্য লেকে পড়ছে। গুলশান-২ নম্বরের ১০৩ নম্বর রোডের ১২ নম্বর হাউসের পেছনে দেখা যায়, বড় একটি পাইপ। সেটা দিয়ে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি লেকের ভেতরে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পানি। একই চিত্র দেখা যায় ১০৪ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়ির পূর্বদিকে। সেখানেও পাইপ দিয়ে স্যুয়ারেজের পানি লেকে পড়ছে। ৯৬ নম্বর রোডের পূর্ব পাশেও একই অবস্থা। দূষণে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তবে কিছু পাইপ দিয়ে বর্জ্য পড়তে দেখা যায়নি।

বারিধারার বাসিন্দা হাসিবুর রহমান জানান, লেকের সঙ্গে এ রকম অনেক আউটলেট আছে। এ কারণেই লেকের পানি দূষিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গুলশান-বনানী লেকেও এ ধরনের ৫০টি আউটলেট ছিল। আনিসুল হক মেয়র থাকাকালে ৪৫টি বন্ধ করা হয়েছিল। আরও পাঁচটি আউটলেট থেকে গেছে। কিন্তু গুলশান-বারিধারা লেকে এ রকম আউটলেট আছে অসংখ্য।

রাজধানীর ভিআইপি ও কূটনৈতিক এলাকা গুলশান-বারিধারার বাসিন্দারা লেক দূষণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিড়ম্বনায় রয়েছেন।এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে ২০১০ সালে ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘গুলশান-বারিধারা লেক দূষণমুক্তকরণ প্রকল্প’ গ্রহণ করে ঢাকা ওয়াসা। ওয়াসা ২০১৫ সালের মধ্যে কাজ শেষ করে কাগজপত্র দাখিল করে। এ সময় জানানো হয়, ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৫ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও এলাকাবাসীর কাছ থেকে লেক দূষণের অভিযোগ আসতে থাকে।

এর পরই বিষয়টি আমলে নেয় দশম জাতীয় সংসদের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির ১১তম বৈঠকের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব অমিতাভ সরকারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, লেক দূষণ রোধে যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল তা সফল হয়েছে কি-না, সফল হয়ে থাকলে কী কারণে লেক পুনরায় দূষিত হচ্ছে এবং এ জন্য দায়ী কে, তা চিহ্নিত করে রিপোর্ট দেওয়া।

কমিটির সদস্যরা সরজমিন পরিদর্শন করে দেখতে পান, লেকপাড়ের বাসাবাড়ির বর্জ্য লেকে পড়ার আউটলেটগুলো বন্ধ করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তা সফল হয়নি। প্রকল্প এলাকা সরজমিন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, এখনও গুলশান-বারিধারা লেকটি সরাসরি স্থানীয় জনগণের পয়ঃবর্জ্য ও মনুষ্যসৃষ্ট অন্যান্য বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই দেখা যায়, লেকের পানির দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার অনেক ঊর্ধ্বে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধে ঢাকা ওয়াসা ৫০ কোটি টাকার যে প্রকল্প নিয়েছিল, সেটি কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, কোনোভাবেই সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। তা ছাড়া এখনও অনেক আউটলেট দিয়ে পয়ঃবর্জ্য ও অন্যান্য মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য সরাসরি গুলশান-বারিধারা লেকে এসে পড়ছে। এ ছাড়া সর্বউত্তরে ডিওএইচএস ক্যানেলের বারিধারা অংশে দুটি আউটলেটের মাধ্যমে প্রচুর বর্জ্য গুলশান-বারিধারা লেকে পড়ছে।যার মধ্যে পূর্ব পাশের আউটলেট থেকে খুব বেশি পরিমাণে বিষাক্ত ও দূষিত বর্জ্য এসে পড়ছে।

যদিও ওয়াসার প্রতিনিধি দাবি করেন, গুলশান-বারিধারা লেক দক্ষিণে প্রবাহমান নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় এবং লেকের পানি প্রবাহমান থাকায় দূষণ তুলনামূলক কম। কিন্তু পরিদর্শন টিমের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, গুলশান-বারিধারা লেকে বর্তমানে পানির প্রবাহ নেই। লেকের পানি দূষিত হওয়ার বিষয়টি ওয়াসা গুরুত্ব দেয়নি। ঢাকা ওয়াসার প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হয়। এ জন্য প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা দায়ী মর্মে প্রতীয়মান হচ্ছে।’ ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হলে ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শও দেয় তদন্ত কমিটি।

নথিপত্রে দেখা যায়, প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ বিভাগের গবেষণা কর্মকর্তা কাজী মো. ফারুক হোসেন, একই বিভাগের সহকারী প্রধান মো. আব্দুল কাদের, উপপ্রধান মো. শামসুল আলম ও ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. জিএএম শওকত হায়াত খান। তবে প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই শওকত হায়াত খান অবসরে চলে যান। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা ওয়াসার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামানকে। প্রকল্পের পুরো খরচ তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদিকে, ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকার বিভাগে জমা দেয় কমিটি। এর মধ্যে তিন সদস্যের কমিটির মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব অমিতাভ সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব মো. জাহিদ হোসেন ও ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন। তবে প্রতিবেদনের সঙ্গে নোট দিয়ে লেখা হয়, ‘প্রতিবেদনে আতিকুর রহমান স্বাক্ষর করলেও তদন্ত প্রতিবেদনের সার্বিক মন্তব্যে দ্বিমত পোষণ করেছেন।’

সার্বিক মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ‘লেকের পানি দূষণমুক্ত করণের লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পটি দূষণ রোধে খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। তদুপরি লেকে এখনও অনেকগুলো বর্জ্যপানির আউটলেট বিদ্যমান, যা অপসারণ বা বন্ধ করার দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার। এ ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি। এ কারণে তাদের ব্যর্থতার দায়িত্ব ডিপিপি ও আরডিপিপি প্রদানের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার ওপর বর্তায়।’

২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ঢাকা ওয়াসাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘এ জন্য দায়ী কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরকে চিহ্নিত করে বিভাগীয় মামলা দায়েরপূর্বক আগামী এক মাসের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে।’

কিন্তু এতদিনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি-না, সে প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে গেলে জনতথ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেন, এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে রাজি নন। তবে ঢাকা ওয়াসার সচিব আ ন ম তরিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওই ঘটনায় ওয়াসা কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে তার জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান অমিতাভ সরকার বলেন, তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার পর তিনি আর কোনো খবর রাখেননি। তার দায়িত্ব ছিল রিপোর্ট দেওয়া। তিনি সেটাই করেছেন।

এদিকে মন্ত্রণালয় থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও প্রকল্প পরিচালক মো. আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পরে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। গত বছর তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ আট কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী আ. মান্নান বলেন, তদবির ও টাকার জোর আর সিবিএর কারণে এসব সম্ভব হয়েছে।

এ বিষয়ে আক্তারুজ্জামান বলেন, ওয়াসার যে কোনো বিষয়ে তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব জনতথ্য বিভাগের।কথা না বাড়িয়ে জনতথ্য বিভাগে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। জনতথ্য বিভাগে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, কারও ব্যক্তিগত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জনতথ্য বিভাগ কথা বলে না। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাই বলবেন।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ. আর. সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: