সর্বশেষ আপডেট : ৪১ মিনিট ২২ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সিলেটের স্কুলছাত্র আজিজের দেখা অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধার গল্প

তাসনিম আজিজ:: আমার মা একজন শিক্ষিকা। প্রতিদিন ভোরে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যাই। আমি ব্লু-বার্ড স্কুলে এন্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। হাঁটার পথে হঠাৎ একদিন চৌরাস্তের মোড়ে কানে ভেসে আসলো “হ্যালো জেন্টলম্যান” কেমন আছো? তেমন একটা গুরুত্ব দেইনি। পরের দিন ঠিক একই শব্দ আমার কানে বাজল। আমার মা মৃদু হেসে জবাব দিয়ে হুইল চেয়ারে বসা লোকটাকে কিছু খুচরা টাকা বের করে দিলেন। মা ও বাবা দুজনেই ব্যস্ত থাকার কারণে মাঝে মাঝে আমি একা একা বাসায় ফিরি। একদিন বাসায় ফেরার পথে হুইল চেয়ারে বসা লোকটা আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘জেন্টলম্যান খেয়াল করে হাঁটতে পার না? একটু হলেই তো ড্রেনে পড়ে যেতে। ‘ লোকটার কথা শুনে মনে মনে কৌতুহল জাগলো লোকটা কি প্রতিদিন আমাকে “Follow” করে। কথাবার্তা শুনে মনে হয়না লোকটা সাধারণ কেউ। তাই ইচ্ছা হল লোকটার আসল পরিচয় জানার।

গ্রামের নাম হাছননগর, সুনামগঞ্জ। সেখানে জন্ম নেয় দুরন্ত এক কিশোর নাম তার জাবেদ। সে ১৯৩৬ সালের ১৫ই ডিসেম্বর (১৩৪৩ বংলা সনের ১লা পৌষ) শনিবার দুপুর ২ টায় জন্মগ্রহণ করে জাবেদ। ছোটবেলায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে নদীতে সাঁতার কাটত,খেলা করত, ঘুরি উড়াত। সারাটা গ্রাম টই টই করে ঘুরে বেড়াত। বেশি দিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় নি। এক রকম দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলো। বিয়ের বয়স হওয়ায় বিয়ে করে ফেললেন। তার বিয়ের ১০-১৫ দিন পর শুরু হয়ে গেলো মুক্তিযুদ্ধ। তখন সারাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির উপর হামলা চালাল। দেশের অবস্থা খারাপ দেখে ২৬ বছরের তরুণ যুবক দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

যেই ভাবা সেই কাজ। তারা ১৩ জনের একদল একসাথে পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে গিয়ে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে তাদের বোকা বানিয়ে তাদের হাতে অস্ত্র চালানো শিখলেন। তারপর তাদের অস্ত্র দিয়ে নানা ছলে-বলে কৌশলে তাঁদেরকেই গুলি করে মারেন। তারপর গাড়িতে, প্লেনে করে মিলিটারিরা আসলো। তখন তারা ইন্ডিয়াতে চলে যান। সেখানে মেজর মুতালিব তাদের ট্রেনিং দেন। ট্রেনিং শেষে মেজর তালেবকে কামান্ডার হিসাবে বাছাই করেন। তাঁর কামান্ডে তারা যুদ্ধ শুরু করেন। তাদের প্রথম অপারেশন হয় বেরিগাওয়ে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মারা যান তালেব। সেখান থেকে যুদ্ধ করতে করতে তারা ৯টি ক্যাম্প তৈরি করেন। তিনি ছিলেন টেকেরঘাটের ৯ নম্বর ক্যাম্পে। তাদের ক্যাম্পের কামান্ডার ছিলেন মেজর মুতালিব। যুদ্ধের সময় জাবেদ এসএল আর অস্ত্র চালাতেন। তিনি শত্রুদের মারপিট করতেন তাই মেজর তাঁর নাম দিয়েছেন পাগলা জাবেদ। সেখান থেকে তিনি ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেন। যুদ্ধের সময় তাঁর চোখের সামনে তাঁর বাবাকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করে।

ওফ! শেষ পর্যন্ত আমি সব ঘটনাটা জানতে পারলাম। আমি গর্বিত এই মানুষটার জন্য, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে আমাদের সোনার বাংলা উপহার দিয়েছেন।এখন তাঁর আরাম-আয়েস করে থাকার কথা কিন্তু জীবিকার তাগিদে আজ হুইল চেয়ারে বসে হয়তো ৫০-১০০ টাকার জন্য তাকে রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। যার জন্য আজ আমরা এই দেশে স্বাধীনভাবে হাঁটতে, কথা বলতে, এই বাংলা ভাষায় লিখতে পারছি সেই মানুষটা আজ অবহেলিত। এই ভাষা এই মাটির জন্য যুদ্ধ করে আজ তিনি জীবিকার তাগিদে রাস্তায়!

সত্যিকার অর্থে আমার লজ্জা লাগে এই মুক্তিযুদ্ধার দিকে থাকাতে। কি-ই বা ভাবছেন তিনি আমাদের নিয়ে? আমার কাছে মনে হয় আমরা কি আসলেই স্বার্থপর? প্রতিদিন কত মানুষ আসে এই পথ দিয়ে অথচ কেউ তাঁর (জাবেদের) আসল পরিচয় জানে না, কে তিনি কি করেছেন তিনি দেশের জন্য। তাঁর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম তিনি কানে কম শুনেন, লিভারে সমস্যা, বয়সের সাথে শরীরে বাড়ছে নানা রোগ। অচল এই শরীর নিয়ে ঝড়, বৃষ্টি, রোদে জীবিকার লড়াই করে যাচ্ছেন।

আমি ক্ষুদ্র এই লেখকের কথা কি কারো চোখে পড়বে? দেশের সরকার বা সমাজের কোন হৃদয়বান ব্যক্তি কী এগিয়ে আসতে পারে না এই গর্বিত মুক্তিযুদ্ধার প্রতি? যার অস্থায়ী বসতি নূরানি পুকুরপাড়ের পাশে এই হুইল চেয়ার। আমরা তো অনেক শ্রদ্ধা জানাই জানাই সেই সব শহীদের প্রতি কিন্তু যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের কতটুকু শ্রদ্ধা করছি?

লেখক: তাসনিম আজিজ,৬ষ্ঠ শ্রেণী, ব্লু-বার্ড স্কুলে এন্ড কলেজে।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: