সর্বশেষ আপডেট : ১৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

এটা ইরাক বা লিবিয়া নয়, অন্য কিছু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: এটা ইরাক বা লিবিয়া নয়, এ অন্য কিছু। প্রতিদিন এখানে ৩০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। তুরস্কে আপনাকে স্বাগত, কিন্তু সিরিয়া যাবেন কিনা, ভাবুন। দরকার হলে সময় নিন। ওরা আপনাকে মেরে ফেলতে পারে।

এভাবেই সিরিয়ার বাসিন্দা একজন বাস্কেটবল প্রশিক্ষক থেকে মানব পাচারকারী হয়ে ওঠা নাদির সাবধান করছিলেন স্প্যানিশ সাংবাদিক রিকার্ডো গার্সিয়া ভিলানোভাকে।

২০১১ সালে সহকর্মী সাংবাদিক হাভিয়ের এসপিনোসার সঙ্গে গার্সিয়া অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ায় ঢুকতে চেয়েছিল। কয়েক মাস পরে জঙ্গি দলগুলো প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে চলা লড়াই ছিনতাই করে নেবে।
যে লড়াইকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বলা হচ্ছে। যুদ্ধে পাঁচ লাখের বেশি মারা গেছে, বাস্তুহারা হয়েছে ৬০ লাখ মানুষ।

কিন্তু ততক্ষণে গার্সিয়া ঢুকে পড়েছেন, পরবর্তীতে তাকে আটক করে তথাকথিত জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

গার্সিয়া বলেন, সিরিয়াতে যখন জিহাদি দলগুলোর প্রতিপত্তি বেড়ে যায়, তখন অবস্থাটা এমন দাঁড়ায় যে তাদের কোন একটি দলের কাছে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েকদিন আটকে থাকা যেন একটা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সেখানে আপনার ভালো যোগাযোগ থাকলে একটু দূর থেকে ঝামেলা ছাড়াই কাজ করতে পারবেন আপনি। তাছাড়া ঐ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তখন ছিল ফ্রি সিরিয়ান আর্মির হাতে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো যখন ইসলামিক স্টেট আরো বেশি ভূমি দখল করতে থাকলো এবং ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে শুরু করলো।

ওদের সাথে আমার প্রথম সরাসরি অভিজ্ঞতা হয় ২০১২ সালের মাঝামাঝি আলেপ্পো শহরে। যখন তারা একটিমাত্র দলে সংগঠিত হয়নি এবং তখনো ওদের মধ্যে সিরীয় এবং বিদেশিদের মিশ্র দল ছিল।

ওই সময়টাতে আমি বন্ধু ইয়াসেরের বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলাম। যখন আসাদ বাহিনী শহর অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো আর ভীষণ লড়াই হচ্ছিল, আমার সেই বন্ধু ছিল সেখানকার একমাত্র প্রশিক্ষিত চিকিৎসক।

আমি কয়েক মাস যাবত সেখানে বসবাস করছিলাম, যাতে সেখানে আমার যোগাযোগ এমন পোক্ত হয় যে আমাকে আইএস বা অন্য কাউকেই ভয় পেতে হবে না।

এক রাতে তারা ইয়াসেরের বাড়িতে উপস্থিত হলো আর আমাকে ধরে নিয়ে গেলো। আমাকে অপহরণ করা হলো এবং ১১দিন আটকে রাখা হলো। ফ্রি সিরিয়ান আর্মি তখনো শহরে প্রভাবশালী ছিল। ফলে তারা আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তাদের জানানো হলো হয় তারা আমাকে ছেড়ে দেবে নতুবা তাদের হত্যা করা হবে।

আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো। কিন্তু এরপরেও আমাকে তিন সপ্তাহ আলেপ্পোতে থাকতে হলো নিজের অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার জন্য।

২০১৩ সালে আমি সাংবাদিক এসপিনোসার সঙ্গে দের আল জোর শহরে যাই। আমরা ওখানে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমরা থাকতে থাকতেই সেখানকার ক্ষমতার পালাবদল হচ্ছিল। শহরে পৌঁছানোর জন্য আমাদের ছয়টির বেশি আইএস চেকপয়েন্ট পার হতে হতো।

আমরা অপহরণের গল্প শুনেছি এবং আইএস যোদ্ধারা লোকভর্তি ছোট বাসের সবাইকে মারধর করছে এমন ঘটনা দেখতাম। শহরটিতে আমরা তিন সপ্তাহ ছিলাম। এরপর আমাদের ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সশস্ত্র গার্ডসহ একটি গাড়িতে করে অন্য শহরে নেয়া হচ্ছিল। আইএস যোদ্ধারা চেকপয়েন্টে আমাদের গাড়ি থামালো, এরপর আমাদের কাছেরই একটি ভবনে নিয়ে গেলো।

এখানেই আমাদের আট মাসের বন্দি জীবনের প্রথম ১৫ দিন কাটাই। সিরিয়ার উত্তরে আমাদের আইএসের বিভিন্ন বন্দিশালায় ঘোরানো হয়েছে, যেখানে বন্দিদের নির্যাতন এবং হত্যা ছিলো রোজকার ঘটনা।

ওটা ছিল আইএসের এক অদ্ভুত জগত যেখানে ছোট ছেলেদের সিগারেট খাওয়ার জন্য ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো।হাসপাতালের একজন রিসিপশনিস্টকে তো মেরেই ফেলেছিল।

আমাদের জেলখানায় আমরা আরেক ধাপের অমানবিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিষাদের মধ্যে পড়লাম। সেই সঙ্গে কয়েক মাস পরে আমরা অন্যান্য পশ্চিমা জিম্মিদের খোঁজ পেলাম। তাদের একজনের সঙ্গে আমার বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আমরা লিবিয়া যুদ্ধের সময় থেকে পরস্পরকে চিনি এবং সিরিয়াতেও একাধিক জায়গায় এক সঙ্গে গিয়েছি।

তার অপহরণের আগের দিন আমরা একসঙ্গে আলেপ্পো গেছি। পরে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। মুক্তির দিনটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাকে এবং হাভিয়েরকে তুরস্ক সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা যখন সামনে এগুচ্ছি, তারা আমাদের পেছনেই ছিল। তুর্কি সীমান্তরক্ষীরা আমাদের যখন দেখলো, তারা শুরুতেই গুলি ছুড়লো।
আমার ধারণা তারা আমাদের আইএস জিহাদি ভেবেছিলো। আমরা দুইজনেই তখন ভাবছি আইএসের কাছে ফেরার চেয়ে সামনে এগিয়ে গুলি খেয়ে মরা ভালো।

পরে ওই গার্ডরা অবৈধভাবে সীমান্ত পার হবার জন্য আমাদের জরিমানা করতে আসলে সেই কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে।
মুক্তি পাবার পরেও ২০১১ সালে যে কাজটি শুরু করেছিলাম আমি, ছবিতে বিদ্রোহের সময়কে লিপিবদ্ধ করা, সেই ছবি তোলার কাজটি চালিয়ে গেলাম।

কিন্তু ততদিনে বিষয়টি আর কেবল বিদ্রোহ ছিল না, তখন আইএসের কর্মকাণ্ডকে লিপিবদ্ধ করাটাই বাস্তবসম্মত ছিল।
বিদ্রোহীরাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন শত্রু।

আমি লিবিয়ার সির্তে, ইরাকের মসুল এবং সিরিয়ার রাক্কা শহরের ছবি তুলেছিলাম। এসব শহরের যুদ্ধের ছবি তুলেছিলাম আমি। ইরাক ও সিরিয়ার অন্য শহরের ছবিও তুলেছিলাম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমি আরব ও ইউরোপীয় জিহাদিদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। এর মধ্যে ইউরোপীয় নারী যোদ্ধাও আছেনে। আমি ছবি তোলার সময় এমন অনেক জিহাদি দেখেছি যারা নিজের বিশ্বাসের জন্য জীবন দিয়েছে।আবার এমন যোদ্ধাও দেখেছি যারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে চেষ্টা করেছে।

নিজেদের ভেতর বিশ্বাসের অভাবে অনেকে আইএসে নেতৃত্বে যাবার সম্ভাবনা থাকার পরেও পালিয়ে গেছে। আমার পর্যবেক্ষণ হলো যুদ্ধ একজন মানুষের ভেতরকার ভালো বা মন্দ যে কোনো দিকই বের করে আনতে পারে, কিংবা কোন ক্ষেত্রে দুটো একসঙ্গে। মানে যুদ্ধ আমাদের বদলাতে পারে না, কেবল আমরা যা ঠিক তাই বের হয়ে আসে।




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: