সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিচ্ছিন্নতার দেওয়াল না মানবিক বিবেচনাবোধ!

গোলাম মোর্তোজা ::

‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘বহিরাগত’-রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অস্থিতিশীল’ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে। এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ‘অশুভ শক্তি’র সম্পৃক্ততা দেখছেন উপাচার্য। সে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বহিরাগত’ মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। নিতে যাচ্ছেন বেশ কিছু উদ্যোগ। এ প্রেক্ষিতে কিছু কথা।

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি উন্মুক্ত এলাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে ঢাকা শহরের পুরনো ঢাকার একটি অঞ্চলের মানুষ যাতায়াত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে কোনো দেওয়াল নেই। উপাচার্য বলেছেন, প্রবেশ মুখগুলোতে নিজস্ব ‘নিরাপত্তা’ চৌকি বসানো হবে। শিক্ষার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা চৌকি বসাতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে বাস-গাড়ি প্রায় অবাধে যাতায়াত করে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্যে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও নিতে পারেন। কিন্তু মানুষের যাতায়াত কী নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে বন্ধ করা সম্ভব? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সক্ষমতা আছে?

শত শত নয়, হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে। কে শিক্ষার্থী, কে বহিরাগত, নিরূপণ করার জন্যে সবার পরিচয় জানতে হবে। সেটা কি সম্ভব? তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরতে হবে। গলায় ঝোলাতে হবে পরিচয়পত্র। পুরনো ঢাকার মানুষের যাতায়াতের জন্যে নির্মাণ করতে হবে আলাদা সড়ক।

কোন জায়গা দিয়ে নির্মাণ হবে সড়ক, কোথায় সেই জায়গা?

২. মেট্রো রেলের একটি স্টেশন থাকার কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে। মেট্রো রেলে কী শিক্ষার্থীরাই থাকবেন, না আরও যাত্রী থাকবেন? তারা তো নামবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে। সেখানেও নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে শিক্ষার্থী, বহিরাগত সনাক্ত করা হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতর থেকে বাংলা একাডেমি সরিয়ে নিতে হবে।

টিএসসির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো পহেলা বৈশাখের সব আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হবে? আয়োজনের স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে? শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেবেন?

প্রাক্তন ছাত্ররা অনুমতি ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। অনুমতি দেবেন কে? নিরাপত্তা চৌকির প্রহরীরা অনুমতি দিতে পারবেন? কী দেখে অনুমতি দেবেন? এটা কত বড় এবং অসম্ভব কর্মযজ্ঞ তা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ধারণা আছে?

৩. এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা অসম্ভব বিষয় বলেই মনে হয়।

এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাবছেন মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আগের দিন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে তালেবান নেতা মোল্লা ওমর, আল কায়েদা নেতা লাদেনের মতো জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা দেখেছেন উপাচার্য। তীব্র সমালোচনা হয়েছে, উপাচার্য হয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের তালেবান বা আল কায়েদার মতো জঙ্গি বলতে পারেন কিনা? পরের দিন ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের জঙ্গি বলেননি। তিনি বলেছেন, মোল্লা ওমর বা লাদেন যেভাবে ভিডিও পাঠায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা সেভাবে ভিডিও বার্তা পাঠাচ্ছে। এ কারণেই তিনি তালেবান-আল কায়েদার সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনের তুলনা করেছেন।

কোনো মানুষ জেনে-বুঝে তালেবান নেতা মোল্লা ওমর বা আল কায়েদা নেতা লাদেনের কাজের ধরনের সঙ্গে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের তুলনা করতে পারেন? তুলনা করা যায়?

৪. উপাচার্য বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে। ‘হঠাৎ করে একদল অনুপ্রবেশকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে মাইক নিয়ে সমাবেশ করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে পারবে না।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে ‘অনুপ্রবেশকারী-বহিরাগত’ ঢোকার অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তিনি এ কথা বলেছেন।

অনেক পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। গত এক বছরে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি ঘটনাও আছে যে, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বহিরাগত’-রা মাইক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে পরিবেশ নষ্ট করেছে?

পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ করার কারণে। যারা একটি সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন, সেই নুরুলরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ কথা সত্যি যে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, সাবেক শিক্ষার্থীরা আছেন। আছেন অন্যান্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ন্যায্যতার দাবিতে করা একটি আন্দোলনের সঙ্গে অন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হলে তাদেরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বহিরাগত’ বলে দেওয়া যায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কোন আন্দোলনে অন্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না? ৫২, ৬৯… সর্বশেষ ৯০, সব ইতিহাস উপাচার্য ভুলে গেলেন?

যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়েই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্ব করে। এভাবে ‘বহিরাগত’ মুক্ত করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো তার চিরন্তন চরিত্র হারিয়ে ফেলতে পারে।

৫. উপাচার্য বলেছেন, তিনি ফেসবুক দেখেন না। তার একজন কলিগ তাকে একটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েছেন। তা দেখেই তিনি ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন জঙ্গি ধরনের’- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন। অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ, চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন সেই ভিডিওটি কোথায় আছে? যা দিয়ে প্রমাণ হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন জঙ্গি ধরনের? উপাচার্য বা তার সেই কলিগ এখনো চ্যালেঞ্জের জবাব দেননি। আদৌ তাকে কোন ভিডিও বা কোন দেশের ভিডিও দেখানো হয়েছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রথম তিনদিন শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে, উপাচার্য-প্রক্টর তা জানতেই পারেননি! তাদের কোনো কলিগ, সে সবের কোনো ভিডিওচিত্র দেখাননি। নুরুল যে শিক্ষকের পা জড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন, সেই ভিডিওচিত্রও উপাচার্য দেখেননি। সমস্যা হলো, উপাচার্য নিজে এসব দেখেন না। কোনো কলিগ দেখালে তিনি দেখবেন। এমন কোনো শিক্ষক কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, যিনি উপাচার্যকে শিক্ষার্থী নিপীড়নের, ছাত্রী লাঞ্ছনার ভিডিওচিত্রগুলো দেখাতে পারেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি তদন্ত করে দেখে যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যাদের পিটিয়ে আহত করা হয়েছে তাদের মধ্যে কয়জন ‘বহিরাগত’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’? নুরুলরা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তা উপাচার্যকে তার কোনো কলিগ কি জানিয়েছেন বা জানাবেন?

তার সন্তানসম শিক্ষার্থী ফারুকদের চিকিৎসা না দিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, হাতুড়ি দিয়ে পা ভেঙ্গে দেওয়া গুরুতর অসুস্থ তরিকুলকেও রিমান্ডে নিতে চাওয়া হচ্ছে- উপাচার্য কী জানেন এই তথ্য?

উপাচার্যের বাড়ি ভাংচুরের দায় কোটা আন্দোলনকারীদের উপর চাপানোর একটা চেষ্টা শুরু থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। তদন্তে মনোযোগ না দিয়ে বা তদন্ত না করে দায় চাপানোর এই প্রচেষ্টা ভিন্ন কোনো কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। অহেতুক বা অন্যের দায় শিক্ষার্থীদের উপর চাপালে বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ অস্বাভাবিক কিছু নয়।

৬. উপাচার্য বলেছেন, আন্দোলনে মেয়েদের ‘ব্যবহার’ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্যে ‘ব্যবহার’ শব্দটি সম্মানজনক নয়। উপাচার্য বলছেন, মেয়েরা রাতের বেলা হলে স্লোগান দিয়ে অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করছে। এ কথা সবারই জানা আছে এবং থাকা দরকার যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আন্দোলন বা মিছিলে ‘ব্যবহার’ করা যায় না। রাতে তাদের হল থেকে বের করে আনা হয়নি, স্লোগান দেওয়ানো হয়নি। বের করে আনা বা স্লোগান দেওয়ানো সম্ভব না। সবই তারা করেছেন নিজেদের বিবেচনাবোধ থেকে।

সরকারি ছাত্র সংগঠন জোর করে মিছিলে নিতে চায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে তা যতটা সফল হওয়া যায়, মেয়েদের ক্ষেত্রে ততটা হওয়া যায় না। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাহসী অংশগ্রহণ ছিল, যা উপাচার্যের অজানা থাকার কথা নয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। প্রথমে পুলিশ-র‌্যাব, পরে ছাত্রলীগ কর্তৃক নুরুলরা নির্যাতিত হওয়ার প্রতিবাদে তারা আরও বেশি প্রতিবাদী হয়েছেন।

৭. নিরাপত্তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিচ্ছিন্ন’ করার চিন্তা না করে, জঙ্গি না খুঁজে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি সংবেদনশীল মন এবং মানবিক বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন, মুহূর্তেই জটিলতা অনেকটাই কেটে যেতে পারে।

সূত্রঃ দ্যা ডেইলি স্টার




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: