সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৮ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আমরা ছুটে চলেছি আর মেঘ পেছন থেকে আমাদের ধাওয়া করছে

শিমুল খালেদ ::

পাহাড়চূড়া থেকে পিচঢালা মসৃণ ডাউনহিল নেমে গেছে ইয়াংছা বাজারের কিছুটা আগে। সেটি ধরে নামার সময় মোটরবাইকে আচমকা ব্রেক কষতে হলো। কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়েছে! বাইকের ব্যাকসিট থেকে নেমে উল্টোদিকে জোরে পা চালাই। শব্দ শোনার স্থানে গিয়ে বাইক থেকে পড়ার মতো কিছু চোখে পড়ল না। তবে বুনো ফলের মতো কিছু একটা পড়ে আছে পাকা রাস্তার মাঝ বরাবর। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি। আদতে ফলের মতো হলেও সেটি মাকাল ফলের মতোই এক জাতের জংলি গোটা। চোখ তুলে তাকাই ওপরের দিকে। পাহাড়ের গাছপালার সাথে লিয়ানার মতো জংলি লতার বুনোট হেলে রাস্তার ওপর পর্যন্ত চলে এসেছে। জায়গাটি ধরে যাওয়ার সময় কোনো গাছ থেকে সেটি পড়েছিল। আমরা তার শব্দ শুনেছিলাম। শক্তপোক্ত খোলসের অচেনা জংলি গোটা দেখছিলাম নেড়েচেড়ে। এরই মধ্যে বাইক থেকে রুবেল হাঁক ছাড়ল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা গায়ে পড়তে শুরু করেছে। ইয়াংছা বাজারে পৌঁছার আগেই মোটামুটি ভিজে যাই। সেখানে বাইক থামিয়ে ঝড়ের গতিতে একটা রেস্টুরেন্টের বারান্দায় ঢুকে পড়ি। বৃষ্টি বাড়তেই থাকল। উনুনের গরম কড়াইয়ে তখন শিঙ্গাড়া চড়ানো হয়েছে। ঝুম বৃষ্টির সময় গরম শিঙ্গাড়া দেখলে জিভটা শুকনো রাখা বেশ মুশকিল! প্লেটে কয়েকটা শিঙ্গাড়া নিয়ে বারান্দায় চেয়ার টেনে বসি।

মোটরবাইকে লামা বেড়ানোর রোমাঞ্চকর আইডিয়াটা বাতলে দিয়েছিল রুবেল। শুনে লোভ সামলানো কঠিন ছিল। চকোরিয়ার পর ফাঁসিয়াখালী হয়ে আমরা বামে মোড় নিলাম। তার পর পথের পুরো ছবিটাই পাল্টে গেল। ভারী যানবাহনে ব্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হুট করেই যেন মিলিয়ে গেল! তার বদলে ফিতার মতো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে ঢুকে পড়েছি। এ যেন বায়োস্কোপের পর্দায় পাল্টানো ছবি! এই রাস্তাটিই লামা-আলীকদমে গিয়ে মিশেছে। একটু পরপর পাহাড়ের বাঁক। রাস্তার গা ঘেঁষে ঘন ঝোপঝাড়। তারপর বড় বড় পাহাড়ি গাছপালার বুনোট। পথের বাঁক ঘোরার সময় একটি সাইনবোর্ড টানানো দেখলাম। জায়গাটি হাতি চলাচলের পথ- সাবধান করে সেটা নির্দেশ করা হয়েছে। তারপর সামনে পড়ল বেইলি ব্রিজ। তার নিচে টলমলে সুন্দর পানি আর বালুময় পাহাড়ি ছড়া। নাম রাংগাঝিরি। সামনে কয়েকটি আপহিল পড়ল। চান্দের গাড়ি আর ডালপালা-লাকড়ি বোঝাই ভ্যান দেখলাম কয়েক বার। তবে বড় যানবাহন নেই বললেই চলে।

পাহাড়ের কোলে ছিমছাম ছোট বাজার ইয়াংছা। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দেখছিলাম। এরই মধ্যে চোখে পড়ে পাহাড়ি একটি শিশু দোকানের খুঁটি ধরে অপলক তাকিয়ে আছে। ফুটফুটে মারমা শিশুটিও তার মায়ের সাথে বৃষ্টিতে আটকা পড়েছে। এক সময় বৃষ্টি থামল। ইয়াংছা বাজারের পর সামনে পড়ল লম্বা এক আপহিল। উঠছি তো উঠছিই! গিরি খাদ আর রাবার বাগান পাশে ফেলে আপহিলটা শেষ হলো মিরিঞ্জা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে। মিরিঞ্জায় গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটন স্পট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় দেড় হাজার ফুট। আবহাওয়া পরিস্কার থাকলে চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে আঁকাবাঁকা ফিতার মতো মাতামুহুরী নদী দেখা যায়। আরও দেখা যায় মহেশখালী দ্বীপ, এমনকি বঙ্গোপসাগর। হালকা বিরতি নিয়ে আবারও পথচলা। পাহাড়ি এই রুটের পুরো পথটাই এককথায় অসাধারণ। আপহিল আর ডাউনহিলের ওঠানামা যেন পাহাড়গুলোকে পরস্পর গেঁথে দিয়েছে। মাঝে মাঝে পাহাড়ের চূড়ায় বাইক নিয়ে থেমে পড়ছিলাম। আর মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম দিগন্তের শেষবিন্দু পর্যন্ত। মনে হচ্ছিল বাইক নয়, যেন রোলার কোস্টারে চড়েছি! ডাউনহিল ধরে নিচে নেমে যাওয়া আর আপহিল ধরে চূড়ায় ওঠা। পাশে আজদাহা অজগরের মতো হাঁ করা গিরি খাদ। যত দূর চোখ যায় সবুজ কার্পেটে মোড়ানো ছোট-বড় পাহাড়ের সারি। ওদিকে আকাশে নানা রঙের মেঘদল ঘোঁট পাকাচ্ছিল। পাহাড়ের কোনোটিতে জুমের ফসল বোনা হয়েছে। জুম ক্ষেতের মাঝে বাঁশ-বেত-ছন দিয়ে বানানো জুমঘর। এ রকম একটি পাহাড়ের পাশে থামলাম। জুমে পেঁপের বাগান করা হয়েছে। হলুদের ক্ষেতে ফুল এসেছে। পাশের পাহাড়ের সেগুনবনেও ফুল দৃশ্যমান। ফুলে ফুলে ভোঁ ভোঁ করছে ভোমরার দল। আবার বৃষ্টি। নির্জন পথে আচমকা বৃষ্টিতে পড়া এক পথিকের দেখা পেলাম। ছাতা নেই, তাই বড়সড় একটি সেগুনপাতা মাথার ওপর ধরে পথ চলেছেন। একটা জায়গায় বেশ কয়েকটি কাঁচা বাঁশ আড়াআড়িভাবে রাস্তায় ফেলে রাখা। গাড়ির চাকায় পিষে বাঁশগুলো ফাটিয়ে নিতেই এমন আইডিয়া। ফাটানো বাঁশ লাগানো হবে ঘরের বেড়া দেওয়ার কাজে। লামা পর্যন্ত বাকি পথের পুরোটাই ডাউনহিল। ঢালু পথ ধরে ক্রমশ সমতলে নেমে এলাম। বামে মোড় নিয়ে আমরা লামা সদরে প্রবেশ করলাম। ডানের রাস্তাটা চলে গেছে আলীকদম।

ছিমছাম এক মফস্বল শহর লামা। চারপাশটা উঁচু উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। তবে শহরের প্রায় পুরোটাই পড়েছে সমতলে। লামার ব্যবসায়ী সেলিম ভাই রুবেলের পরিচিত। তার দোকানের পাশে বাইক রেখে আমরা শহরটি দেখতে বের হলাম। শহরে বাঙালিরা সংখ্যায় বেশি হলেও পাহাড়িদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। বয়স্ক এক পাহাড়ি মহিলাকে দেখলাম কোমর পর্যন্ত নেমে আসা ঝাঁঝরের মতো পাহাড়ি সংস্কৃতির পোশাক পরে থাকতে। লামা পোস্ট অফিস ভবনটি দেখতে বেশ পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে। তার পাশে পেটানো শরীরের এক পাহাড়ি দাদা জ্বালানি কাঠের আঁটি নিয়ে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। এরই মধ্যে সেলিম ভাই তার বাসায় নিয়ে যেতে পীঁড়াপীড়ি শুরু করলেন। তার আতিথেয়তা ফেলার উপায় ছিল না। টুকটাক কথার ফাঁকে লামা নিয়ে তার কাছ থেকে নানা গল্প শুনি। অবাক হতে হলো এটা জানার পর, লামায় নাকি বন্যাও হয়! পাহাড়ি ঢলে কখনও ঘরবাড়ি হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। তখন পিচঢালা পথের ওপর নৌকা চলে!

আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা বাড়তে থাকায় রুবেল তাড়া দিল। তাই লামা বাজার আরেকটু ঘুরে দেখায় ইতি টেনে বাইকে চড়ে বসতে হলো। ফেরার পথে দেখি কয়েকজন পাহাড়ি নারী তরিতরকারি বিক্রি করছেন। বাঁশ কোড়ল আর জুমের সবজি, ফলমূল। এক আঁটি বাঁশ কোঁড়ল নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন- বিছ থ্যাকা। আমাদের যাওয়ার পথের ডাউনহিলগুলোই ফেরার পথে আপহিল হয়ে গেল। দিনের আলো আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। তার ওপর দূরে কালো মেঘের কুণ্ডলীগুলো চোখ রাঙাচ্ছিল। আমরা ক্রমশ ওপরে উঠতে থাকলাম। ওদিকে দূরের কুণ্ডলীও ক্রমে আমাদের দিকে সরে আসতে থাকল। মেঘের ঘন ঘোর চেহারায় দিনের অবশিষ্ট আলোটুকুও হারিয়ে গেল। হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে চলতে থাকি। আমরা ছুটে চলেছি আর মেঘ পেছন থেকে আমাদের ধাওয়া করছে। এ যেন মেঘের সাথে কানামাছি খেলা! মিরিঞ্জা পাহাড়ের কাছাকাছি আসার পর মেঘ আমাদের ধরে ফেলল। পাহাড় কাঁপিয়ে নামতে শুরু করেছে বৃষ্টি। ভাগ্যিস, ততক্ষণে পর্যটন কেন্দ্রের ভেতরে আশ্রয় নিতে পেরেছিলাম। প্রায় আধ ঘণ্টা পর বৃষ্টি হালকা হয়ে এলে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। যেতে হবে তখনও অনেকটা পথ।

কীভাবে যাবেন :কক্সবাজারগামী বাসে চেপে নামতে হবে চকোরিয়া উপজেলায়। সেখান থেকে লামার দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। চকোরিয়া থেকে লামা আর আলীকদমের উদ্দেশে ছেড়ে যায় চান্দের গাড়ি আর বাস। তার কোনো একটির যাত্রী হলেই হলো! সময় হাতে থাকলে লামা শহরের আশপাশে পাহাড়িদের পাড়া আর মাতামুহুরী নদী দেখতে যেতে পারেন। থাকা-খাওয়ার জন্য লামা শহরে পাবেন সরকারি গেস্ট হাউস ও মাঝারি মানের কিছু হোটেল।

ছবি :লেখক


নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: