সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শ্বিনাথরত্ন কবি মুসা আল হাফিজ’র “কবি ফররুখ আহমদ সাহিত্য পদক” লাভ : অভিনন্দন কবি

আ.ক.ম এনামুল হক মামুন ::

তিনি অনন্য, অসাধারণ, ব্যতিক্রমও। শিল্প, সাহিত্য ও নান্দকতায় একদম আপোষহীন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক জ্যোতিষ্ক, অপরদিকে আদর্শের প্রতিও নিষ্ঠাবান। হযরত শাহজালাল, শাহপরান-সহ তিন’শ ষাট আউলিয়ার পুণ্যবৃষ্টিতে সিক্ত আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মাটি ও মানুষ যুগ যুগ ধরে যাদের নিয়ে গর্ব করতে পারে, সন্দেহ নেই তিনি তাদেরই একজন। একাধারে আলেম, কবি, কলামনিস্ট, সাহিত্য সমালোচক, ছড়াশিল্পী, স্কলার, দর্শন বিশ্লেষক। বলছি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী (আমতৈল) মাখরগাঁও গ্রামের কৃতিসন্তান শায়েখ হাফিজ মাওলানা কবি মুসা আল হাফিজ’র কথা।
আলেমদের কোলেকাঁখে বেড়ে ওঠা তারুণ্যের আইকন মুসা আল হাফিজ পেশায় একজন শিক্ষক হলেও সব্যসাচী লেখক হিসেবে তিনি সমাদৃত। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ২৪টি গ্রন্থ। মুক্তি আনন্দে আমিও হাসবো, ইভের হ্রদের মাছ, পরম সাঁতার, সৃজনে রক্ত চাই, আমি বিজয়ের সন্তান, সভ্যতার সংঘাত, পৃথিবী ঘরে ফিরো, মাদক মায়াবী মরণাস্ত্র, মহাকাব্যের কোকিল, মহাকালের মধু, মরমী মহারাজ, মহাসত্যের বাঁশি, প্রাচ্যবিদদের দাঁতের দাগ, আমেরিকা মুসলমানদের আবিষ্কার, মুসলিম অবদান, জনকের নাম, তৃতীয় সহস্রাব্দের ঋণ, থাপ্পড়, কানমলা, দুধের নদী, তৃতীয় সহস্রাব্দে কিয়ামত, যে সূর্যে প্রদীপ্ত বিশ্ব সে তুমি আলিম ইত্যাদি গ্রন্থ সাহিত্য বোদ্ধাদের হৃদয়ে নাড়া দেয়া একেক নাম। ইতোপূর্বে তিনি স্বীকৃত হয়েছেন সময়ের এক সাহসী চিন্তাবীদ ও শিকড় সন্ধানী গবেষক হিসেবে। খ্যাতি ছড়িয়েছেন জনপ্রিয় বাগ্মী ও বিশুদ্ধ সম্পাদক হিসেবে। তাঁকে অভিহিত করা হয় ‘বিজয়ের সন্তান’ নামে। অনেকে তৃপ্তি হাসিল করেন বাংলা সাহিত্যের ‘দরবেশ কবি’ আখ্যা দিয়ে।

মহাকবি রুমী, জামী, সাদী, খৈয়াম, ইকবালের দর্শন ও রুহের সোনালী আলোয়-ভালোয় উদ্ভাসিত জীবনের অধিকারী স্বাপ্নিক লিখিয়ে সত্ত্বা মুসা আল হাফিজ’র লেখালেখির শুরুটা গল্প দিয়ে হলেও সময়ের ব্যবধানে তাঁর রচনাধারা স্পর্শ করেছে বহুমাত্রা। তিনি সাহিত্য, দর্শন ও সমাজমনস্ক প্রবন্ধ যেমন লিখেছেন, তেমনি গবেষণায় সফর করেছেন একের পর এক দিগন্ত। বিশ্বস্ত কলমে অনুবাদ করেছেন দু’হাত ভরে। আরব ও পারস্যের প্রেমিক কবিদের নিয়ে রচনা করেছেন হদয়স্পর্শী গদ্য। সমালোচনা করেছেন কবিতার, সাহিত্যের। ইসলাম ও পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক ও সংঘাত নিয়ে কাজ করেছেন দিনরাত। পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন বিশ্ময়কর সব তথ্যাবলী। কিন্তু মূলত তিনি একজন কবি। কবিতাই হচ্ছে তাঁর আসল ধ্রবা।

 

কবি মুসা আল হাফিজ এক বিশ্ময়কর প্রতিভা। তিনি বয়সে তরুণ হলেও প্রবীন ও বিদগ্ধ সমাজের সাথে রীতিমত মুনশিয়ানা দেখিয়ে টিকে রয়েছেন বেশ দাপটের সাথে। তিনি বিশ্বনাথের হয়েও বিশ্বফোরামে জানান দিয়ে চলেছেন তাঁর আসন ছেড়ে দেবার। বড়রাও টের পাচ্ছেন, মানতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁর পাণ্ডিত্যের বাহাদুরী কিংবা জ্ঞানের আলোকময় ঝলকানি। নির্দ্বিধায় মূল্যায়ন করেছেন অনেকে। মাসিক মদীনা সম্পাদক (প্রয়াত) মাওলানা মুহিউদ্দিন খান বলেছেন- দীর্ঘ দিন ধরে আমরা কেবল আরব কবির অনুকরণে “উলা-য়িকা আ-বা-য়ী ফাজি’না বিমিছলিহিম” অর্থাৎ- ওরা হচ্ছেন আমার বাপ-দাদা, ওদের মতো বাপ-দাদা তোমার থাকলে হাজির করো -এই কবিতাটি উচ্চারণ করে আসছি। এখন আমাদের কিছু সন্তান তৈরী হয়েছে। যাদের দিকে চেয়ে আমার বলতে ইচ্ছে হয়- ‘উলা-য়িকা আবনা-য়া ফাজি’না বিমিছলিহিম’ অর্থাৎ- এরা হচ্ছে আমার সন্তান, এদের মতো সন্তানাদি থাকলে তাদের নিয়ে হাজির হও। আমার এইসব সন্তানের মধ্যে মুসা আল হাফিজ শীর্ষস্থানীয়।

উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ বলেন- “এ প্রজন্মের একজন মুসা আল হাফিজ যেনো বিদ্রোহী নজরুল। হাজার হাজার পাঠকের বিপ্লবী ইকবাল।” আল মাহমুদ বলেন- আমি দীর্ঘ দিন ধরে অসাধারণ কোনো কবিতার গন্ধ শুঁকতে উন্মুখ হয়ে আছি। বাংলা কবিতার শরীর হাতড়াচ্ছি অসাধারণ সৃষ্টি বেদনার লক্ষণের আশায়। এ সময়ে যাদের কলমে বৈশিষ্টমণ্ডিত কবিতার বীর্য রয়েছে, তাদের মধ্যে শক্তিমান এক কবি মুসা আল হাফিজ। আমি প্রকৃত কবিতার এই আকালে তাঁর প্রতি বড় আশার দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। কারণ মানুষ ও মানুষের পৃথিবীর জন্য সব’চে জরুরি যে বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসের স্বচ্ছল আনন্দে অবগাহন করে বিদ্যুচ্ছমকের মতো উজ্জল দৃশ্য ও বাক্য নির্মাণে মুসা আল হাফিজ পারঙ্গম। তাঁর শব্দ ও বিষয় সচেতনতা উচ্চমানের। গভীর আধ্যাত্মিকতার রহস্য তৈরীতে তার প্রচেষ্টা নিয়োজিত হয়েছে। আমি এতে বৈদগ্ধ ও শিল্পসাফল্যের চিহ্ন লক্ষ্য করেছি। ডান-বাম মিলিয়ে এই প্রজন্মের তরুণ কবিদের মধ্যে মুসা আল হাফিজ’র কবিতায় সব’চে সবলভাবে প্রাণের স্পন্দন শুনা যায়। তাঁর দেখার তৃতীয় চোখ অন্তর্ভেদী বলেই মনে হলো।

গণমানুষের কবি (প্রয়াত) দিলওয়ার বলেন- বিভন্ন পরীক্ষামূলক নিরীক্ষণের মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি সিলেট জেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী কবি মুসা আল হাফিজ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তবে রুঢ় সত্য যে, তার প্রতিভাবৃক্ষে জলসিঞ্চনের জন্য কোন সহায়ক শক্তি নেই। অগত্যা এই তরুণ কবির সামনে রয়েছে প্রবল দ্বন্ধমূখর অগ্রযাত্রা। দিলওয়ার বলেন- ২০০৬ সালে মুসাকে স্নেহের নিদর্শন স্বরূপ একটি কবিতা উপহার দিয়েছিলাম। এতে আমি আশা করেছিলাম মুসা অন্ধকারে প্রহ্লদের মতো আবির্ভূত হবেন। আমার সেই আশা অপূর্ণ থাকবে বলে মোটেও সন্দেহ পোষণ করছিনা।

তাছাড়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর ভাষায় সংক্ষেপে উঠে এসেছে মুসা আল হাফিজের চেতনালোক। তিনি বলেন- মুসা আল হাফিজের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। বর্ণিল এক আলোকপিয়াসী চৈতন্যের ভাষ্যকার তিনি। তাঁর সপারগ হাত চলমান অবক্ষয়ের বিপরীতে হৃদয়ের সওদা বিতরণ করছে। মানুষের পরম সত্তাকে জাগ্রত করার জন্য যে প্রেম ও শিল্প এই কবির অন্বেষা, তা আজ মানবতার বড়ই প্রয়োজন। তার দীপান্বিত বোধ যে অমৃতময় উৎসবের দিকে যাত্রা করে, সেই যাত্রাপথ ঐশ্বর্যের সম্ভারে সমৃদ্ধ।

বলতে দ্বিধা নেই কবি মুসা আল হাফিজ তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও বিরল সাধনার দ্বারাই স্বল্পদিনের মাথায় বোদ্ধামহলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। মেধা ও অধ্যাবসায় তাঁকে পৌঁছে দিয়েছেন এমন উচ্চতায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি উঁচু মাকাম ইতোমধ্যেই তিনি দখল করে নিয়েছেন। পুরস্কৃতও হয়েছেন বিভিন্ন মহলে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়র্কস্থ আর-রাহমান চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ২০০৮ সালে তাঁকে দিয়েছে জাতীয় সেরা প্রতিভা সম্মাননা ও সনদপত্র। তারপর ২০১০ সালে জাতীয় পর্যায়ের আল-আমানাহ সাহিত্য পুরস্কার-সহ প্রায় ডজন খানেক সম্মাননা পদক-পুরস্কার কবির জাম্বিলে জায়গা করে নিয়েছে। সর্বশেষ “কবি ফররুখ সাহিত্য পদক” পেলেন মুসা আল হাফিজ। গত ৩০জুন ২০১৮ ইংরেজি সন্ধ্যায় সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের শহিদ সুলেমান হলে আয়োজিত কবি ফররুখ জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদ সিলেট এ সাহিত্য পদক প্রদান করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী, ফররুখপুত্র কবি আহমদ আখতার ও অধ্যক্ষ মাসউদ খানসহ বহু গুণীজন। কবির পরিচিতি তুলে ধরেন- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রিজেস্টার মাহবুব ফেরদৌস। পরিচিতির মধ্যে তার একটি মন্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন- “একজন আলেম হয়ে কবি মুসা আল হাফিজ বাংলাসাহিত্যে এক বিরল উচ্চতায় আরোহণ করেছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের মননশীলতা। তাঁর রচনা খুবই উচ্চমার্গের। তাঁর মধ্যে আমরা ফররুখ আহমদকে দেখতে পাই।”

উল্লেখ্য, কবি ফররুখ আহমদ সাহিত্য পুরষ্কার প্রথম পেয়েছিলেন সাহিত্য সমালোচনার দিকপাল, বরেণ্য কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ (চট্রগ্রামে)। তারপর পেলেন বাংলাসাহিত্যে কথাশিল্পের প্রবাধপুরুষ শাহেদ আলী (চট্রগ্রামে)। সেই ধারাবাহিকতায় শীর্ষসাহিত্যিকরাই এ পদক পেয়ে আসছেন। বিশ্বাসী ও আদর্শিক ধারার সাহিত্যে এ পদক অনেকটা যেনো বাংলা একাডেমী পুরষ্কারতুল্য। কোনো আলেম এ পুরষ্কার পাবেন, তা অনেকটা স্বপ্নই ছিলো। আলহামদুলিল্লাহ, ফররুখ আহমদের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘কবি ফররুখ আহমদ জন্মশতবার্ষিকী সাহিত্যপদক’ পেলেন আমাদের হৃদয়ের ধন, চেতনার কবি, আলেম সমাজের উজ্জল নক্ষত্র, বিশ্বনাথরত্ন মুসা আল হাফিজ। তাঁর এই অসামান্য সাফল্য অর্জন প্রমান করে যোগ্যতার কাছে বয়স কিংবা সময় বড় অসহায়। কবির প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম, অভিনন্দন ও শুভেন্যবাদ নিরন্তর…

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, সুবাতাস। বিশ্বনাথ, সিলেট।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: