সর্বশেষ আপডেট : ৫৬ মিনিট ৫১ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামছে,দুর্ভোগ কমেনি মানুষের

নিউজ ডেস্ক:: মৌলভীবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।বন্যার পানি ঘরবাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছে।পানি কমলেও বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমেনি।বরং সেটি আরো বেড়ে গেছে।পানি থাকা অবস্থায় যে ঘরটি দাঁড়িয়ে ছিল; পানি নামার পর, কাঁচা সেই ঘরগুলো ধসে পড়ছে।ভেসে ওঠা রাস্তার স্থানে স্থানে বড় বড় গর্ত কিংবা খাদ সৃষ্টি হয়েছে।নলকূপগুলো বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় লোকজন বিশুদ্ধ পানীয় জল পাচ্ছে না।

জীবজন্তু গাছপালার লতাপাতা পচে যাওয়ায় চারদিকে দুর্গন্ধ।মৌলভীবাজার পৌর এলাকার বারই কোণায় সৃষ্ট মনু নদের ভাঙনটি গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মেরামত করা হয়েছে।এর ফলে মনু নদের পানি শহরের দিকে ঢোকা বন্ধ হয়েছে।

গত সোমবার রাতে রাজনগর উপজেলার পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া কুশিয়ারা নদীর বাঁধ কালাইরগুলের কাছে প্রায় ৩০ ফুটের মতো ভেঙে গেলে রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ও উত্তরবাগ ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম নতুন করে বন্যাকবলিত হয়েছে।প্রবল বেগে পানি ঢুকে উত্তরভাগ ইউনিয়নের রাজাপুর, সুপ্রাকান্দি, সুরিখাল, সুনামপুর, উমরপুর, কান্দিগাও, শাফাতপুর, রুস্তমপুর, মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সোনাটিকি, কাজিরহাট, মেদেনীমহল ও ফতেপুর ইউনিয়নের বেড়কুড়ি, শাহাপুর, জাহিদপুর, আব্দুল্লাহপুর এই গ্রামগুলো প্লাবিত করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজনগর উপজেলার এসডিও মুখলেছুর রহমান বলেন, যত দ্রুত বাঁধটি মেরামতের চেষ্টা করছি।এটি মেরামতে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্বিকভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহেযাগিতায় মৌলভীবাজার শহরের বারইকোণার ভাঙন মেরামত কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সম্পন্ন করেছে মৌলভীবাজার পৌরসভা।ফলে মনু নদের পানি শহরে প্রবেশ বন্ধ হয়েছে।এখন নতুন করে উজানের ভারি বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢল না হলে শহরের যেসব অঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল, সেসব অঞ্চল থেকে পানি দ্রুত ধীরে ধীরে ভাটির দিকে হাইলহাওরে নেমে যাবে।

দুপুরে মনু নদের শহর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করে দ্রুত মেরামতের নির্দেশনা দেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার।এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধতন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম সঙ্গে ছিলেন।তারপরই মেরামতের কাজ শুরু হয়।উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত কমে আসায় মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।কমছে মনু নদের পানি।

মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়ক ও মৌলভীবাজার-সিলেট মহাসড়ক যান চলাচলের উপযোগি হয়েছে।দুটি সড়কেই যান চলাচল শুরু হয়েছে।রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া এবং জেলা সদরের বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন, মৌলভীবাজার পৌরসভা, আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।দুর্গত মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবাদি বন্যার্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।সরকারের মন্ত্রী, সচিব এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্গতদের এলাকাসমূহ পরিদর্শন করছেন।

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান বড়হাট এলাকায়, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নেছার আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান, সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন রাজনগর ও সদর এবং সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদ কমলগঞ্জে প্রতিদিনই ত্রাণ বিতরণে অংশ নিচ্ছেন।

জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ১৩ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা এবং ১১৪৩ মেট্রিকটন চাল ও পাঁচ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩৬ ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়।মনু ও ধলাই নদের পানি বিপদসীমার নিচে নেমে যাওয়ায় গত সোমবার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ জুন) বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। বন্যাকবলিত যেসব মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা অনেকেই এখনো নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

কমলগঞ্জের পনতউষার গ্রামের আবদুল হান্নান চিনু বলেন, ঘরের ভেতর কোমর পর্যন্ত পানি ছিল। এখন পানি নেমেছে। কিন্তু ঘর বসবাস উপযোগী নেই। তিনি বলেন, তার আশপাশের শতাধিক কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। ঘর ধসে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে খুব দ্রুত নতুনভাবে ঘর নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের মশাজান গ্রামের জয়নাল আবেদীন শিবু বলেন, ‘আমার পাকা ঘর। বন্যার পানি ঘর থেকে নেমেছে। আমার স্ত্রী ছাড়াও ছোট দুটি সন্তান রয়েছে। চারদিকে পচা গন্ধের কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে কিনা সেই শঙ্কার মধ্যে আছি। এ কারণে স্ত্রী সন্তানকে বাড়িতে আনছি না। তারা এক আত্মীয়ের বাড়িতে আছেন। তাছাড়া নলকূপটাও বন্যার পানিতে ডুবে গিয়েছিল। এই নলকূপের পানিতো বিশুদ্ধ নয়। আরো কতো দিন আমাদের এই দুর্ভোগ থাকবে সেটা আল্লাহ জানেন।’

মৌলভীবাজার পৌরসভার পূর্ব হিলালপুরের বাসিন্দা সালেহ এলাহী কুটি বলেন, ‘বন্যার পানি তো কমেছে। কিন্ত বাড়ি থেকে বের হয়ে শহরে যেতে পারছি না। আমার বাড়ি থেকে বের হবার পিচের রাস্তার চার স্থানে কোমর পর্যন্ত বড় বড় গর্ত ও খাদের সৃষ্টি হয়েছে। প্রচণ্ড স্রোতে রাস্তা ভেঙে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয়নি। রাতের বেলা আমরা এক ভূতুড়ে পরিবেশে থাকছি।’

শমশেরনগর থেকে নূরুল মোহাইমিন মিল্টন জানান, বন্যার শুরুতে সেই ১৩ জুন কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নে পানির স্রোতে একটি বড় কালভার্ট দেবে গেলে শমশেরনগর থেকে চাতলাপুর চেকপোস্টে যাওয়ার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই কালভার্ট দেবে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়ীদের আমদানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে আছে। সড়ক ও জনপথ সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা ও সেনা বাহিনীর লে. কর্ণেল শাহাব উদ্দীন দেবে যাওয়া কালভার্ট পরিদর্শন করেন। এখানে একটি বেইলি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুটি নির্মাণ করতে কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানানো হয়।

বন্যায় কমলগঞ্জের একটি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন কবলিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ জুন) কমলগঞ্জের দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমান। তিনি সাড়ে চার হাজার দুর্গত মানুষের মাঝে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করেন। অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমান বলেন, মৌলভীবাজার জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় সাম্প্রতিক বন্যাক্রান্তদের মাঝে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে এসব ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। বিধ্বস্ত বাড়িঘর ও ভেঙে যাওয়া সড়ক মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষজন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলেও অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমান জানান।

জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে কালের কণ্ঠকে বলা হয়; সারা জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন হচ্ছে ৩৬টি ও পৌরসভা দুইটি। বন্যায় আক্রান্ত মানুষ দুই লাখ ৬১ হাজার ৬৫৩ জন। ৬৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১২ হাজার ৪০৫ জন আশ্রয় নিয়েছে। ঘরবাড়ি বিধ্বস্তের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। গত সোমবার (১৮ জুন) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মৌলভীবাজার সফরকালে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া এক হাজার বান্ডিল টিন ও নগদ ৩০ লাখ টাকার কোনো তথ্য জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে নেই। নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তা বলেন এই ধরনের কোনো বরাদ্দ আমরা পাইনি।

গতকাল মঙ্গলবার (১৯ জুন) সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সরকারি সফরে মৌলভীবাজারে এলে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি মৌলভীবাজার পৌরসভার সৈয়ারপুর এলাকায় লোকনাথা সেবা আশ্রমে ও সদর উপজেলার খলিলপুর এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেন।

এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন, জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহ জালাল, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক সৈয়দা ফেরদৌসি আক্তার, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আহাদ মিনার প্রমুখ।


এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: