সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ৫১ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হাসিমুখে প্রতিদিন ইফতার ও একটি মানবিক ভোরের প্রত্যাশা

আনোয়ারুল ইসলাম অভি:: আজ কত তম রোজা আনন্দে রাখা হলো ? এভাবে, আগে আমি ভাবিনি? ভোজনপ্রিয় বাঙালি অর্থে বিষয়টা আসলে অনুভব করা সহজ নয়। প্রতিদিনের শারিরিক শ্রম, আবহাওয়াগত পরিবেশ, বয়স, অসুখ- বিসুখ এই সব কারণে কিছুটা কঠিন অনেকের কাছে। তারপরও যারা ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসী এবং সংযম পালনটাকে ধর্মের অবশ্যই পালনীয় একটি স্তম্ভ হিসাবে বিশ্বাসে চর্চা করেন, তাদের কাছে রোজার মাস অনেক গুরুত্ব বহন করে। মানবিক বোধ জাগাতে,চর্চা করতে সাহায্য করে।

পারিবারিক আবহে মানবিক ও সৃজনশীল কাজে আমরা সাধ্যমত কিছু করতে চেষ্টা করি। যদিও নগন্যতম তবে, মূল্যবোধে এইসব কাজে যারা আলোর পথে হাটেন, বাতি জ্বালিয়ে রাখেন বা অন্ধকারে আলো জ্বালাতে ভালোবাসেন; তাদের কর্মসৃজনগুলো বরাবরই কাছে টানে।

আমার আনন্দময় রোজার পেছনে একটি অনুগল্পও আছে; ব্যক্তিগত হলেও আজ তা বিন্দু বিন্দু অনুপ্রেরণায় একটি মানবিক প্রেরনাদায়ী উৎসমূলে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিকথনে অবশ্যই নেই, অন্তত যারা আমাদের কর্মসৃজনগুলো দেখেন, পাশে থাকেন, উৎসাহ ,পরামর্শ দেন; তাঁদের কাছে নয় হলফ করে বলতে পারি।

আমাদের মরহুম বাবা শিক্ষক সমছুল ইসলাম ও ছোট চাচা মরহুম অধ্যক্ষ ফয়জুল ইসলাম তাঁদের বাবা-মার নামে একটি পারিবারিক চ্যারিটিবল কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁদের বাবা মরহুম মুফিজ আলী সরপঞ্চ, তাঁর প্রিয়তম স্ত্রীকে অর্থাৎ আমাদের দাদীকে একটি ফসলি বাগান বাড়ির বৃহৎ অংশ দিয়ে ছিলেন। সেই জায়গা দিয়েই বাবা ও ছোট চাচা তাঁদের বাবা -মা অর্থাৎ আমাদের দাদা-দাদীর নামে এই জায়গাটি ওয়াকফ করে শুরু করেছিলেন – মুফিজ আলী সরপঞ্চ-সিতারা বিবি ট্রাস্ট। ফসলি বাড়ির ওয়াকফকৃত জায়গায় আছে- বারমাসী ফলমূল-কমলা, আম,কাঁঠাল, লিচু, লটকন,জাম্বুরা, আদা, হাতকরা,কলা ইত্যাদিসহ অনেক কাঠবৃক্ষ। নিয়মিত পরিচর্চায় ও দেখাশুনার কাজটি মূলত এখন আমরাই করি। তবে এইকাজের সাথে আমাদের যেটি সবচেয়ে অনুপ্রানীত করেছে ছোট বেলায় তা হলো-মুফিজ আলী সরপঞ্চ-সিতারা বিবি ট্রাষ্ট্রের সাথে সন্তান হিসাবে বাবার নিরবিচ্ছিন প্রচারবিমূখ অংশ গ্রহন। আমাদের পুরাতন বসতবাড়ীর কয়েকটি ফসলি বাগান যা দেখাশুনা ও পরিচর্চার অভাবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। যেখানে প্রধানত কমলা-আনারস, আম, কাঁঠাল, ইত্যাদি ফলত। যখনই এইসব ফসল বিক্রি করতেন, নিদৃষ্ট একটা আমাদের দাদা-দাদীর ট্রাষ্টের চ্যারিটির জন্য রেখে দিতেন। আর ব্যক্তিগত অর্থযোগ তো ছিলই।

আমাদের বর্তমান বাড়ী, বাপ-দাদার পুরনো বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরে। জলঢুপ। জলঢুপ বড়বাড়ীতে আছে কমলা-আনারস,লিচু,লটকন-লেবুজাতীয় প্রায় সব এবং বিরল প্রজাতির ফল ফসলের গাছ।কমবেশী বারোমাস আয়ও হয়। সেটা বিষয় না। বাবা, এখানেও একটি মানবিক কাজ করেছেন আমাদের জন্য।

বাড়ীর সামনে ছোট অনেকগুলো কয়েক যুগ বয়সী কমলা গাছ আছে। ডালে ঝুপ ধরে কমলা ধরে। হাটুপ্যান্ট বয়সের কথা মনে আছে স্পষ্ট; বিকালের পশ্চিমের সূর্যের আভা কমলার রঙ এর মাঝে আরো সোনালী আভা ছড়িয়ে থাকতো। খাওয়া যেত কমলার ভারে কুজো হয়ে যাওয়া ডাল থেকে সহজে ইচ্ছে মতো।তবে সেখানে কয়েকটি গাছে আমাদের অবাধ অগ্রাধিকার ছিলনা। এগুলোর নাম ছিল ‘দাদীর কমলা গাছ’। অর্থাৎ গাছগুলো দাদীর জন্য বরাদ্দ ছিল, তিনি যেন নিজ হাতে পেড়ে খেতে পারেন, তেমনি তার ইচ্ছে মতো অস্বচ্ছলদের দিতে পারেন। আমিসহ আমার একমাত্র ছোট ভাই ও ছোট বোনটি আমাদের দাদীর স্নেহ মমতা আদর বেশী দিন পাইনি। প্রাথমিকে পড়ার সময়েই আমাদের দাদী মারা যান। দাদীকে নিয়ে যে সব স্মৃতি মনে জীবন্ত আছে, তার অন্যতম একটি হলো- হলুদ বড় বড় কমলা গুলো নিজ হাতে বাড়ীতে আসা ‘নিডি’ মানুষের হাতে দিতেন। আমাদের দাদী সিতারা বিবি অনেক বুদ্ধিমতি ছিলেন বলে এখনও আত্নিয় ,পরিজন বলেন। কিন্তু আমার মনে বিধে আছে, তাঁর কমলা গুলো নিজ হাতে বন্টন এর হাসি মাখা মুখটি। তার আদরমাখা কন্ঠস্বর ‘দাদাভাই, তোমার বাফরে খইয়া আও আমারে গাছ তনে খয়টা খমলা পাড়িয়া দিতা।’

ভালো কাজের আদর্শিক একটা স্ফোরণ আছে। বাবাকে, আমরা বড় হতে হতে দেখেছি,শিখেছি -কীভাবে মানবিক কর্মগুলোতে কাজ করা যায়। নিরবে, সহজে এবং সব সময়। এসবে আসলে অর্থ কখনওই মূল বিষয় নয়। দুনিয়া জুড়ে তো এর ভুরভুরি প্রমানও দৃশ্যমান। আমাদের বাড়ীতে দুষ্প্রাপ্য অনেক ঔষধি গাছ আছে। অর্জুন, সজনা,হরিতকি,মন, কাটাজামির ইত্যাদির জন্য অনেক মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভেষজপথ্যের জন্য নিতে আসতেন, এখনও আসেন। আমাদের জানা ছিল না- এইসব গাছগুলো খুঁজে খুঁজে লাগানো ও বাড়তি যত্নের বিশেষ কী কারণ।

মনে আছে, একদিন, শীতের সকালে আম্মা আমাদের ডাকছেন। বাড়ির সামনে পিছনে আমাদের দুটি পুকুর আছে। আমরা, পুবের পুকুর, পশ্চিমের পুকুর বলেই ডাকি। আম্মা বললেন-‘তোমরার আব্বারে দেখিয়া আও।’ শীতের সকালে দৌড়ে গিয়ে দেখি- বাবা আমাদের অর্জুন গাছের গায়ে হাত দিয়ে নি:শব্দে কাঁদছেন। সুদৃশ্য অর্জন গাছের দিকে চেয়ে আমরাও আৎকে উঠলাম। কে বা কারা বিশালদেহী অর্জনু গাছের শরীর থেকে সারা চামড়া তুলে নিয়ে গেছে। অর্জুন গাছের চামড়া (ছালা) প্রায় দুই ইঞ্চির মতো পুরো থাকে। এমন ভাবে তুলে নেয়া হয়েছে, ভেতরের কাঠ ছাড়া কোন ছালা নেই। আম্মাসহ আমরা তাঁকে সান্তনা দিয়ে নিয়ে আসতে চাইলেই বাবার মুখে জেনে ছিলাম তার আরেকটি মানবিক কাজের কথা- ‘অর্জুন গাছ তো আমি মানুষের জন্য লাগিয়েছি, মানুষরা অসুখের জন্য নিতে আয়। এই গাছ আর বাচঁবেনা…’।( অবশ্য পরে গ্রামের বৃক্ষপ্রেমী মাখন লাল চাচা এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অজুন গাছটির গায়ে গোবর দিয়ে চামড়ার স্তরের মতো করে, নিয়মিত পানি ছিটিয়ে কেটে নেয়া প্রায় দশফুট উচ্চতার অংশ যত্ন করে গাছটি টিকিয়ে রেখেছিলেন)। আমাদের বাড়ীতে বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় খুব কম গাছ লাগানো হয়েছে, যেখানে বাবা বা আমাদের হাতের স্পর্শহীন আছে।

আমার মনে বাবার এই ক্ষুদ্র অথচ অসীম মানবিক চ্যারিটেবল কাজগুলো দাগ কাটে। মনোবিজ্ঞানে আছে- শিশুকালই পরিনণত বয়সে একজন মানুষের মানষিক উৎকর্ষ বিকাশে প্রধান ইনসপারেশন হয়ে কাজ করে। ইউরোপের একটি গবেষণা রিপোর্ট বলছে- আমরা বড় হয়ে কী করবো বা কী হবার স্বপ্ন দেখবো; তা আসলেই ছোট বেলায় আমাদের করা কাজগুলো থেকে মস্তিস্ক নির্বাচন করে । অর্থাৎ ১৩ বছর পর্যন্ত আমরা যা করি, যা বড়দের দেখে অভ্যস্থ হই, অভ্যাস করি, সেই কাজগুলো থেকেই আসলে একজন মানুষ পরিণত বয়সে হতে চায় বা হয়। সুনিদৃষ্ট ভাবে গবেষণা বলছে- শিশুকালের চর্চিত ও আশপাশের দেখা-শেখার বিষয় এর বাইরে মানুষের কগনেটিভ চিন্তা কাজ করেনা।

দুই হাজার চার সালে আমরা ছয় ভাই বোন মিলে গঠন করি সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন। অন্ধকারে আলো শ্লোগাণে আমাদের স্বপ্নযাত্রায় ছিল একটি কমিটমেন্ট- আমরা সরবের চাইতে নিরবেই কাজ করবো বেশী। আরও কয়েকটি কাজ বা সন্বোধন আমরা সচেতন ভাবেই করবো না; যা বাবা-মা করেননি। তাহলো- আমরা কাউকে ‘গরীব‘ বলে সংবোধন করবো না। তাঁকে নগন্য সাহায্য করে পণ্যের মতো প্রচার এর হীনমনমানষিকতা বর্জন করেই চলবো। সবচেয়ে বেশী কাজ হবে- মানষিক উৎকর্ষ বিকাশে, প্রেরনাদায়ী এবং সার্বজনীন।

টাকা এখানে গৌনই থাকবে। হাত বাড়িয়ে, হাতে হাত রাখার কাজটিতে মানবিক ও শ্রদ্ধাবোধে পাশে থাকবো। শিক্ষা এবং শিক্ষক ঘনিষ্টকাজে আমাদের প্রাধান্য থাকবে। ফলত, অনেকগুলো কাজ আমরা আনন্দেই নিয়মিত প্রচারহীন করি; মেধাবী গুনীদের বই প্রকাশ, শিক্ষালয়ে সৃজনশীল কর্ম -দেয়ালিখা, চিত্রাংকন। বৃক্ষরোপন, সর্বসাধারণের সুবিধা হয় এমন জায়গায় নিরাপদ পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন, শিক্ষা উপকরণ সর্বপরি ইসনপারেশন মূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে কাজটিকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বাত্নক সহযোগী হয়েই কাজ করা।

এই রমজানে আমাদের একটি কাজ ছিল- কিছু ‘নিডি’ মানুষদের পেটভরে স্বাস্থ্যকর ইফতার খাওয়ানো। আমাদের মানবিক কাজের একটি করে শিরোনাম থাকে। এই প্রজেক্টটির নাম দেয়া হয়েছে- ‘হাসিমুখে ইফতার’। প্রায় এক হাজার রোজাদারকে আমরা বেছে নিয়েছি, নিশ্চিত করেছি -তাঁদের ঘরে রমজানে মনভালো করা একটি ইফতারের ব্যবস্থা করতে। এবং কাজটি সচেতন ভাবেই করা হয়েছে নিরবে, প্রচারবিহীন। কিছু সমাজবান্ধব কাজ, সম্ভবত লুকাতে চাইলেও মনে হয় আড়াল করা যায় না। বিড়ম্বনাও যে আসেনি তাও নেই। ফলত আশপাশের কিছু মানুষকে অল্প করে কিছু খাবার এর প্যাকেটও পরে দিতে হয়েছে। তাতেও মন খারাপ হয়নি।

পরমানন্দের খবর হলো, রমজানের ইফতারের কাজটির কথা শুনে এইবার কয়েকজন স্বজনও এগিয়ে এসেছেন। তাঁদেরকে সাথে নিয়েই ‘হাসিমুখে ইফতার’ প্রজেক্ট করেছি। মূলত এই প্রজেক্ট-ই আমাকে লিখতে বসিয়েছে।

কয়েকদিন থেকে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ফিডব্যাক পাচ্ছি প্রিয় স্বেচ্ছাকর্মীদের কাছ থেকে। তিন দিন আগে একটি ম্যাসেজ পেলাম -‘অভিভাই, আপনার সাথে একজন কথা বলতে চান, আমি যখন মিছকল দেবো,তখন একটা কল দিবেন।’ পরের দিন ফোন দেই। ওপার থেকে একজন মেয়ের কণ্ঠ। কান্নার মতো ভরাট কণ্ঠ- ‘বাবা রে বো, আমরা পেটভরি রোজদিন খাই, আমার হুরুতাগুলাও পেঠ ভরে খাইরা। আমার বাইচ্ছা ফুড়ি ওগু দুইদিন থাকিয়া আফনার সাথে মাততো ছার, এখবারতা দুখান খতা খইবানি ফুড়িগুর লগে ?’
আমার কণ্ঠ যেন আটকে যায়।চোখ ভাপসা হয়ে গেছে মুহুর্তেই। আমি কথা বলি- ছোট মেয়েটি হ্যালো বলে- আর কোন কথা বলেনা। সম্ভবত লজ্জা বা ইতস্থত হয়ে গেছে। বলে –’মামা, আমিও ইসতার খরি,….. আফনেও খাইনজেনো…।’ ছোট মেয়েটি আর কিছুই বলতে পারে না বা আর বলার মতো এই বয়সে বোধগম্যতা হয়নি হয়তো। মন খারাপ হলে কথা টেনে নেয়া যায় না। মায়ের মুখে শুধু কৃতজ্ঞতার শব্দ। আমি এক সময় রেখে দেই। ত্রিশ দিনের ইফতার এর খাবার পেয়ে এইরকম অনেক গুলো কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কথা আমাকে পাঠিয়ে দেবার জন্য অনেকে আবদার করেছেন সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে।
আর আমার তৃপ্তি এখানেই। লেখার শুরুতে এই কারণেই ‘আজ কত তম রোজা আনন্দে গেল’ কথাটি লিখেছি! বিলেতে আটারো ঘন্টা রোজার সময় আনন্দে থাকার এইটা-ই কারণ। ক্ষুদ্র একটি মানবিক কাজ, সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন এর ‘হাসিমুখে ইফতার’ চ্যারিটেবল কাজ।
এই কাজটি আমরা যে কেউ-ই করতে পারি। ইচ্ছা শক্তিই এখানে আসল। বাকীটুকু হলো মানবিক চিন্তায়,ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকা। এই কাজটি আমরা ঘর থেকেই শুরু করতে পারি। কী ভাবে সম্ভব হয় বা করা যায়? সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশনটির গল্পটিই তাহলে এখানে শেয়ার করছি। ……আমরা ভাইবোন ছয়জন। বিলেতে স্থায়ীভাবে বাসকরা দুইবোন এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি টাকার সংস্থানটি মূলত আমরাই দেখবো। আমাদের রোজগার থেকেই এটা আমরা সানন্দে করি। তারপরও আমাদের প্রত্যেকের ঘরে একটি করে সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন এর চ্যারেটি বক্স আছে। সেখানে নিয়ম করেই প্রতি সপ্তাহে আমরা খুচরো টাকাগুলো রাখি। বোন দেশে শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। তিনি ,তাঁর দুই মেধাবী ছেলেকে যুক্ত করেছেন। তারা তাদের নানার সাথে ঘনিষ্ট ছিল।কাছ থেকে দেখেছে মায়ের চ্যারিটেবল কাজগুলো। ইউনির্ভাসিটির পড়ালেখার সাথে তারা পার্টটাইম কাজও করে। ভালো কাজ গুলো দেখে তাঁরাও যুক্ত হয়েছেন ফাউন্ডেশন এর সাথে। লন্ডনে নটা-পাঁচটা কাজের সাথে মাঝে মাঝে বাড়তি আওয়ার কাজ করেন চ্যারেটির জন্য। আরেক বোনও লন্ডনে সামগ্রিকভাবেই জড়িয়ে আছে সবগুলো কাজে। কয়েক বছর থেকে আমাদের বাচ্ছাদের বার্থ ডে উদযাপন নিতান্তই সাদামাটা করে করা হয়। মেয়েদের জন্মদিনে তাদের মা নিজে বানিয়ে কেক খাওয়ায়। আর তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় কেক এর জন্য নিদৃষ্ট একটা টাকা। যা মেয়েরা তাদের দাদা-দাদীর নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনে আনন্দে দান করে। দেশে ছোট ভাই বাংলাদেশের সব কাজগুলো প্রচন্ড খাটুনিতেই দেখে রাখে। এছাড়া ফল ফসলের আয়ের একটি অংশ তো চ্যারেটির কাজের জন্যই রাখেই । মেঝবোন মূলত সারা বছরের কাজ গুলোই লিয়াজো করেন। কোন কাজ করা দরকার এবং কিভাবে করলে ভালো হয়, সব কিছু তিনিই দেখে থাকেন। সবার বড় বোন পেশায় শিক্ষক। তার সবগুলো বোনাসের টাকা থেকে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা ফাউন্ডেশনেই জমা দেন। আপার তিন মেয়ে। দুই মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং কাজও করে। চ্যারিটেবল কাজে অর্থ ,মেধা ও সৃজন দিয়ে কাজ করছেন নিরন্তর ভাবে। কলেজে যে পড়ে, সে দেশের যেসব ইভেন্ট হয়, তার পরিকল্পনা ও শ্রম দিয়ে শক্ত কাজটি চালিয়ে নেয় খুব সহজে। বড় আপার একমাত্র ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।সেও চাকুরী করছে। বাংলাদেশের সবকটি প্রজেক্টের খুটিনাটি এবং পরিকল্পনা গুলোর সিংহভাগ তার কাছ থেকেই আসে। অর্থাৎ আমাদের ফাউন্ডেশনটি পরিবার থেকেই পরিচালনা করি- স্বেচ্ছাশ্রমে ,মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। চ্যারিটেবল বা মানবিক কাজে নিরন্তর লেগে থাকা মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে এর মতো আনন্দের কোন দ্বিতীয় কাজ আছে বলেও আমার জানা নেই।

আমাদের সাতকাহন বলার একটাই উদ্দেশ্য, তা হলো- মানবিক কাজগুলো আসলেই করা সম্ভব। এবং চাইলেই নিজ থেকে শুরু করা যায়। আমরা যারা ইউরোপ , আমেরিকায় থাকি; তাদের জন্য এটা খুবই সম্ভব এবং সুন্দর একটা বিষয়।
আপনি চাইলেই দুইটি অস্বচ্ছল পরিবারকে ত্রিশদিন রমজানে ভালো করে খাওয়াতে পারবেন। খুব সহজ হিসাব। সপ্তাহের খুচরো পাউন্ড বা কয়েনগুলো থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি বক্সে জমা করুন। দেখবেন বায়ান্ন সপ্তাহের অনেক আগেই সমপরিমান অর্থ জমা হয়ে গেছে। আজকের মাইক্রোক্রেডিট অর্থনীতির সময়ে, একবার ক্যাফে বা ফ্রাইডসপে টু মারলেই কম করে হলেও কত খরচ করতে হয় এটা আমাদের সবারই জানা। এবং আমরা সপ্তাহে কতবার যাই, তা-ও আমরা ভালোই জানি।
কাজটা এখনই শুরু করতে পারেন। নিজে শুরু করলেই শুরু হয়ে যাবে অবারিত আনন্দতৃপ্তির যাত্রা। আমি বিশ্বাস করি ; নিশ্চয় আপনার পাশে থাকবে-পরিবার, পরিজন, বন্ধু, স্বজন। আপনার ইচ্ছা শক্তিই বদলাতে পারে এই সমাজ এবং ধনী-গরীবের অন্যায় অমানবিক বৈষম্য।

সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন এর ‘হাসিমুখে ইফতার’ প্রজেক্টটি আমাদের বোধের চোখ খুলে দিয়ে আরেকটি সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও খুলে দিয়েছে । মাত্র একটি পাউন্ডে একজন রোজাদারকে হাসিমুখে ইফতার করতে সাহায্য করেছে। এই আনন্দ যাত্রায় যারা আমাদের সাথে আছেন তাঁরে প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। আর নতুন সম্ভাবনায় এই বর্ষায় শুরু করছি ফলজ ঔষধীবৃক্ষ রোপন প্রজেক্ট- ‘সবুজে হাসি সবুজে বাঁচি’। ইচ্ছে থাকলে আমাদের সাথে আপনিও থাকতে পারেন।
আমাদের প্রত্যয়; নিজেকে বদলাই। আমি বদলালেই বদলাবে সমাজ। গুচবে ধনী-গরীব শ্রেনী বৈষম্য।একটি মানবিক ভোরের প্রত্যাশা ও শুভ কামনা।

আনোয়ারুল ইসলাম অভি; কবি,সাংবাদিক, প্রধান নির্বাহী; সমছুল-করিমা ফাউন্ডেশন। লন্ডন।




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: