সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিত, ঢালত গরম পানি

নিউজ ডেস্ক:: ‘হ্যাতেরা খালি কাম করাইতো, খাইতে দিতো না। আবার ব্যাতনের কথা কইলে মাইরতো। ওসুখ হইলে ওষুধ চাইলেও দিতো না। এক বাসায় কাম করায় আবার অন্য বাসায় যাইতে কইতো। কিচ্চু কইলে খুনতি গরম কইরা গায়ে ছ্যাকা দিতো, গরম পানি মাথায় ঢাইল্যা দিতো’— সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে এমন নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন শেরপুরের সৌদি ফেরত নারী সকিনা বেগম (৪৫)।

সকিনাসহ ৪০ জন নারী গত রবিবার সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। বাকিদের অভিজ্ঞতাও প্রায় সকিনার মতোই। গরিব ও অসহায় এ ৪০ নারী সংসারে সচ্ছলতা আনতে কিছুটা বাড়তি আয়ের আশায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসাবে। কিন্তু সেখানে যেসব বাড়িতে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছিল, সেসব বাড়ির কফিল (মালিকরা) ও তাদের স্ত্রী সন্তানরা কথায় কথায় তাদের মারধর করতো। কাজ শেষে খাবার চাইলেও অনেক সময় দেওয়া হতো না। আবার কাজ শেষে মালিকরা তাদের বেতনও ঠিকমতো পরিশোধ করতো না। রবিবার রাত আটটার দিকে অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তারা দেশে ফেরেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নামার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা এক সাথে বিমান বন্দরের ক্যানোপি-২ নম্বর গেট দিয়ে বের হয়ে আসেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন।

তিনি বলেন, যারা দেশে ফিরেছেন তারা সকলে সৌদি আরবের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজের জন্য গিয়েছিলেন। নির্যাতিত হয়ে প্রবাসী মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ক্যাম্পে ছিলেন। রবিবার তাদের ফেরত আনা হয়।

বছর খানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়েছেন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার হাজরা বেগম (৩০)। বাবাও বেঁচে নেই তার। দেড় বছরের একটি সন্তান রয়েছে হাজরার। তিনি ভেবেছিলেন দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়ে বেশি টাকা আয় করে দেশে ফিরবেন। তারপর সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সৌদিতে গিয়ে বাসা বাড়িতে কাজ পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু কাজের মূল্য তিনি পাননি। ফলে রবিবার শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে হাজরাকে।

হাজরা জানান, সেখানে একটি বাসায় ১ বছর তিন মাস গৃহকর্মী হিসেবে ছিলেন। কিন্তু এ পুরো সময়টা তার উপর চলেছে অমানবিক নির্যাতন। গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী তাকে দিয়ে সারাক্ষণ কাজ করাতো। মাস শেষে বেতনের কথা বললেই তারা দুজনে তাকে ধরে মারতো। কাজ শেষে প্রতিদিন খাবার চাইলেও কপালে জুটত মারধর। মাঝে কয়েকবার তার মাথা ও কোমরে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও পায়ে গরম লোহার ছ্যাকও দিয়েছিল বাসার বর্বর মালিক।

ভোলা সদর থানার হাসিনা বেগম (৪৫)। তিনিও গিয়েছিলেন সৌদিতে। ছিলেন বছরখানেক। জানালেন, মাত্র চার মাসের বেতন পেয়েছেন তিনি। বাকি আট মাসের বেতনের কথা বললেই মারধর করতো বাসার কফিল (মালিক)। মাঝে মাঝে লোহা গরম করে গায়ে ছ্যাকাও দিত।

আরেক হতভাগী নারী হবিগঞ্জের রুবিনা আকতার (২৫)। গ্রাম্য দালালের খপ্পরে পড়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে সৌদিতে পাড়ি জমান তিনি। স্বামী পরিত্যক্তা এ নারী ৩ মাস ১৫ দিন সেখানে ছিলেন। এর মধ্যে ১৫ দিন কাটে জেলে। রুবিনা জানান, তিনি কাজ করতেন কিন্তু খাবার পেতেন না। খাবার চাইলে তাকে অর্ধেক রুটি দেওয়া হতো। আর বেতন চাইলেই শুরু হতো মারধর। গোসলের জন্য সাবান-শ্যাম্পু দেওয়া হতো না। ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকে তার পাসপোর্ট আটকে রেখেছিল বাসার মালিক। পরে অত্যাচার সইতে না পেরে তিনি বাসা থেকে পালিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। পরে এক বাঙালির সহায়তায় বাংলাদেশি ক্যাম্পে তার আশ্রয় হয়।

শরীয়তপুর পালং উপজেলার মাকসুদারও একইরকম অভিজ্ঞতা। মাকসুদা জানালেন, তিনি ১৪ মাস সৌদি আরবে ছিলেন। বেতন নিয়মিত পেতেন না। বেতন চাইলে তাকে মারধর করা হতো। বাড়িতে আসতে চেয়েছিলেন বলে তার পাসপোর্ট আটকে রাখেন বাসার মালিক। অত্যাচার সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।

নিজের সুখের আশায় নয়, দুই সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করবেন বলে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন রাজশাহী গোদাগাড়ির নাসরিন বেগম (৩৫)। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তার। স্বামী হারানো নাসরিন জানান, ‘তারা খালি কাম করায়। খাইতে এমনকি ঠিকমতো ঘুমাইতেও দিত না। সকাল ৯টা থেকে রাত ৩/৪টা পর্যন্ত কাম করাইতো। আবার বেতন চাইলেই মারতো।’

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের নাজমা (২৮) জানালেন, বাসার মালিক তাকেও সারাদিন কাজ করিয়ে নিতো। রাতে দুই ঘন্টাও ঘুমাতে দিতো না। আবার কিছু মেয়েকে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনেও বাধ্য করতো বাসার মালিকরা। তিনি পাঁচ মাস থাকলেও মাত্র দুই মাসের বেতন পান। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে ওই বাসা থেকে পালিয়ে আসেন তিনি।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: [email protected]

Developed by: