সর্বশেষ আপডেট : ১৬ ঘন্টা আগে
রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সুলতান মনসুর কি দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন না?

সুজাত মনসুর ::

সুলতান মনসুর। পুরো নাম সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ সুলতান। আমাদের প্রিয় সুলতান ভাই। ষাটের দশকের শেষভাগে মুজিবাদর্শে দীক্ষা নিয়ে যার রাজনীতিতে পথচলা, ৭৫-এর পনেরই আগস্ট ঘাতকের হাতে নিহত জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ, দেশে ফিরে আবারো পিতা হত্যার বিচার ও দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরিয়ে আন্দোলনে প্রথমসারির ছাত্রনেতাদের একজন। শুধু তাই নয়, সুলতান মনসুর হচ্ছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ছাত্রলীগের প্রথম এবং একমাত্র সভাপতি, যিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন বেগবান হতে শুরু করে এবং নব্বুইয়ের শেষভাগে এরশাদের পতনের মাধ্যমে সফল সমাপ্তি ঘটে। সুলতান ভাইয়ের এই রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও আদর্শিক দৃঢ়তার পাশাপাশি যাঁদের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা হলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রয়াত জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ। আব্দুস সামাদ আজাদ সুলতান মনসুরকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যা করেছেন তা কারো অজানা নয়। আর বঙ্গবন্ধু কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা সুলতান ভাইকে কি পরিমাণ স্নেহ করতেন তার একটি ঘটনার চাক্ষুস স্বাক্ষী আমি নিজে।

সম্ভবত ৮৪ সালে যখন বগুড়ার আব্দুল মান্নান ছাত্রলীগের সভাপতি ও জাহাঙ্গীর কবির নানক সাধারন সম্পাদক হন, সে বৎসর সুলতান ভাই সাংগঠনিক সম্পাদক হবেন সেটা মোটামুটি নির্ধারিতই ছিল। কিন্তু হেমায়েতউদ্দিন আওরঙ্গকে পুনরায় সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রাখার পক্ষে মোস্তফা মহসিন মন্টুর(তৎকালীন সময়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানের গণ ফেয়ারামের সাধারণ সম্পাদক) অনঢ় অবস্থানের কারনে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এনিয়ে তিনদিন একটানা ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে নেত্রীর উপস্থিতিতে সাবজেক্ট কমিটির সভা চলার পরও যখন কোন সুরাহা হচ্ছিল না। ৩২ নম্বরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ভীড়। তৃতীয়দিন সকালে আরো অনেকের সাথে আমি ও সুলতান ভাই বঙ্গবন্ধু ভবনের পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ দেখি নেত্রী বের হয়ে আসলেন এবং সুলতান ভাইকে একাকি ডেকে নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বললেন, তারপর হাসিমুখে ভেতরে চলে গেলেন। নেত্রী চলে যাবার পর সুলতান ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, নেত্রী বলেছেন, কৌশলগত কারনে তিনি তাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করতে পারছেন না, তবে পরেরবার তিনি পুরস্কৃত করবেন। নেত্রী কথা রেখেছিলেন পরেরবার সুলতান ভাইকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকদুর ভিপি করে। শুধু কি তাই? ৯১ সালের নির্বাচনে কুলাউড়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা, যিনি ৭৯ সালে অত্যন্ত কঠিন সময়ে নৌকা নিয়ে সাংসদ হয়েছিলেন, সেই জব্বার ভাইকে বাদ দিয়ে সুলতান ভাইকে নমিনেশন দেন। সেবার সুলতান জিতে আসতে না পারলেও ৯৬- জিতেছিলেন। নেত্রী তাকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও করেছিলেন। কিন্তু প্রতিদানে সুলতান ভাই কি করলেন? সাজলেন সংস্কারবাদি।

সুলতান ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালে ২৫শে ডিসেম্বর দিরাইতে। তিনি আব্দুস সামাদ আজাদ, আব্দুর রাজ্জাক ও মতিয়া চৌধুরীর সাথে দিরাই থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরী একই বছর ১০ই ডিসেম্বর ন্যাপ থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। সেইদিন সিলেট থেকে আরো এসেছিলেন বাবরুল হেয়াসেন বাবুল ও আব্দুল খালিক মায়ন। সামাদ সাহেব আমাকে সুলতান ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এখন থেকে সুলতান বৃহত্তর সিলেটের ছাত্রলীগ দেখাশোনা করবে। সেই থেকেই তার সাথে শতভাগ বিশ্বস্থতার সাথে পথচলা ১৯৯৫ সালে প্রবাসী হবার আগ পর্যন্ত, আশির দশকের শুরুতে সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হবার সুবাদে সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় হয়। আমার সাথে অনেক বিষয়েই তিনি মতবিনিময় করতেন। এমনকি নিজের নির্বাচনী এলাকা হিসেবে সিলেট-১ নাকি কুলাউড়াকে বেছে নেবেন, সে মতামত চাইলে কুলাউড়ার পক্ষেই মতামত দিয়েছিলাম। এমনকি তিনি যখন দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং-এ সামাদ আজাদ বলয় পরিত্যাগ করে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বলয়ের অন্যতম নেতা ও কারিগর হয়ে যান, তখনো তার এ সিদ্ধান্ত যে ভুল তা অকপটে বলতে দ্বিধা করিনি। তিনি যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন তা যৌক্তিক মনে হয়নি এবং এই ভুল থেকেই মহাভুলের সুত্রপাত। যে কারনে কক্ষচ্যুতি ও খেসারত এখনো দিয়ে যেতে হচ্ছে।

সুলতান ভাইয়ের সাথে নিবিড় সম্প্রর্কের কারনেই তাকে সরাসরি যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা, মতামত দেয়ার অধিকার আমার ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু তিনি যখন আব্দুর রাজ্জাক, তেয়াফায়েল আহমেদ, আমির হেয়াসেন আমু ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত(যাদেরকে প্রখ্যাত কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী, ঐ সময় র‍্যাটস বলে আখ্যায়িত করতেন)-এর সাথে মিলে ভাইবার মান্না, মুকুল বোস, খ ম জাহাঙ্গীর, সাবের হোসেন চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নুরদের মত ১/১১-এর সংস্কারবাদি সেজে গেলেন কিংবা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হন তখন কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু অবাক হইনি। কষ্ট পেয়েছি কারন, যে সুলতান মনসুর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে জীবনবাজি রাখার কারনে মুজিবাদর্শের হাজার হাজার নেতাকর্মীর ‘প্রিয় সুলতান ভাই’-এ পরিণত হয়েছিলেন। যাকে জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজে দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসুর ভিপি বানিয়েছিলেন, সেই সুলতান মনসুর কি করে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা প্রচেষ্টায় যুক্ত হতে পারেন? তার তো এ কথা না জানার কথা নয়, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য শেখ হাসিনাই আমাদের একমাত্র আশা-ভরসাস্থল। এবং তিনি মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে সে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ২১বার হত্যা প্রচেষ্টাকে পরাভুত করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। ভিশন ২১ এবং ৪১ -এর আলোকে দেশ এখন মধ্যম আয়ের, উন্নয়নশীল দেশ। এগিয়ে চলেছি উন্নতবিশ্বের তালিকায় নাম লেখানোর লক্ষ্য নিয়ে।

অন্যদিকে অবাক হইনি কারন, তিনি যে ভুল রাজনীতির পথে যাত্রা করেছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদের বলয় ত্যাগ করে, সেই রাজনীতিই তাকে পরিচালিত করেছে সংস্কারবাদী হতে। তিনি যাদের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধেছিলেন কিংবা যার শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলেন, তাদের বা তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কমিটমেন্টে গলদ রয়েছে। তাই তারা ক্ষমতার জন্য নব্য মুশতাকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে পেরেছেন। আবার যখন শেখ হাসিনা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন ঠিকই মন্ত্রীত্ব থেকে শুরু করে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, এমপি থেকে দলীয় পদবী। সুলতান মনসুরের কথা একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
কিন্তু যদি আব্দুস সামাদ আজাদ বেঁচে থাকতেন এবং সুলতান ভাই যদি উনার বলয় ত্যাগ না করতেন, তাহলে শতভাগ নিশ্চিত হয়েই বলা যায়, সামাদ আজাদ যেমন সংস্কারবাদী হবার প্রশ্নই ছিলনা, তেমনি সুলতান ভাইয়েরও সংস্কারবাদী হয়ে আজ মুলস্রোত থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় ম্রিয়মাণ হয়ে যাবার কথা ছিল না।

সুলতান ভাই সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের বাইরে আছেন আজ প্রায় ১০ বছর হতে চলেছে। কেন আছেন তাও সবার জানা। আরো আছেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। ভাইবার মান্নাকে হিসেবে ধরতে চাই না। সে আদর্শিকভাবে কখনোই আওয়ামী লীগার ছিল না। এই তিনজন ছাড়া বাকি সংস্কারবাদীরা মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু বিভিন্নভাবে পুনর্বাসিত হয়েছেন। মাদার অব হিউমিনিটি শেখ হাসিনা তার ঘোষনা অনুযায়ী সংস্কারবাদীদের কৃতকর্ম ভুলে না গেলেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। ইদানীং বাজারে জোর গুজব রয়েছে, এবার নির্বাচনের আগে সুলতান মনসুর, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও অধ্যাপক আব্দুল মান্নানকে দলে ফিরিয়ে আনা হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের আপীল থাকবে সুলতান মনসুর সহ বাকি দুইজনের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অতীত বিবেচনায় অন্তত: একটিবার তাদের নিজেদেরকে সংশোধন করার সুযোগ দেয়া হউক। একটা বিষয় তো মানতেই হবে, মাঝেমধ্যে সুলতান ভাই ও অন্যরা হতাশা থেকে, অনুশোচনা, ক্ষোভ থেকে কিংবা নিজেরা এখনো রাজনীতির মাঠেটিকে আছেন তা জানান দেবার জন্য উল্টাপাল্টা কিছু বললেও অন্যকোন রাজনৈতিক দলে কিন্তু নাম লেখাননি, অপেক্ষায় আছেন মমতাময়ী আপার আহ্বানে আপন ঘরে ফিরে যাবার প্রত্যাশায়। এই প্রত্যাশা তারা এবং আমরা করতেই পারি। কেননা, মুজিবাদর্শের সকল নেতাকর্মীদের আবদারের জায়গাতো একটাই, বঙ্গবন্ধু কন্যা, আমাদের প্রিয় বড় আপা, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যেমন শাসন করবেন, তেমনি আদর করে কাছে টেনে নেবেন সবাই তাই প্রত্যাশা করে।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: