সর্বশেষ আপডেট : ১২ ঘন্টা আগে
রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম

মো: কায়ছার আলী:: পড় তোমার প্রভুর নামে। পবিত্র আল-কোরআনের প্রথম নাযিলকৃত বাণী নামাজ কায়েমের কথা নয়, যাকাত আদায়ের তাগিদ নয়, ঈমান আনার নির্দেশ নয়, সিয়াম সাধনার বাণী নয়, হজ্জব্রত পালনের উক্তি নয়, পর্দার হুকুম নয়, জিহাদের ঘোষনা নয়, তাকওয়া অর্জনের উপদেশ নয়, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধও নয়। ইসলামের জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রথমে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন যেখানে জ্ঞান অর্জনের চর্চার কথা বলা হয়েছে। সেখানে দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা যায় পৃথিবীতে সবচেয়ে কম লেখাপড়া করে আজ মুসলমানেরা। কোরআন ও হাদীস অধ্যয়ন থেকে আমরা ধীরে ধীরে দুরে সরে যাচ্ছি। কেন মুসলমানেরা জ্ঞান অর্জন করে না তা আমাদের ভাবতে হবে।

ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। সকল মানুষের সাথে সুখ শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কায়েম হোক সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশে। শোষণ ও নির্যাতন চিরতরে দূরীভূত হোক এটা ইসলামের শিক্ষা। আজ সারা বিশ্বে একতরফাভাবে মিথ্যা অপবাদ ও গালি দেওয়া হচ্ছে ফাঁদ পেতে বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। মুসলমানেরা একে অপরের সাথে দেখা বা সাক্ষাত হলে প্রথমেই শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সালামের মাধ্যমে অর্থাৎ একে অপরের শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে। মোয়াজ্জিমের সুমধুর, সুললিত লালিত্যময়, জলদ গম্ভীর আযানের ধ্বনি শুনে মসজিদে গিয়ে পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর তা শেষ করে ডানে ও বামে সালাম (শান্তি) প্রতিষ্ঠা ঘোষণার মাধ্যমে। মোনাজাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে প্রথমে দুনিয়া ও পরে আখেরাতের মুক্তির মাধ্যমে। শুধু জীবিত মানুষদেরই জন্য নয় মৃত ব্যক্তিদের জন্য কবরস্থান জিয়ারত করতে গিয়েও মৃত ব্যক্তিদের প্রথমে সালাম প্রদান করা হয়। কি গভীর শিক্ষা ইসলামের। মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিষ্ঠা করাই হল ঈমানদার বা নবী (সাঃ) এর অনুসারীদের পবিত্র কাজ।

মানুষ কেন নিজেকে ধ্বংস করবে, সমাজের ক্ষতি করবে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করবে। মানুষের জন্মের পূর্ব থেকেই পিতা- মাতাই আর্থিক ব্যয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য তার উপর বর্তায়। এই ঋণ তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শোধ করতে হবে। নিজেকে ধ্বংস করে নয়। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর। ১,০০০ জন সশস্ত্র যোদ্ধার বিপক্ষে অস্ত্রহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্রতায় জর্জরিত রোজাদার মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী, যাকে অসম যুদ্ধ বলা যায়। মক্কা থেকে কোরাইশগণ তথা ইসলাম বিরোধী শক্তি ৩২০ কি.মি. উত্তরে যুদ্ধ করার জন্য বদর প্রান্তরে আর অন্য দিকে মহানবী (সাঃ) এর নেতৃত্বে মদীনা থেকে ১২২ কি.মি. দক্ষিণে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করার জন্য বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়। আবু জেহেলের বাহিনী ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করার জন্য বেশি পথ অতিক্রম করে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলাম কাউকে প্রথমে আঘাত করে না, প্রত্যাঘাত করে, বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ করে। বদরের রাত এক সাহাবী রেকি করছেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান ও গতিবিধি জানার জন্য, এটা যুদ্ধের কৌশল। সেই সাহাবী ফিরে এসে মহানবী (সাঃ) কে বলছেন, “হুজুর (সাঃ), আমি আবু জেহেলকে একা এবং সঙ্গী ছাড়া ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছিলাম।

কিন্তু ইস্ ! কেন যে তাকে হত্যা করলাম না। এই সুযোগ আর হয়তো জীবনে পাবো না। নবী (সাঃ) বলেন, তুমি যদি নিরস্ত্র, একাকী ঘুমন্ত আবু জেহেলকে হত্যা করতে, তাহলে তুমি জাহান্নামী হতে। এই ঘটনা থেকে বুঝা যায়, ইসলাম কখনও চোরাগুপ্তা, আকস্মিক, পিছন থেকে কাপুরোষিচিত হত্যা পছন্দ করে না। তাহলে কার স্বার্থে পৃথিবীতে জিহাদের নামে সন্ত্রাস হচ্ছে। সেটা আমাদের ভাবতে হবে। ইসলামকে পরোক্ষভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে। বিদেশী এক সাংবাদিক কথার ফাঁদে বা জালে জোড়ানোর জন্য আমেরিকার এক মুসলমানকে প্রশ্ন করেন, লাাদেন কি মুসলমান ? আমেরিকান বললেন হ্যাঁ। দ্বিতীয় প্রশ্ন, লাদেন তো সন্ত্রাসী, তাহলে আপনার উত্তরমতে, মুসলমানরা সন্ত্রাসী। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় ছিল সমগ্র আরব বিজয়ের সমতুল্য। পৃথিবীতে কোন দেশ বিনা রক্তপাতে জয় হয়নি। সীজার, আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ানের দেশজয়, নিরীহ জনসাধারণের সাথে রক্তপাতের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কিন্তু নবী (সাঃ) বিনা প্রতিবন্ধকতায় বা বিনা বাধায় মক্কা বিজয় করেন। মক্কার দক্ষিণ ফটকে কিছু কোরাইশ বিক্ষিপ্তভাবে বাধা দিলে ২৩/২৪ জন কোরাইশ নিহত হন এবং মুসলমানদের পক্ষে বানু খোজা গোত্রের দুই ব্যক্তি প্রাণ হারায়।

মক্কা বিজয়ের আগে মহানবী (সাঃ) কয়েক শ্রেণীর লোককে নিরাপত্তার ঘোষণা দেন। মক্কা বিজয় কোন প্রকার লুটতরাজ, গৃহ লুন্ঠিত, শ্লীলতাহানি, অত্যাচার, নিপীড়ন বা নির্যাতন হয়নি। মানবতার নবী (সাঃ) এর মহানুভবতা সত্যি প্রশংসনীয়। চষধরহ গঁঃয ঝঃধঃরংঃরপং (১৯৩৪-৮৪) এর সূত্র মতে, ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে মুসলমান বৃদ্ধির হার ২৩৫% আর খ্রিস্টান বৃদ্ধির হার মাত্র ৪৭%। এই সময়ের মধ্যে পাঠকেরা কি বলতে পারবেন পৃথিবীতে কোথাও ধর্মীয় যুদ্ধ হয়েছে। ১৪০০ বছর ধরে আরব বিশ্বে এবং প্রায় ১০০০ বছর ভারতে মুসলমানেরা শাসন করেছে। পরে আরবে ব্রিটিশ ও ফ্রান্সরা আগমন করে। আরব বিশ্বে বংশ পরম্পরায় দেড় কোটি কপটিক খ্রিস্টান কি বলতে পারবেন, মুসলমানরা সন্ত্রাসী। ভারতে ৮০% অমুসলমানরা সাক্ষী দেয় মুসলমানরা তরবারি দিয়ে তাদের ধর্ম প্রচার করেননি বা তাদের উপর আক্রমণ করেননি। ভারতের বৃক্ষ, পাতা, পল্লব, দেওয়ানি খাস, আম ও তাজমহল বানিয়ে ভারতকে মুসলমানেরা সাজিয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীর হত্যার সঙ্গে মুসলমানরা জড়িত নয়। জেরুজালেমকে নিয়ে মুসলিম মহাবীর সালাউদ্দিন আইয়ুবির সাথে ফ্রান্সের সৈন্য বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে কয়েকবার। যাকে ক্রুসেড বলে। মুসলমানেরা সবশেষে জিতলেও প্রতিপক্ষের সাথে কোন অমানবিক আচরণ করেননি।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বালাফোরের সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের পর ইসলাম বিরোধী শক্তি ১৯৭৯ সালে ইরানের সফল অভ্যুত্থানের পর ইরাক দিয়ে ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধ বাধিয়ে দীর্ঘদিনের গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেন। ইসলামী দেশগুলোকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা আর অন্য দিকে তলে তলে অস্ত্র বিক্রি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল সম্পদ হস্তগত করার জন্য অনেক কুটকৌশল কাজে লাগিয়েছে। সারা বিশ্বে আজ সন্ত্রাসী হামলার বিস্তার ঘটছে। আফ্রিকা মহাদেশের ২৯ টি দেশে যুদ্ধ, ২৬৭ টি বিদ্রোহী দল নানা দাবিতে লড়াই করছে। ইউরোপের ১০ টি দেশে ৮০ টি বেসামরিক বাহিনী আছে। এশিয়ার ১৬ টি দেশে সক্রিয় ১৬৪ বিদ্রোহী বেসামরিক দল।

জানুয়ারি ১৬ থেকে জুন ১৬ এই সময়ের মধ্যে ৬৭১ টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে পৃথিবীতে। ইরাকে একদিনে ২৬০ জন লোকের শিরচ্ছেদ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও পহেলা জুলাই ১৬ হোটেল আর্টিজনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। মানুষ হত্যার পরিমাণ সর্ম্পকে আল্লাহ তা আলা বলেন, “যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করে। আর যে, ব্যক্তি কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করে।” মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বলছি একজন মুমিনকে হত্যা করা অবশ্যই আল্লাহর নিকট দুনিয়া লয় হয়ে যাওয়ার চাইতেও অধিক ভয়ঙ্কর।” নবী (সাঃ) মক্কা বিজয়ের আগের রাত্রে নিরস্ত্র অবস্থায় ধরা পড়ার পরেও শীর্ষ কাফের নেতা আবু সুফিয়ানকে হত্যা করেন নি। বরং তিনি তাকে মুসলিম হওয়ার সুযোগ দেন। মক্কা বিজয়ের পরের দিন প্রদত্ত ভাষণে তিনি সকল কাফের মুশরিকক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং রক্তপাতকে স্থায়ীভাবে হারাম করে দেন। ফলে সবাই ইসলাম কবুল করে ধন্য হন। আজ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পাশাপাশি, নারীর মর্যাদা,মানবিকতা, সহমর্মিতা, দানশীলতা, পরার্থপরতা, ন্যায়বিচার ন্যায়প্রতিষ্ঠা, সহযোগিতা, দাস প্রথা উচ্ছেদ, সাদা-কালোর মৈত্রী স্থাপন করে বিদায় হজ্বের ভাষণের বাণীগুলো কিভাবে সর্বত্র বাস্তবায়ন করা যায় তা জানাতে হবে। নবী, সাহাবী, খলিফাদের, ইসলামী মনীষী বা শাসকদের জীবনে ঘটে যাওয়া এরকম শত শত ইতিহাস আমাদের লেখনীর মাধ্যমে পাঠ্য বইয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। মানুষ হত্যার মোহে যারা নিমজ্জিত এরকম ভ্রান্ত ধারণা বাদীদেরকে ইসলামের সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য আলেম সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রবাদে আছে- “অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী।” তাই সকলকে বেশি বেশি করে ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জিহাদ এবং সন্ত্রাস, শহীদ এবং আত্মঘাতী (আত্মহত্যা) এক নয়।

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: