সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ৭ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আমি যখন ইউএস-বাংলা বিমানে নেপাল ট্রাজেডির শিকার!

সালমান ফরিদ ::

বিমানের ঠিক মাঝখানের একটি সিটে বসে আছি।
এটি আমার প্রথম বিমান ভ্রমণ নয়। কিন্তু প্রথম নেপাল ভ্রমণ। এভারেস্ট জয় করতে যাচ্ছি না, যাচ্ছি এভারেস্টের পাদদেশে দাঁড়িয়ে জয়ের আনন্দ উপলব্দি করতে। আজেকর ভ্রমণ সেই উপলব্দি লাভের যাত্রা।
ইমিগ্রেশন শেষ করে যখন বিমানে উঠার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন এয়ারপোর্টের আয়না দিয়ে বাইরে দেখছিলাম বিমানের আসা যাওয়া। আমাদের খুব দেরি হল না। বিমানে উঠে বসলাম ঠিক টাইমে।

জানালার পাশে সিট ছিল আমার। বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ করার সময় জানালার পাশের সিট চেয়ে নিয়েছিলাম। কারণ, আমি এডভেঞ্চার পছন্দ করি। একে বলতে পারেন ভীষণ দুর্বলতা অথবা নিখাদ ভালবাসা। তাই আকাশের এডভেঞ্চার থেকে বঞ্চিত হতে চাই নি।

কিন্তু আজ আর সেই এডভেঞ্চার হল না! বিমানে চড়ার পর পাশের সিটে এসে বসলেন কালো চশমা পরা ষোড়শির বয়স পেরুনো এক রমণী। সিটের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের চশমা কপালের উপরে তুলে রাখলেন। বসার আগে আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসলেন। বললেন, ‘হ্যালো।’

আমি হেসে বিনিময় দিলাম। অবাক হলাম, বাংলাদেশি রমণীরাও ফরেন স্টাইলে হাই-হ্যালো বলতে পারেন তাহলে। ভালই উন্নতি হয়েছে আমাদের। ভেবে বেশ খুশি হলাম। তবে তারচেয়ে বেশি খুশি হলাম, আকাশের দীর্ঘযাত্রা পথে এরকম একজন সুন্দরী রমণী সঙ্গী পেয়ে। আমি তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। দূরে রানওয়েতে তখন একটি এয়ারবাস এসে নামছে! ওইদিকে চেয়ে আছি। দ্রুত নেমে আস্তে আস্তে তার স্পিড কমে টার্মিনালের দিকে এগিয়ে আসছে। সবই প্রত্যক্ষ করছিলাম আমি।

‘এক্সকিউজ মি!’ শব্দটা মনে হল কাছে থেকেই এসেছে। নারী কণ্ঠ। হয়ত আমাকেও কেউ বলতে পারে। পাশের সেই সুন্দরী রমণী কি আমাকে বললেন? তাকালাম। হেঁ, আমাকেই বলছেন। আর বলেছেন সেই রমণীই।
‘আমাকে কিছু বলবেন? প্লিজ, বলুন।’ আমি বেশ আগ্রহী হয়ে তাকে জানতে চাইলাম।
‘কিছু মনে না করলে, আমি কি জানালার পাশে বসতে পারি? আমি যখন বোর্ডিং কার্ড নিই, তখন জানালার পাশের সিট খালি ছিল না।’

আমি খানিকটা বিরক্ত হলাম। আমার এডভেঞ্চারে এটা প্রথম বিপত্তি। কিন্তু না করতে পারলাম না। এরকম একজন সুন্দরী কোনো কিছু চাইলে না করা যায়? যায় না বলেই বললাম, ‘ইটস ওকে। আসুন প্লিজ।’

যাত্রা শুরু এভাবে। বিমান ছাড়লো ঠিক সময়ে। মেঘেঢাকা আকাশ, কুয়াশার ছাদর মাড়িয়ে বিমান আকাশে তার রুটে গিয়ে স্থীর হল। এসময় বেল্ট খুলে একটু আরাম করে বসলাম। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছি । যেহেতু জানালার পাশের সিটে একজন নারী যাত্রী। সে জন্য মাঝে মাঝে তার দিকেও চোখ যাচ্ছে। আমি তার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বললাম না। প্রথমে শুরু করলেন রমণী নিজেই। ‘আপনি কি ঘুরতে যাচ্ছেন?’ আমি জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি আমার দিকে চেয়ে প্রথমে মুচকি হাসলেন। এক সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে প্রশ্ন করলেন।
‘জি। আপনি?’
‘আমি নেপালি। বাংলাদেশের সিলেটে একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। সে হিসেবে বাড়ি যাচ্ছি বলতে পারেন।’
তার কথা শুনে অবাক হলাম। আরও আগ্রহ নিয়ে তাকালাম তার দিকে। বলে কী! নেপালি মেয়ে! অথচ কী চমৎকার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলছে! এভাবে একা তার বিমান যাত্রা দেখে আগেই তাকে নেপালি ভাবা উচিৎ ছিল। মনে মনে ভাবলাম।

‘ওয়াও; তাই! সত্যিই তো বাড়ি যাচ্ছেন। আর আমি যাচ্ছি আপনার বাড়ি দেখতে। হাহাহা। দেখুন বিমানেই আমরা গেস্ট আর হোস্ট হয়ে গেলাম। কী কাকতালিয়!’ একটা হাসি দিলাম। ‘আমার নাম সুমিত্র। সাংবাদিকতা করি। লেখালেখিরও অভ্যাস আছে।’
‘ধন্যবাদ। লেখক আপনি! খুব ভাল লাগলো আপনার সাথে পরিচিত হয়ে। আমি পূর্ণিমা থাপা। কাটমন্ডু শহরে আমাদের বাসা। ওখানে বাবা-মা থাকেন। আমার ছোট একভাই আছে। বাবা সরকারী চাকুরিজীবী।’
‘বেশ গোছানো পরিবার আপনাদের!’
‘বলতে পারেন। তো ওখানে কী হোটেলে উঠবেন?’
‘হাহাহা। আমাদের তো আর কোন সুযোগ নেই। শেষ সম্বল বলতে পারেন।’
‘উহ! এভাবে বলছেন কেন? তাহলে চলুন, আমাদের বাসায়। আমার ছুটি আছে। আপনাকে নিয়ে ঘুরে দেখাবো!’
তার একথা শুনে আরও আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকালাম। এতো তাড়াতাড়ি এমন প্রস্তাব সে দিয়ে দেবে ভাবতে পারিনি। অসম্ভব আন্তরিক, বন্ধুবাৎসল্য আর চমৎকার আধুনিক পরিবারের সদস্য না হলে নির্র্দিধায় এমন প্রস্তাব দিতে পারে!

সহসা এমন প্রস্তাব পাওয়া আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। লোপে না নিয়ে উপায় আছে? তাও আবার ওমন সুন্দরী রমণীকে উপেক্ষা করে! ‘সে হলে তো পরম সৌভাগ্য ধরে নেবো। কিন্তু আমার হোটেল ঠিক করা। আপনাদের বিরক্ত করবো না। সরি।’ বললাম ঠিকই। কিন্তু মনে মনে বললাম, এটা আমার মনের কথা নয়। সত্যি বলছি। বলে, ভয়ে আছি- সে কী আবার বলে বসে, আচ্ছা ঠিক আছে!

‘না না, সে হবে কেন। আমাদের বরং আরও ভাল লাগবে। প্লিজ।’
এভাবেই আমাদের কথা এগিয়ে চলছিল। বেশ ভাব জমে গিয়েছে আমাদের মধ্যে। বিমান ছড়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে। বিমান থেকে ঘোষণা এসেছে ল্যান্ডিং এর। বেল্ট বাঁধার নিদের্শ দেয়া হল। ‘আপনার বাড়ি পৌঁছে গেছি!’ থাপার দিকে চেয়ে হেসে বললাম।
সেও হেসে উত্তর দিল, ‘হুম!’

সিট বেল্ট বেঁধে নিচে নামার প্রস্তুতি নিলাম। আর ৫ থেকে ৬ মিনিট। দেখছি; শহর কাটমুন্ডু দেখা যাচ্ছে। পাহাড় ঘেরা। ছোটছোট দালান। উঁচু বলতে এয়ারপোর্টের পাশে একটি দালানই দেখতে পেলাম।
আর হয়তো একমিনিটের মধ্যে আমরা মাটি ছুঁবো।
ঠিক তখনই।

ঠিক তখনই বিমান আকষ্মাত বড় একটি ধাক্কা খাওয়ার মতো দুলে উঠলো। ভয়ংকর ভাবে। শব্দ হচ্ছে বিদগুটে। ভয়ে সবাই চিৎকার করছে। হাওমাও করে বাচ্চা ও নারীরা কান্না শুরু করেছে। সবাই চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখছে। ৫ সেকেন্ডের মধ্যে আরও ভয়ংকর ভাবে দোলতে লাগলো বিমানটি। যেন ধপাস করে নিচে পড়বে গিয়ে। ক্যাবিন থেকে লাগেজ এসে পড়লো নিচে। আমার গায়ের উপর একটা পড়েছিল। বেল্ট বাধা তাই আটকে আছি। না হলে আমিও ব্যাগের মতো কোথাও ছিটকে পড়তাম! এসময় বিমানটি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো খুব খারাপ ভাবে। ফলে পেছন থেকে অনেক জিনিসপত্র সামনে পড়ছে গিয়ে। তখন চোখ-মুখ সবার আতঙ্কে লাল হয়ে ওঠলো। অনবরত চিৎকার চেচামেচি করছে সবাই। আমি তাকালাম থাপার দিকে। আতঙ্কে তার চোখমুখ লাল! সে আমাকে ঝাপটে ধরলো। ডান পাশের জানালা ভেঙে বাতাস হুহু করে বিমানের ভেতরে ঢুকছে। স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না।

এরপর আমি আর কিছুই খেয়াল করতে পারলাম না। ভয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। মাথা ঘুরছে। কান্না শুরু করেছি সেই প্রথমেই। জোরে জোরে ‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ! রক্ষা করো। দয়া করো।’ বলে মাতম করছি। এসময় চোখের কোণে ভেসে উঠলো আমার মায়ের মুখ। আমার সন্তানের মুখ। আমার স্ত্রীর মুখ। আশপাশে আসলেই আর কোন খেয়াল নেই। আর কোন শব্দও কানে আসছে না। আর কাউকে চোখে দেখছি না। শুধু ভাসছে, আমার পরিজনরা আমাকে হাত বাড়িয়ে ধরে আটকাতে চাইছে। আমি তাদের দিক থেকে দূরে সটকে পড়ছি। হাত ফসকেই গেল হঠাৎ! এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। আমি সম্ভবত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম!
নোট: হেঁ, এমনটি হতে পারত। আমিও সেই বিমানের যাত্রী হতে পারতাম। হয়নি আমার ভাগ্যগুণে। কিন্তু সেইসব যাত্রী যারা ট্রাজেডির শিকার তাদের শেষ মুহুর্তের কথা কল্পনা করতেই বুক আঁৎকে উঠছে। ক্ষমা করো আমাদের। তোমাদের একটি নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি কেউ!

যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের যে আর কিছুই করার নেই। আমরা মর্মাহত।

লেখক : সাংবাদিক




নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: মকিস মনসুর আহমদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: কে এ রহিম সাবলু, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ৯/আই, ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
ফোন: ০৮২১-৭২৬৫২৭, মোবাইল: ০১৭১৭৬৮১২১৪ (নিউজ) ০১৭১২৮৮৬৫০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: