সর্বশেষ আপডেট : ২৭ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত সিলেটের ৩ জন

ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে মোট ১২ জনকে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের তিনজন। যাদের অর্জনে গর্বিত সিলেট তাঁরা হচ্ছেন কবি মোহাম্মদ সাদিক, নির্মাতা শাকুর মজিদ এবং শিশু সাহিত্যিক ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ।
কবি মোহাম্মদ সাদিক :
কবি মোহাম্মদ সাদিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র। ১৯৫৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার ধাড়ারগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ১৯৭৬ সালে বি. এ.(সম্মান) এবং ১৯৭৭ সালে এম.এ. ডিগ্রীধারী ড. মোহাম্মদ সাদিক যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৯৪-৯৫ সালে পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট-এর উপর পড়াশুনা করেন এবং পরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সিলেটিনাগরী লিপির ওপর তাঁর গবেষণার জন্যে ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি. এইচ. ডি. ডিগ্রী লাভ করেন।

স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম বিসিএস জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্য। এক পুত্র মোহাম্মদ কাজিম ইবনে সাদিক ও এক কন্যা মাসতুরা তাসনিম সুরমাকে নিয়ে তার সংসার।

আশির দশকের কবি মোহাম্মদ সাদিকের এ যাবত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে- আগুনে রেখেছি হাত (১৯৮৫), ত্রিকালের স্বরলিপি (১৯৮৭), বিনিদ্র বল্লম হাতে সমুদ্রের শব্দ শুনি (১৯৯১), কাদের সিদ্দিকীর টুপি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৭), তুমি না থাকলে ও বৃষ্টিতো থাকবে(২০০০)। অনুবাদ গ্রন্থ-নাইচেরিয়ার বিখ্যাত লেখব চিনুয়া এচিবি-র দ্বিতীয় উপন্যাস ‘No Longer At Ease’-এর বাংলা ভাষান্তর ‘নেই আর নীলাকাশ’।

কবি সাদিক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নজরুল ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভিন্ন ভিন্ন পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাদিক সুইডেনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব এবং কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও সাদিক বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয় রয়েছেন। বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির তিনি জীবন-সদস্য। জাতীয় কবিতা পরিষদ ও বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও মোহাম্মদ সাদিক।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ডেনমার্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভূটান, স্পেন, ইটালি, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হওয়া এই কবি।

শাকুর মজিদ :
শাকুর মজিদের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২২ নভেম্বর, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার মাথিউরা গ্রামে। পড়াশুনা করেছেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশায় স্থপতি শাকুর মজিদ মূলত একজন নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু এছাড়াও তার আরো একটি বড় পরিচয় ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা হিসেবে। ভ্রমণের ওপর টেলিভিশনের জন্যে তিনি বহু তথ্যচিত্রও বানিয়েছেন। বহু কবিতা এবং গল্পের স্রষ্টাও সিলেটের এই কৃতি সন্তান।

সিলেট বেতারে রেডিও নাটক দিয়ে শাকুর মজিদের নাট্যকার জীবনের শুরু। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি লিখেছিলেন ‘যে যাহা করোরে বান্দা আপনার লাগিয়া।’ তখন থেকেই তার নাম ডাকের শুরু। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে। টেলিভিশন নাটক বানিয়ে চলেছেন একের পর এক। টেলিফিল্মও বানিয়েছেন কয়েকটি। লন্ডনী কইন্যা নামে একটি টেলিভিশন নাটক লিখে তিনি সিলেটে ও লন্ডনে নন্দিত ও নিন্দিত দুটোই হয়েছেন। এই নাটকটিই তাকে নাম ও জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
শাকুর মজিদ বলেন, নিজের কিছু কথা খুব সহজে মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্যে তিনি নাটক লিখেন। রেডিও নাটক দিয়ে শুরু হলেও তিনি কিন্তু পরে আর রেডিও নাটক লিখেন নি।
তিনি আরো বলেন, মূলত টেলিভিশন নাটকের প্রতি মোহ থেকেই তিনি আর রেডিওতে ফিরে যাননি। কারণ টেলিভিশনের দর্শক সংখ্যা। মঞ্চনাটকও লিখেছেন তিনি। দেশে বিদেশে বেড়াতে পছন্দ করেন শাকুর মজিদ। ভ্রমণের সময় তিনি ক্যামেরায় ছবি তোলেন। এবং ভিডিও করেন। পরে সেসব ছবি দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন তিনশোটিরও বেশি তথ্যচিত্র।

টেলিভিশনে নাটক-টেলিফিল্ম লিখেছেন ৯টি, নিজে পরিচালনা করেছেন ৫টি। শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে এ পর্যন্ত ২১টি পুরস্কার পেয়েছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ত্রিশটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এসব ভ্রমণ- অভিজ্ঞতাকে প্রামাণ্যরূপ দিতে ‘পৃথিবীর পথে পথে’, ‘ভুবন ভ্রমিয়া শেষে’, ‘ইতিহাসের শহর’, ‘দূরদেশ’, ‘দূরে কোথাও’, ‘মসজিদের ইতিকথা’, ‘আমাদের এই বসুন্ধরা, প্রভৃতি শিরোনামে বিভিন্ন টেলিভিশন থেকে প্রায় দেড়শটির মতো প্রামাণ্যচিত্র প্রচার হয়েছে, প্রকাশ হয়েছে বারোটি ভ্রমণকাহিনী। মঞ্চের জন্যে প্রথম নাটক লিখেছেন ‘মহাজনের নাও’। এছাড়া মঞ্চনাটকের আলোকচিত্র নিয়ে ২০০৩ সালে প্রকাশ হয়েছে ফটোগ্রাফি অ্যালবাম ‘রিদম অন দ্যা স্টেজ’। তাঁর অন্য দুটি প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রীতা ও দুঃসময়ের গল্পগুলো’ এবং আত্মজৈবনিক উপাখ্যান ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’।

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ :
শিশু সাহিত্যাঙ্গনে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ পাঠক নন্দিত একটি নাম। বয়সকে বেমালুম ভুলে লিখতে পারেন শৈশবে-কৈশোরে ফিরেগিয়ে অনায়াসে লিখতে পারেন ছোটদের কথা। জটিল বিষয়ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠে তার নিপুণ লেখার গুণে । একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুচ্ছ বই-এ সহজ-সরলভাবে বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে ছোটদের উপযোগী করে আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরেছেন এই লেখিকা।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানার সুখাইড় গ্রামে ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থের জন্ম। বাবা সুধাংশু শেখর রায় চৌধুরী ও মা নীলিমা চৌধুরী। সম্ভ্রান্ত এই পরিবারে কন্যা শিশুর আগমনকে লক্ষ্মীর আগমন বলে ধরা হত। তাই তাঁর জন্মতিথিতে উলু ধ্বনিতে মুখর হয়েছিল বাড়ী। শাক বেজেছিল মধুর সুরে। আর ছিল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। চাচা বিমলকান্তি সেদিনের সেই পরিবেশের সাথে মিলিয়ে তার নাম রাখলেন ঝর্ণা।

সুখাইড়ে জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত স্কুলেই তার বাল্য শিক্ষা, হাতে খড়ি হয়। বাল্যেই তিনি চমকে দিলেন অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে। দুই দুইবার পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে ডবল প্রমোশন পেলেন। ফলে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেনীতে এবং তৃতীয় শ্রেনী থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তির্ন হলেন। শৈশবে লেখাপড়ায় এ সাফল্যই যেন জানিয়ে দিয়েছিল অতি মেধাবী তিনি। সুনামগঞ্জের সতীশ চন্দ্র গার্লস স্কুলে এনে ভর্তি করা হল তাকে ক্লাশ ফাইভে। এখান থেকেই তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলেন। সমবয়সীদের পেছনে ফেলে বোর্ড নির্ধারিত বয়সের আগেই। সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন (মানবিক বিভাগে)। বি এ তে ভর্তিও হয়েছিলেন সুনামগঞ্জ কলেজে। কিন্তু বিয়ের পর সংসারের দায় দায়িত্ব মাথায় নিয়ে পড়াশুনায় অনিয়মিত হয়ে যেতে হল তাকে। পরবর্তীতে স্বামীর কর্মস্থল রাজশাহীতে অবস্থান কালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে প্রথম হন ১৯৭৬ সালে।

শৈলেন্দু শেখর দাশ পুরকায়স্থকে সাথে নিয়ে দাম্পত্য জীবন সূচনা করেন বর্ণা দাশ । স্বামী সিলেটের দাড়িয়া পাড়ার প্রয়াত আইনজীবি শশান্ত ভূষণ পুরকায়স্থর পুত্র। শৈলেন্দু শেখর কৃষি ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক পদ থেকে অবসর নেয়ার পর আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাদের দুই কন্যা, অজন্তা সিথী (এডভোকেট), ইলোরা কেকা (ব্যাংক কর্মকর্তা)। তাদের দুই পুত্র জয়সুর্য জন, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বিষয়ে শিক্ষা শেষ করে বিদেশে কর্মরত এবং শুভ সূর্য জর্জ। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার বুয়েট, এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ইংলেন্ড। বর্তমানে সেও বিদেশে কর্মরত। এদিক দিয়ে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ রত্নগর্ভা মা।

উল্লেখ্য, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখায় পুরস্কারের জন্য তাদের মনোনীত করে বাংলা একাডেমি। শনিবার বিকালে সাড়ে ৪টায় ১০ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত ১২ জনের নাম ঘোষণা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

সিলেটের তিনজন ছাড়াও পুরস্কার পেয়েছেন, মারুফুল ইসলাম (কবিতা), মামুন হুসাইন (কথাসাহিত্য), মাহবুবুল হক (প্রবন্ধ), রফিকউল্লাহ খান (গবেষণা), আমিনুল ইসলাম ভুইয়া (অনুবাদ সাহিত্য), কামরুল হাসান ভূঁইয়া ও সুরমা জাহিদ (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য), মলয় ভৌমিক (নাটক) এবং মোশতাক আহমেদ (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী)।

অনুলিখন : মারুফ হাসান

 

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: